হেঁচকি কেন ওঠে? থামানোর আসল উপায় কী?
· পড়তে ৭ মিনিট · ✓ তথ্য যাচাই করা
ছোট উত্তর · ১০ সেকেন্ডে
হেঁচকি ওঠে যখন বুক আর পেটের মাঝের পেশি ডায়াফ্রাম হঠাৎ নিজে থেকে খিঁচে যায় আর বাতাস জোরে ভেতরে টানে। প্রায় সাথে সাথে গলার স্বরযন্ত্রের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, বাতাস ধাক্কা খায়, আর শব্দ হয় 'হিক'। তাড়াতাড়ি বা বেশি খাওয়া, সোডা, ঝাল খাবার আর উত্তেজনা সাধারণত এর শুরু করে।
ভাত খাচ্ছো, হঠাৎ 'হিক!' গলা থেকে অদ্ভুত একটা শব্দ, বুক একটু ঝাঁকি খেল। তারপর আবার, আবার। কেউ বলবে পানি খাও, কেউ বলবে দম আটকে রাখো, আর দাদি হয়তো হেসে বলবেন, 'কেউ তোকে মনে করছে!' কিন্তু আসলে হেঁচকি কেন ওঠে? শরীরের ভেতরে ঠিক কী ঘটে, আর থামানোর কৌশলগুলো আদৌ কাজ করে কি না, চলো সহজ ভাষায় খুঁজে দেখি।
সংক্ষেপে: হেঁচকি কেন ওঠে?
আমাদের বুক আর পেটের মাঝখানে একটা গম্বুজের মতো পাতলা পেশির পর্দা আছে, নাম ডায়াফ্রাম (মধ্যচ্ছদা)। প্রতিবার শ্বাস নেওয়ার সময় এটা নিচে নামে, ফুসফুসে বাতাস ঢোকে। শ্বাস ছাড়ার সময় আবার উপরে ওঠে। পুরো কাজটা চলে নিয়ম মেনে, ছন্দে ছন্দে।
হেঁচকি হলো এই ছন্দের মাঝে হঠাৎ এক ঝটকা। কোনো কারণে ডায়াফ্রাম নিজের ইচ্ছায় হঠাৎ খিঁচে নিচে নেমে যায়, আর বাতাস জোরে ভেতরে ঢুকতে চায়। ঠিক তার এক মুহূর্ত পরেই গলার ভেতরে স্বরযন্ত্রের দরজা, যাকে বলে গ্লটিস, ধপ করে বন্ধ হয়ে যায়। ছুটে আসা বাতাস সেই বন্ধ দরজায় ধাক্কা খায়, আর তৈরি হয় সেই চেনা 'হিক' শব্দ। ইংরেজিতে হেঁচকিকে বলে hiccup, আর ডাক্তারি নাম singultus।
- ⚡স্নায়ুতে উল্টাপাল্টা সংকেত
পেট ভরা বা ঝাল খাবার স্নায়ুকে উসকে দেয়
- 🫁ডায়াফ্রাম খিঁচে যায়
হঠাৎ নিচে নামে, বাতাস জোরে ঢুকতে চায়
- 🚪গ্লটিস বন্ধ
প্রায় সাথে সাথে গলার দরজা বন্ধ হয়
- 🔊'হিক!'
বাতাস বন্ধ দরজায় ধাক্কা খেয়ে শব্দ
এই পুরো ব্যাপারটা একটা প্রতিবর্ত ক্রিয়া (রিফ্লেক্স), মানে মস্তিষ্ক না ভেবেই করে ফেলে, যেমন হাঁটুতে টোকা দিলে পা লাফিয়ে ওঠে। এর পথে কাজ করে কয়েকটা স্নায়ু: ভেগাস স্নায়ু, যা পেট-গলা থেকে মস্তিষ্কে খবর আনে, আর ফ্রেনিক স্নায়ু, যা মস্তিষ্ক থেকে ডায়াফ্রামে হুকুম নিয়ে যায়। মাঝখানে মস্তিষ্কের নিচের দিকের একটা অংশ পুরো খেলাটা চালায়। এই পথের কোথাও খোঁচা লাগলেই হেঁচকির শুরু।
- ফুসফুস — ফুসফুসের নিচেই ডায়াফ্রাম
- পাকস্থলী — পেট ফুললে ডায়াফ্রামে চাপ
হেঁচকি কী থেকে শুরু হয়?
বেশিরভাগ সময় হেঁচকির পেছনে কোনো রোগ থাকে না, থাকে আমাদের রোজকার কিছু অভ্যাস। মূল কথা হলো, পাকস্থলী হঠাৎ ফুলে গেলে বা গলা-খাদ্যনালিতে জ্বালা লাগলে কাছের স্নায়ুগুলো উত্তেজিত হয়, আর ডায়াফ্রাম ভুল সংকেত পায়। চেনা কারণগুলো দেখো:
- তাড়াতাড়ি খাওয়া বা একবারে অনেক খেয়ে ফেলা। দাওয়াতে বিরিয়ানির প্লেট শেষ করার পর হেঁচকি ওঠা খুব চেনা দৃশ্য।
- খাওয়ার সময় কথা বলা বা গপগপ করে খাওয়া, এতে বাতাসও গিলে ফেলি আর পেট ফোলে।
- সোডা বা কোমল পানীয়, যার গ্যাস পেট ফুলিয়ে দেয়।
- খুব ঝাল খাবার। মরিচের ঝাঁঝ খাদ্যনালি আর গলার স্নায়ুকে উসকে দিতে পারে।
- খুব গরম আর তারপর ঠান্ডা কিছু খাওয়া, বা হঠাৎ তাপমাত্রার পরিবর্তন।
- হঠাৎ উত্তেজনা, ভয় বা খুব হাসাহাসি।
- অ্যালকোহল ও ধূমপানও হেঁচকির পরিচিত কারণ।
জানেন কি?ট্যাপ করে দেখুন
মজার তথ্য: গর্ভের প্রায় নবম সপ্তাহ থেকেই শিশুর হেঁচকি শুরু হতে পারে, মানে শিশু নিজে শ্বাস নেওয়ার অনেক আগেই! লন্ডনের একদল গবেষক নবজাতকের মস্তিষ্কের তরঙ্গ মেপে দেখেছেন, প্রতিটা হেঁচকির পর মস্তিষ্কে বড় একটা সাড়া তৈরি হয়। তাঁদের ধারণা, এভাবেই শিশুর মস্তিষ্ক শ্বাসের পেশিগুলো চিনতে শেখে।
একটা প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়: শরীরের এমন একটা আপাত-অকেজো রিফ্লেক্স কেন আছে? বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিত নন। কেউ মনে করেন, এটা শিশু অবস্থায় শ্বাসের পেশি অনুশীলনের একটা উপায়। কেউ বলেন, দুধ খাওয়া শিশুর পেট থেকে আটকে থাকা বাতাস বের করতে হয়তো এটা সাহায্য করে। আবার কারও ধারণা, এটা আমাদের বহু প্রাচীন পূর্বপুরুষদের শ্বাসপ্রক্রিয়ার একটা রয়ে যাওয়া চিহ্ন। মানে, হেঁচকি কেন ওঠে, তার 'কীভাবে' অংশটা আমরা জানি, কিন্তু 'কী কাজে' অংশটা এখনো একটা খোলা রহস্য।
হেঁচকি থামানোর উপায়: ঘরোয়া কৌশল কেন মাঝে মাঝে কাজ করে
হেঁচকি থামানোর উপায় নিয়ে প্রত্যেক পরিবারেই একটা না একটা 'গোপন কৌশল' আছে। মজার ব্যাপার হলো, এগুলোর বেশিরভাগ নিয়ে বড় কোনো বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা হয়নি। তবু অনেক কৌশল কেন কাজ করে বলে মনে হয়, তার দুটো যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা আছে।
১. রক্তে কার্বন ডাই-অক্সাইড বাড়ানো
দম আটকে রাখলে বা একটা কাগজের ঠোঙায় শ্বাস নিলে-ছাড়লে রক্তে কার্বন ডাই-অক্সাইড একটু বাড়ে। ধারণা করা হয়, এতে ডায়াফ্রাম গভীর আর নিয়মিত শ্বাসের দিকে মন দেয়, আর হেঁচকির খামখেয়ালি ছন্দ ভেঙে যায়। তবে প্লাস্টিকের ব্যাগ কখনো নয়, আর মাথা ঘোরালে সাথে সাথে থামো।
২. স্নায়ুকে 'অন্য কাজে' ব্যস্ত রাখা
ঠান্ডা পানিতে কুলি করা, এক গ্লাস পানি ধীরে ধীরে চুমুক দিয়ে খাওয়া, এক চামচ চিনি বা এক টুকরো লেবু চোষা, জিভ আলতো করে টানা, হাঁটু বুকের দিকে টেনে বসা, এগুলো গলা আর পেটের ভেগাস স্নায়ুকে নতুন একটা সংকেত পাঠায়। স্নায়ু তখন সেই নতুন খবর সামলাতে ব্যস্ত হয়, হেঁচকির রিফ্লেক্স চক্রটা ভেঙে যেতে পারে। কাউকে হঠাৎ চমকে দেওয়ার পুরোনো কৌশলও হয়তো এভাবেই কাজ করে।
- দম আটকে রাখো ১০ থেকে ২০ সেকেন্ড, তারপর ধীরে ছাড়ো।
- ঠান্ডা পানি ধীরে ধীরে চুমুক দিয়ে খাও বা ঠান্ডা পানিতে কুলি করো।
- এক চামচ চিনি জিভে রেখে আস্তে গিলে ফেলো।
- সামনে ঝুঁকে হাঁটু বুকের কাছে এনে কিছুক্ষণ বসো।
- আর কিছু না করলেও চলে: বেশিরভাগ হেঁচকি কয়েক মিনিটে নিজেই থেমে যায়।
সত্যি কথা হলো, হেঁচকি এমনিতেই অল্প সময়ে চলে যায় বলে আমরা ভাবি শেষ যে কৌশলটা করলাম, সেটাই কাজ করেছে। তাই কোনো কৌশলে কাজ না হলে চিন্তার কিছু নেই।
'কেউ মনে করছে': মজার লোকবিশ্বাস
বাংলাদেশে প্রায় সবাই ছোটবেলায় শুনেছে, হেঁচকি কেউ মনে করলে ওঠে। তখন একে একে প্রিয়জনদের নাম বলা হয়, আর যার নাম বলতেই হেঁচকি থামে, সেই নাকি মনে করছিল! মজার ব্যাপার, আশপাশের আরও অনেক দেশেও প্রায় একই রকম বিশ্বাস শোনা যায়।
বিজ্ঞান কী বলে? অন্য কেউ তোমাকে মনে করলে তোমার ডায়াফ্রামে সংকেত যাওয়ার কোনো উপায় নেই। তবে এই খেলাটা মাঝে মাঝে কাজ করে বলে মনে হয় একটা মজার কারণে: নাম ভাবতে গিয়ে মনোযোগ অন্যদিকে যায়, শ্বাস একটু ধীর হয়, আর এর মধ্যে হেঁচকি নিজের সময়েই থেমে যায়। তাই এটা ভালো একটা গল্প, তবে কারণ নয়।
কখন ডাক্তারের কাছে যাবে?
সাধারণ হেঁচকি কয়েক মিনিট থেকে কয়েক ঘণ্টা থাকে এবং কোনো ক্ষতি করে না। কিন্তু হেঁচকি যদি ৪৮ ঘণ্টার বেশি চলে, তাকে বলে দীর্ঘস্থায়ী হেঁচকি। এর পেছনে কখনো কখনো অন্য কোনো সমস্যা থাকতে পারে, যেমন বুকজ্বালা বা অ্যাসিডিটি, স্নায়ুর সমস্যা, কিডনির সমস্যা, বা কোনো ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।
শেষ কথা
তাহলে হেঁচকি কেন ওঠে, উত্তরটা এখন পরিষ্কার: ডায়াফ্রামের হঠাৎ খিঁচুনি, তারপর গলার দরজা বন্ধ হয়ে 'হিক'। এর পেছনে বেশিরভাগ সময় থাকে তাড়াহুড়ো করে খাওয়া, সোডা বা ঝাল খাবার। হেঁচকি থামানোর উপায় হিসেবে দম আটকে রাখা বা ঠান্ডা পানি খাওয়া চেষ্টা করে দেখতে পারো, আর না থামলেও ভয় নেই, শরীর নিজেই সামলে নেয়। শরীর আর কী কী অদ্ভুত কাজ করে জানতে চাইলে পড়ো [ভাত খেলে ঘুম পায় কেন](/articles/rice-makes-you-sleepy), [নবজাতকের শরীরে প্রায় ৩০০ হাড়ের রহস্য](/scheduled/babies-300-bones), আর [অক্টোপাসের তিনটা হৃদপিণ্ড](/facts/octopus-three-hearts)।
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
গর্ভের শিশুরও কি হেঁচকি হয়?
হ্যাঁ। গর্ভের প্রায় নবম সপ্তাহ থেকেই শিশুর হেঁচকি শুরু হতে পারে, আর গর্ভাবস্থার শেষের দিকে অনেক মা পেটে ছোট ছোট ছন্দের ঝাঁকুনি হিসেবে তা টের পান। এটা সাধারণত স্বাভাবিক। গবেষকরা মনে করেন, এভাবে শিশুর মস্তিষ্ক শ্বাসের পেশিকে চিনতে শেখে।
ঘুমের মধ্যে কি হেঁচকি ওঠে?
সাধারণ, অল্প সময়ের হেঁচকি ঘুমালে সাধারণত থেমে যায়। তবে নবজাতক শিশুর ঘুমের মধ্যেও হেঁচকি হতে পারে, সেটা স্বাভাবিক। বড়দের ক্ষেত্রে যে হেঁচকি ঘুমের মধ্যেও চলতে থাকে আর দিনের পর দিন থাকে, তা নিয়ে ডাক্তার দেখানো ভালো।
চিনি খেলে কি হেঁচকি থামে?
এক চামচ শুকনো চিনি গিলে ফেলা একটা পুরোনো ঘরোয়া কৌশল। ১৯৭১ সালে একটা ছোট চিকিৎসা-প্রতিবেদনে কয়েকজনের ক্ষেত্রে কাজ করার কথা বলা হয়েছিল, কিন্তু বড় পরীক্ষায় প্রমাণ মেলেনি। সম্ভবত গলার স্নায়ুকে উত্তেজিত করে বলে মাঝে মাঝে কাজ করে।
সবচেয়ে লম্বা হেঁচকি কত দিন চলেছিল?
গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের চার্লস অসবর্নের হেঁচকি ১৯২২ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত, প্রায় ৬৮ বছর চলেছিল। ধারণা করা হয়, তাঁর মস্তিষ্কের হেঁচকি নিয়ন্ত্রণের অংশে আঘাত লেগেছিল।
হেঁচকি কি বিপজ্জনক?
বেশিরভাগ হেঁচকি পুরোপুরি নিরীহ এবং কয়েক মিনিটে নিজে থেকেই চলে যায়। শুধু ৪৮ ঘণ্টার বেশি চললে বা খাওয়া-ঘুমে সমস্যা করলে তখন চিকিৎসকের পরামর্শ দরকার।
নিজে দেখুন
নিজে দেখো: পরের বার হেঁচকি উঠলে ঘড়ি ধরে এক মিনিটে কতবার 'হিক' হয় গুনে খাতায় লেখো। তারপর দম আটকে রাখা বা ঠান্ডা পানি, যেকোনো একটা কৌশল চেষ্টা করে আবার গোনো। কয়েকবার এভাবে লিখলে নিজেই দেখবে, কোন কৌশল তোমার শরীরে সত্যিই কাজ করে আর কোনটা শুধু সময়ের খেলা!
ছোট্ট যাচাই
কতটা মনে আছে, দেখে নিন
১. হেঁচকি ওঠে কোন পেশি হঠাৎ খিঁচে গেলে?
২. হেঁচকি কত ঘণ্টার বেশি চললে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত?
তথ্যসূত্র
- ১NHS — Hiccups nhs.uk ↗
- ২Cleveland Clinic — Hiccups my.clevelandclinic.org ↗
- ৩MedlinePlus (US NLM) — Hiccups medlineplus.gov ↗
- ৪UCL News 2019 — Newborn baby hiccups could be key to brain development (Whitehead et al., Clinical Neurophysiology) ucl.ac.uk ↗
- ৫Guinness World Records — 68-year attack of hiccups (Charles Osborne) guinnessworldrecords.com ↗
- ৬Engleman et al. 1971, New England Journal of Medicine — Granulated sugar as treatment for hiccups in conscious patients nejm.org ↗
কৃতজ্ঞতা
- তথ্য যাচাই: ২৫ অক্টোবর, ২০২৬