এসএসসি জীববিজ্ঞান · অধ্যায় ১০
সমন্বয়
এক কথায়
সমন্বয় হলো দেহের বিভিন্ন অঙ্গ ও তন্ত্রের কাজকে একসাথে মিলিয়ে চালানোর প্রক্রিয়া। উদ্ভিদে এ কাজ করে হরমোন, যেমন অক্সিন, জিবেরেলিন, সাইটোকাইনিন, ইথিলিন ও অ্যাবসিসিক এসিড। প্রাণীতে দুইটি তন্ত্র কাজ করে: দ্রুত বৈদ্যুতিক সংকেতের স্নায়ুতন্ত্র আর রক্তের মাধ্যমে ধীর কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী রাসায়নিক সংকেতের অন্তঃক্ষরা তন্ত্র।
সমন্বয় কী এবং কেন দরকার
একটা অর্কেস্ট্রার কথা ভাবুন। প্রত্যেক বাদক দক্ষ, কিন্তু পরিচালক না থাকলে সুর হবে না, হবে হট্টগোল। জীবদেহেও লাখো কোষ, বহু অঙ্গ আলাদা আলাদা কাজ করে। এদের কাজকে সময়মতো, পরিমাণমতো ও একে অপরের সাথে মিলিয়ে চালানোকেই সমন্বয় বলে।
সমন্বয়ের ফলে জীব পরিবেশের পরিবর্তনে সাড়া দিতে পারে এবং দেহের ভেতরের অবস্থা, যেমন তাপমাত্রা, রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা, পানির পরিমাণ স্থির রাখতে পারে। দেহের ভেতরের এই স্থিতাবস্থাকে হোমিওস্টেসিস বলে।
- উদ্ভিদে সমন্বয়: প্রধানত হরমোন বা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রক পদার্থের মাধ্যমে।
- প্রাণীতে সমন্বয়: স্নায়ুতন্ত্র (দ্রুত) ও অন্তঃক্ষরা তন্ত্র বা হরমোন (ধীর, দীর্ঘস্থায়ী) মিলে।
উদ্ভিদ হরমোন: গাছের নীরব বার্তাবাহক
উদ্ভিদের দেহে স্নায়ু নেই, তবু গাছ আলোর দিকে বাঁকে, মূল নিচের দিকে যায়, ফল পাকে, পাতা ঝরে। এসব নিয়ন্ত্রণ করে খুব সামান্য পরিমাণে তৈরি কিছু জৈব রাসায়নিক পদার্থ, যাদের ফাইটোহরমোন বা উদ্ভিদ হরমোন বলে। এরা এক জায়গায় তৈরি হয়ে অন্য জায়গায় গিয়ে কাজ করে।
- অক্সিন: কাণ্ডের অগ্রভাগে তৈরি হয়, কোষের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি ঘটায়, অগ্রমুকুলের প্রাধান্য বজায় রাখে, শাখাকলমে মূল গজাতে সাহায্য করে এবং অপরিপক্ব ফল ঝরে পড়া রোধ করে। অনিষেক ফল (বীজহীন ফল) তৈরিতেও ব্যবহৃত হয়।
- জিবেরেলিন: কাণ্ডের পর্বমধ্য লম্বা করে, বামন উদ্ভিদকে লম্বা করতে পারে, বীজের সুপ্তাবস্থা ভেঙে অঙ্কুরোদগম ঘটায় এবং ফুল ফোটাতে সাহায্য করে।
- সাইটোকাইনিন: কোষ বিভাজন ত্বরান্বিত করে, পার্শ্বমুকুলের বৃদ্ধি ঘটায় এবং পাতার বার্ধক্য বিলম্বিত করে।
- ইথিলিন: একমাত্র গ্যাসীয় উদ্ভিদ হরমোন; ফল পাকায়, পাতা ও ফুল ঝরাতে সাহায্য করে।
- অ্যাবসিসিক এসিড (ABA): বৃদ্ধি রোধক; বীজ ও মুকুলের সুপ্তাবস্থা আনে, খরার সময় পত্ররন্ধ্র বন্ধ করে পানি বাঁচায়, পাতা ঝরায়। একে স্ট্রেস হরমোনও বলে।
ট্রপিক চলন ও ফটোপিরিয়ডিজম
উদ্দীপকের দিক অনুযায়ী উদ্ভিদ অঙ্গের বেঁকে যাওয়াকে ট্রপিক চলন বলে। আলোর দিকে কাণ্ডের বাঁকা হওয়া হলো ফটোট্রপিজম। আলো একপাশ থেকে এলে অক্সিন ছায়ার দিকে বেশি জমা হয়, ফলে ছায়ার দিকের কোষ বেশি লম্বা হয় এবং কাণ্ড আলোর দিকে বেঁকে যায়। মূলের নিচের দিকে যাওয়া হলো জিওট্রপিজম।
দিনের আলোর দৈর্ঘ্য (আসলে রাতের অন্ধকারের দৈর্ঘ্য) অনুযায়ী উদ্ভিদের ফুল ফোটার সাড়াকে ফটোপিরিয়ডিজম বলে। এ কারণেই কিছু ফসল নির্দিষ্ট ঋতুতেই ফুল দেয়।
- দীর্ঘ দিবা উদ্ভিদ: দিনের আলো একটি নির্দিষ্ট সীমার বেশি হলে ফুল ফোটে, যেমন গম, যব, মূলা।
- স্বল্প দিবা উদ্ভিদ: দিনের আলো নির্দিষ্ট সীমার কম হলে ফুল ফোটে, যেমন আমন ধান, তামাক, চন্দ্রমল্লিকা।
- দিবা নিরপেক্ষ উদ্ভিদ: আলোর দৈর্ঘ্যের উপর ফুল ফোটা নির্ভর করে না, যেমন টমেটো, সূর্যমুখী, তুলা।
স্নায়ুতন্ত্রের একক: নিউরন
স্নায়ুতন্ত্রের গঠন ও কাজের একক হলো নিউরন বা স্নায়ুকোষ। এটি দেহের সবচেয়ে লম্বা কোষগুলোর একটি; মেরুদণ্ড থেকে পায়ের আঙুল পর্যন্ত একটি নিউরনের অ্যাক্সন প্রায় এক মিটার লম্বা হতে পারে। পরিণত নিউরন সাধারণত বিভাজিত হয় না, তাই নষ্ট হলে সহজে পূরণ হয় না।
দুটি নিউরনের সংযোগস্থলকে সিন্যাপস বলে। এখানে এক নিউরনের অ্যাক্সনের প্রান্ত থেকে নিউরোট্রান্সমিটার নামের রাসায়নিক (যেমন অ্যাসিটাইলকোলিন) নিঃসৃত হয়ে পরের নিউরনে সংকেত পৌঁছে দেয়। তাই স্নায়ু উদ্দীপনা সিন্যাপসে একমুখী চলে।
- কোষদেহ (সাইটন): নিউক্লিয়াস ও নিসল দানা থাকে।
- ডেনড্রাইট: ছোট শাখাযুক্ত প্রবর্ধক, উদ্দীপনা কোষদেহের দিকে আনে।
- অ্যাক্সন: একটি লম্বা প্রবর্ধক, উদ্দীপনা কোষদেহ থেকে দূরে নিয়ে যায়; অনেকটির উপর মায়েলিন আবরণ থাকে, যা সংকেত দ্রুত চালায়।
- কাজ অনুযায়ী নিউরন তিন প্রকার: সংবেদী (অন্তর্মুখী), আজ্ঞাবাহী বা মোটর (বহির্মুখী) এবং সংযোগকারী (রিলে)।
মানুষের স্নায়ুতন্ত্র: মস্তিষ্ক থেকে স্নায়ু পর্যন্ত
মানুষের স্নায়ুতন্ত্রকে তিন ভাগে পড়া হয়: কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র (মস্তিষ্ক ও সুষুম্নাকাণ্ড), প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্র (করোটিক ও সুষুম্না স্নায়ু) এবং স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্র (সিমপ্যাথেটিক ও প্যারাসিমপ্যাথেটিক)। মস্তিষ্ক করোটির ভেতরে এবং সুষুম্নাকাণ্ড মেরুদণ্ডের ভেতরে সুরক্ষিত থাকে; চারপাশে মেনিনজেস নামের তিন স্তরের আবরণ ও সেরিব্রোস্পাইনাল তরল আঘাত থেকে বাঁচায়।
- অগ্রমস্তিষ্কের সেরেব্রাম: মস্তিষ্কের সবচেয়ে বড় অংশ; চিন্তা, বুদ্ধি, স্মৃতি, ভাষা, ইচ্ছাধীন চলাচল ও ইন্দ্রিয় অনুভূতির কেন্দ্র।
- থ্যালামাস ও হাইপোথ্যালামাস: থ্যালামাস সংবেদী সংকেত সেরেব্রামে পৌঁছে দেয়; হাইপোথ্যালামাস দেহের তাপমাত্রা, ক্ষুধা, তৃষ্ণা নিয়ন্ত্রণ করে এবং পিটুইটারি গ্রন্থিকে নিয়ন্ত্রণ করে।
- মধ্যমস্তিষ্ক: দর্শন ও শ্রবণ সংক্রান্ত প্রতিবর্ত নিয়ন্ত্রণ করে।
- পশ্চাৎমস্তিষ্কের সেরিবেলাম: দেহের ভারসাম্য ও পেশির সূক্ষ্ম চলাচলের সমন্বয় করে।
- পনস ও মেডালা অবলংগাটা: শ্বাস, হৃৎস্পন্দন, রক্তচাপ, হাঁচি, কাশি, বমির মতো অনৈচ্ছিক কাজ নিয়ন্ত্রণ করে।
- মানুষে করোটিক স্নায়ু ১২ জোড়া এবং সুষুম্না স্নায়ু ৩১ জোড়া।
প্রতিবর্ত ক্রিয়া: ভাবার আগেই কাজ
গরম পাত্রে হাত লাগলে আমরা ভাবার আগেই হাত সরিয়ে নিই। উদ্দীপনার ফলে মস্তিষ্কের সচেতন নির্দেশ ছাড়াই দ্রুত, স্বয়ংক্রিয় ও অনৈচ্ছিক সাড়াকে প্রতিবর্ত ক্রিয়া বলে। এর নিয়ন্ত্রণ সাধারণত সুষুম্নাকাণ্ডে হয়। প্রতিবর্ত ক্রিয়ায় উদ্দীপনা যে পথে চলে তাকে প্রতিবর্ত চাপ বলে।
প্রতিবর্ত ক্রিয়া আমাদের বিপদ থেকে তাৎক্ষণিক রক্ষা করে। চোখে ধুলা এলে পলক পড়া, হাঁচি, কাশি, আলোয় চোখের তারারন্ধ্র ছোট হওয়া এর উদাহরণ।
- ১. গ্রাহক (রিসেপ্টর): ত্বকের সংবেদী প্রান্ত উদ্দীপনা গ্রহণ করে।
- ২. সংবেদী নিউরন: উদ্দীপনা সুষুম্নাকাণ্ডে নিয়ে যায়।
- ৩. সংযোগকারী নিউরন: সুষুম্নাকাণ্ডের ধূসর অংশে সংকেত আজ্ঞাবাহী নিউরনে দেয়।
- ৪. আজ্ঞাবাহী নিউরন: নির্দেশ কারক অঙ্গে নিয়ে যায়।
- ৫. কারক (ইফেক্টর): পেশি সংকুচিত হয়ে হাত সরে যায়।
অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি ও হরমোন
যেসব গ্রন্থির নালি নেই এবং নিঃসৃত রস সরাসরি রক্তে মিশে দূরের অঙ্গে গিয়ে কাজ করে, তাদের অন্তঃক্ষরা বা নালিবিহীন গ্রন্থি বলে, আর এদের রসকে হরমোন বলে। অগ্ন্যাশয় একই সাথে বহিঃক্ষরা (পাচক রস) ও অন্তঃক্ষরা (ইনসুলিন) গ্রন্থি, তাই একে মিশ্র গ্রন্থি বলে।
- পিটুইটারি: মস্তিষ্কের নিচে মটরদানার মতো; বৃদ্ধি হরমোনসহ অন্য গ্রন্থিকে নিয়ন্ত্রণকারী হরমোন তৈরি করে, তাই একে প্রভু গ্রন্থি বলে। শৈশবে বৃদ্ধি হরমোনের অভাবে বামনত্ব, আধিক্যে অতিকায়ত্ব হয়।
- থাইরয়েড: গলায় অবস্থিত; থাইরক্সিন বিপাকের হার নিয়ন্ত্রণ করে। আয়োডিনের অভাবে গলগণ্ড বা গয়টার হয়।
- প্যারাথাইরয়েড: প্যারাথরমোন রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে।
- অ্যাড্রিনাল: বৃক্কের উপরে; অ্যাড্রিনালিন বিপদে হৃৎস্পন্দন ও রক্তে গ্লুকোজ বাড়িয়ে লড়াই বা পালানোর প্রস্তুতি নেয়, তাই একে জরুরি হরমোন বলে।
- অগ্ন্যাশয়ের আইলেটস অব ল্যাঙ্গারহ্যানস: বিটা কোষের ইনসুলিন রক্তে গ্লুকোজ কমায়, আলফা কোষের গ্লুকাগন বাড়ায়। ইনসুলিনের ঘাটতি বা অকার্যকারিতায় ডায়াবেটিস মেলিটাস হয়।
- শুক্রাশয় ও ডিম্বাশয়: টেস্টোস্টেরন এবং ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন যৌন বৈশিষ্ট্য ও প্রজনন নিয়ন্ত্রণ করে।
স্নায়ুতন্ত্রের কিছু রোগ ও সুস্থ থাকার উপায়
মস্তিষ্কে রক্তনালি বন্ধ হয়ে বা ফেটে গিয়ে রক্ত চলাচল ব্যাহত হলে স্ট্রোক হয়। উচ্চ রক্তচাপ, ধূমপান, ডায়াবেটিস ও অতিরিক্ত চর্বি এর ঝুঁকি বাড়ায়। মুখ বেঁকে যাওয়া, এক হাত দুর্বল হওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া দেখলে দেরি না করে হাসপাতালে নিতে হয়, কারণ প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ।
মস্তিষ্কের কিছু নিউরন ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে ডোপামিন কমে গেলে পারকিনসন রোগ হয়; হাত কাঁপা, চলাফেরা ধীর হয়ে যাওয়া এর লক্ষণ। আলঝেইমার রোগে ধীরে ধীরে স্মৃতিশক্তি কমে যায়। নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাদ্য, মাদক ও ধূমপান বর্জন এবং মাথায় আঘাত এড়াতে হেলমেট ব্যবহার স্নায়ুতন্ত্রকে সুস্থ রাখে।
বহুনির্বাচনী প্রশ্ন (MCQ)
১. কোন উদ্ভিদ হরমোনটি গ্যাসীয়?
- ক) অক্সিন
- খ) জিবেরেলিন
- গ) ইথিলিন
- ঘ) সাইটোকাইনিন
উত্তর দেখো
উত্তর: গ) ইথিলিন — ইথিলিন একমাত্র গ্যাসীয় উদ্ভিদ হরমোন, যা ফল পাকায়।
২. খরার সময় পত্ররন্ধ্র বন্ধ করতে কোন হরমোন কাজ করে?
- ক) অ্যাবসিসিক এসিড
- খ) অক্সিন
- গ) জিবেরেলিন
- ঘ) ইথিলিন
উত্তর দেখো
উত্তর: ক) অ্যাবসিসিক এসিড — অ্যাবসিসিক এসিড স্ট্রেস হরমোন; পানির অভাবে পত্ররন্ধ্র বন্ধ করে।
৩. আমন ধান কোন ধরনের উদ্ভিদ?
- ক) দীর্ঘ দিবা
- খ) স্বল্প দিবা
- গ) দিবা নিরপেক্ষ
- ঘ) কোনোটিই নয়
উত্তর দেখো
উত্তর: খ) স্বল্প দিবা — আমন ধান ছোট দিনে, অর্থাৎ শরৎ-হেমন্তে ফুল দেয়।
৪. দেহের ভারসাম্য রক্ষা করে মস্তিষ্কের কোন অংশ?
- ক) সেরেব্রাম
- খ) সেরিবেলাম
- গ) মেডালা অবলংগাটা
- ঘ) থ্যালামাস
উত্তর দেখো
উত্তর: খ) সেরিবেলাম — সেরিবেলাম ভারসাম্য ও পেশির সূক্ষ্ম চলাচলের সমন্বয় করে।
৫. মানুষের সুষুম্না স্নায়ু কত জোড়া?
- ক) ১২
- খ) ২১
- গ) ৩১
- ঘ) ৩৩
উত্তর দেখো
উত্তর: গ) ৩১ — মানুষে ৩১ জোড়া সুষুম্না স্নায়ু ও ১২ জোড়া করোটিক স্নায়ু।
৬. নিউরনের কোন অংশ উদ্দীপনা কোষদেহ থেকে দূরে নিয়ে যায়?
- ক) ডেনড্রাইট
- খ) অ্যাক্সন
- গ) নিসল দানা
- ঘ) নিউক্লিয়াস
উত্তর দেখো
উত্তর: খ) অ্যাক্সন — অ্যাক্সন সংকেত কোষদেহ থেকে বাইরে নিয়ে যায়; ডেনড্রাইট ভেতরে আনে।
৭. কোন গ্রন্থিকে প্রভু গ্রন্থি বলা হয়?
- ক) থাইরয়েড
- খ) অ্যাড্রিনাল
- গ) পিটুইটারি
- ঘ) অগ্ন্যাশয়
উত্তর দেখো
উত্তর: গ) পিটুইটারি — পিটুইটারি অন্য অনেক অন্তঃক্ষরা গ্রন্থিকে নিয়ন্ত্রণ করে।
৮. রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমায় কোন হরমোন?
- ক) গ্লুকাগন
- খ) অ্যাড্রিনালিন
- গ) থাইরক্সিন
- ঘ) ইনসুলিন
উত্তর দেখো
উত্তর: ঘ) ইনসুলিন — অগ্ন্যাশয়ের বিটা কোষের ইনসুলিন কোষে গ্লুকোজ ঢুকিয়ে রক্তের গ্লুকোজ কমায়।
সৃজনশীল প্রশ্ন
উদ্দীপক: নাদিয়া জানালার পাশে একটি টবে চারাগাছ রাখল। কয়েক দিন পর দেখল কাণ্ডটি জানালার দিকে বেঁকে গেছে। তার বাবা কাঁচা আমের ঝুড়িতে একটি পাকা কলা রেখে দিলেন, এতে আমগুলো তাড়াতাড়ি পেকে গেল।
- ক) ফাইটোহরমোন কী?
- খ) জিবেরেলিন বামন উদ্ভিদকে লম্বা করে কেন?
- গ) চারাগাছটির জানালার দিকে বেঁকে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করো।
- ঘ) পাকা কলা রাখায় আম দ্রুত পাকার ঘটনাটি বিশ্লেষণ করো।
উত্তর দেখো
- উদ্ভিদের দেহে খুব সামান্য পরিমাণে তৈরি যে জৈব রাসায়নিক পদার্থ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গিয়ে বৃদ্ধি ও বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কাজ নিয়ন্ত্রণ করে, তাকে ফাইটোহরমোন বলে।
- জিবেরেলিন কাণ্ডের পর্বমধ্যের কোষ বিভাজন ও কোষের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি ঘটায়। বামন উদ্ভিদে প্রায়ই নিজস্ব জিবেরেলিন কম থাকে, তাই বাইরে থেকে দিলে পর্বমধ্য লম্বা হয়ে গাছ লম্বা হয়।
- এটি ফটোট্রপিজম। আলো একদিক থেকে আসায় কাণ্ডের অগ্রভাগের অক্সিন ছায়ার দিকে বেশি জমা হয়। ছায়ার দিকের কোষ বেশি লম্বা হয়, আলোর দিকের কোষ কম, তাই কাণ্ড আলোর অর্থাৎ জানালার দিকে বেঁকে যায়।
- পাকা ফল ইথিলিন গ্যাস ছাড়ে। ইথিলিন বাতাসে ছড়িয়ে কাঁচা আমের কোষে শ্বসনের হার বাড়ায় এবং শ্বেতসার ভেঙে চিনি তৈরি, কোষপ্রাচীর নরম হওয়া ও রং বদলের এনজাইম সক্রিয় করে। আমও তখন নিজে ইথিলিন তৈরি শুরু করে, ফলে পাকা দ্রুত ছড়ায়। বদ্ধ ঝুড়িতে গ্যাস জমে থাকে বলে প্রভাব আরও বেশি হয়। তাই ঘটনাটি গ্যাসীয় হরমোনের মাধ্যমে উদ্ভিদে রাসায়নিক সমন্বয়ের প্রমাণ।
উদ্দীপক: রান্নার সময় রাহাতের হাত হঠাৎ গরম কড়াইয়ে লাগল, সে মুহূর্তেই হাত সরিয়ে নিল এবং পরে ব্যথা টের পেল। তার দাদা কিছুদিন ধরে প্রচুর পিপাসা, ঘন ঘন প্রস্রাব ও দুর্বলতায় ভুগছেন; পরীক্ষায় রক্তে গ্লুকোজ বেশি পাওয়া গেল।
- ক) সিন্যাপস কী?
- খ) অ্যাড্রিনালিনকে জরুরি হরমোন বলা হয় কেন?
- গ) রাহাতের হাত সরিয়ে নেওয়ার পথটি ব্যাখ্যা করো।
- ঘ) দাদার সমস্যার সাথে কোন গ্রন্থি জড়িত এবং তা নিয়ন্ত্রণে কী করা উচিত, বিশ্লেষণ করো।
উত্তর দেখো
- দুটি নিউরনের মধ্যে যে সংযোগস্থলে রাসায়নিক নিউরোট্রান্সমিটারের মাধ্যমে স্নায়ু উদ্দীপনা এক নিউরন থেকে আরেক নিউরনে যায়, তাকে সিন্যাপস বলে।
- ভয় বা বিপদের সময় অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি থেকে অ্যাড্রিনালিন দ্রুত নিঃসৃত হয়ে হৃৎস্পন্দন, শ্বাসের হার ও রক্তে গ্লুকোজ বাড়ায়, ফলে দেহ লড়াই বা পালানোর জন্য তৈরি হয়। জরুরি অবস্থায় কাজ করে বলে একে জরুরি হরমোন বলে।
- এটি প্রতিবর্ত ক্রিয়া। ত্বকের গ্রাহক তাপ উদ্দীপনা নেয়, সংবেদী নিউরন তা সুষুম্নাকাণ্ডে পাঠায়, সেখানে সংযোগকারী নিউরন আজ্ঞাবাহী নিউরনে সংকেত দেয়, আজ্ঞাবাহী নিউরন বাহুর পেশিতে নির্দেশ পাঠায় এবং পেশি সংকুচিত হয়ে হাত সরে যায়। মস্তিষ্কে সংকেত পরে পৌঁছায়, তাই ব্যথা পরে টের পায়।
- লক্ষণগুলো ডায়াবেটিস মেলিটাসের, যা অগ্ন্যাশয়ের আইলেটস অব ল্যাঙ্গারহ্যানসের বিটা কোষ থেকে ইনসুলিন কম তৈরি হলে বা দেহ ইনসুলিনে ঠিকমতো সাড়া না দিলে হয়। তখন গ্লুকোজ কোষে ঢুকতে পারে না, রক্তে জমে, বৃক্ক তা পানিসহ বের করে দেয় বলে ঘন ঘন প্রস্রাব ও পিপাসা হয়, কোষ শক্তি না পাওয়ায় দুর্বলতা আসে। নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ বা ইনসুলিন, চিনি ও শর্করা কম খাওয়া, নিয়মিত হাঁটা ও ব্যায়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত গ্লুকোজ পরীক্ষা জরুরি। এতে হরমোনজনিত সমন্বয়ের ঘাটতি অনেকটা পূরণ হয়।
বাস্তব জীবনে মজার যোগসূত্র
আপনি যখন হোঁচট খেতে খেতে সামলে নেন, তখন সেরিবেলাম মুহূর্তের মধ্যে কয়েক ডজন পেশিকে নির্দেশ দেয়, আপনি টেরও পান না। মায়েলিনযুক্ত দ্রুততম স্নায়ুতে সংকেত চলে প্রায় ১০০ m/s বেগে, অর্থাৎ ঘণ্টায় ৩৬০ কিলোমিটারের কাছাকাছি। আর ঘরে কাঁচা ফল পাকাতে পাকা কলা পাশে রাখার পুরোনো কৌশলটা আসলে একটি গ্যাসীয় হরমোনের খেলা।
প্রশ্ন ও উত্তর
স্নায়বিক ও হরমোনজনিত সমন্বয়ের মূল পার্থক্য কী?
স্নায়বিক সমন্বয় বৈদ্যুতিক ও রাসায়নিক সংকেতে খুব দ্রুত এবং স্বল্পস্থায়ী; হরমোন রক্তের মাধ্যমে ধীরে পৌঁছায় কিন্তু প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী।
প্রতিবর্ত ক্রিয়া কোথায় নিয়ন্ত্রিত হয়?
বেশির ভাগ প্রতিবর্ত ক্রিয়া সুষুম্নাকাণ্ডে নিয়ন্ত্রিত হয়; চোখের পলক বা তারারন্ধ্রের প্রতিবর্তের মতো কিছু প্রতিবর্ত মস্তিষ্ককাণ্ডে নিয়ন্ত্রিত হয়।
অগ্ন্যাশয়কে মিশ্র গ্রন্থি বলা হয় কেন?
এটি নালির মাধ্যমে পাচক রস অন্ত্রে পাঠায় এবং একই সাথে ইনসুলিন ও গ্লুকাগন হরমোন সরাসরি রক্তে ছাড়ে।
আয়োডিনের অভাবে কী হয়?
থাইরক্সিন তৈরি কমে যায়, থাইরয়েড গ্রন্থি ফুলে গলগণ্ড হয়। আয়োডিনযুক্ত লবণ এটি প্রতিরোধ করে।
অক্সিন কৃষিতে কীভাবে কাজে লাগে?
শাখাকলমে দ্রুত মূল গজাতে, অপরিপক্ব ফল ঝরা রোধে এবং বীজহীন ফল উৎপাদনে অক্সিন ব্যবহৃত হয়।
আরও পড়ো
সূত্র: NCTB জীববিজ্ঞান, নবম-দশম শ্রেণি, ১০ম অধ্যায় সমন্বয় · OpenStax Biology 2e — The Nervous System · OpenStax Biology 2e — Plant Hormones