মানবদেহের ১০টি অদ্ভুত তথ্য, যা শুনলে বিশ্বাস হবে না
· পড়তে ৭ মিনিট · ✓ তথ্য যাচাই করা
ছোট উত্তর · ১০ সেকেন্ডে
মানবদেহ বিস্ময়ে ভরা: সকালে আমরা প্রায় এক সেন্টিমিটার লম্বা থাকি, শরীরে ব্যাকটেরিয়া আর নিজের কোষ প্রায় সমান সংখ্যায়, শরীর চোখে দেখা যায় না এমন ক্ষীণ আলো ছড়ায়, কানের স্টেপিস হাড় মাত্র তিন মিলিমিটার, আর যমজদের আঙুলের ছাপও আলাদা। প্রতিটি তথ্যের পেছনে আছে সহজ বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।
আমরা প্রতিদিন যে শরীর নিয়ে ঘুরে বেড়াই, তাকে সবচেয়ে ভালো চিনি বলে মনে করি। অথচ এই শরীরের ভেতরে এমন অনেক কাণ্ড ঘটছে যা শুনলে প্রথমে বিশ্বাস করা কঠিন। সকালে আপনি সন্ধ্যার চেয়ে লম্বা, আপনার শরীর অন্ধকারে আলো ছড়ায়, আর আপনার ভেতরে যত জীবাণু থাকে তা প্রায় আপনার নিজের কোষের সমান। এখানে রইল মানবদেহের দশটি অদ্ভুত তথ্য, প্রতিটির পেছনে বিজ্ঞানের সহজ ব্যাখ্যাসহ।
১. সকালে আপনি সন্ধ্যার চেয়ে লম্বা
ঘুম থেকে উঠে মাপলে আর রাতে শোয়ার আগে মাপলে উচ্চতায় প্রায় এক সেন্টিমিটারের পার্থক্য পাওয়া যায়। কারণ আমাদের মেরুদণ্ডের হাড়গুলোর মাঝে নরম, স্পঞ্জের মতো চাকতি থাকে। সারাদিন দাঁড়ানো, হাঁটা আর বসার সময় শরীরের ওজন এই চাকতিগুলোকে চেপে ধরে, ভেতরের পানি একটু বেরিয়ে যায়। রাতে শুয়ে থাকলে চাপ সরে যায়, চাকতি আবার পানি টেনে ফুলে ওঠে। মহাকাশচারীরা মাধ্যাকর্ষণহীন অবস্থায় কয়েক সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়ে যান একই কারণে, পৃথিবীতে ফিরলে আবার আগের মাপে ফেরেন।
২. শরীরে জীবাণু আর নিজের কোষ প্রায় সমান সমান
বহু বছর ধরে বলা হতো, মানুষের শরীরে নিজের কোষের চেয়ে দশ গুণ বেশি ব্যাকটেরিয়া থাকে। ২০১৬ সালে ইসরায়েলের একদল বিজ্ঞানী নতুন করে হিসাব কষে দেখান, সংখ্যাটা আসলে কাছাকাছি। গড় ওজনের একজন প্রাপ্তবয়স্কের শরীরে প্রায় ৩০ লাখ কোটি মানব কোষ, আর প্রায় ৩৮ লাখ কোটি ব্যাকটেরিয়া। এদের বেশিরভাগ থাকে বৃহদন্ত্রে। আরও মজার ব্যাপার, আমাদের নিজের কোষের বেশিরভাগই লোহিত রক্তকণিকা। তবে ব্যাকটেরিয়া এত ছোট যে সব মিলিয়ে ওজন মাত্র দুইশো গ্রামের মতো।
জানেন কি?ট্যাপ করে দেখুন
মজার তথ্য: হিসাবটা এত কাছাকাছি যে একবার মলত্যাগ করলেই শরীরে ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়, আর কিছু সময়ের জন্য নিজের কোষই সংখ্যায় এগিয়ে যেতে পারে।
৩. আপনার শরীর অন্ধকারে আলো ছড়ায়
জোনাকির মতো না হলেও মানুষের শরীরও আলো ছাড়ে। ২০০৯ সালে জাপানের গবেষকরা অন্ধকার ঘরে অতি সংবেদনশীল ক্যামেরা দিয়ে কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবকের ছবি তোলেন। দেখা যায়, মুখমণ্ডল থেকে সবচেয়ে বেশি ক্ষীণ আলো বের হয়, আর দিনের বেলার একটি নির্দিষ্ট সময়ে তা বাড়ে, রাতে কমে। এর উৎস কোষের ভেতরের রাসায়নিক বিক্রিয়া, যেখানে কিছু অণু শক্তি ছাড়তে গিয়ে আলোর কণা তৈরি করে। কিন্তু এই আলো আমাদের চোখের দেখার ক্ষমতার প্রায় হাজার গুণ দুর্বল, তাই কেউ কোনোদিন খালি চোখে দেখতে পাবে না।
৪. শরীরের সবচেয়ে ছোট হাড় একটা চালের দানার চেয়েও ছোট
কানের ভেতরে তিনটি ছোট্ট হাড় শব্দের কম্পনকে কানের পর্দা থেকে অন্তঃকর্ণে পৌঁছে দেয়। এদের মধ্যে সবচেয়ে ছোটটির নাম স্টেপিস, দেখতে ঘোড়ায় চড়ার রেকাবের মতো। এর দৈর্ঘ্য মাত্র তিন মিলিমিটারের কাছাকাছি। অথচ এই পুঁচকে হাড় ছাড়া আমরা স্বাভাবিকভাবে শুনতে পারতাম না। উল্টো দিকে, সবচেয়ে বড় হাড় হলো ঊরুর হাড় বা ফিমার, যা একজন মানুষের উচ্চতার প্রায় এক-চতুর্থাংশ।
৫. নবজাতকের হাড় বেশি, বড়দের কম
একজন প্রাপ্তবয়স্কের শরীরে ২০৬টি হাড় থাকে, কিন্তু নবজাতকের শরীরে হাড় ও তরুণাস্থি মিলিয়ে প্রায় ৩০০টি টুকরো থাকে। বড় হওয়ার সাথে সাথে অনেকগুলো জুড়ে একটা হয়ে যায়। সবচেয়ে চেনা উদাহরণ মাথার খুলি। জন্মের সময় খুলির হাড়গুলোর মাঝে নরম ফাঁক থাকে, যাতে জন্মের পথে মাথা একটু চেপে বেরোতে পারে আর পরে মস্তিষ্ক বাড়ার জায়গা পায়। কয়েক বছরের মধ্যে ফাঁকগুলো বন্ধ হয়ে হাড় জুড়ে যায়।
৬. যমজদেরও আঙুলের ছাপ আলাদা
একই ডিম্বাণু থেকে জন্ম নেওয়া যমজদের ডিএনএ প্রায় হুবহু এক। তবু তাদের আঙুলের ছাপ মেলে না। কারণ আঙুলের ছাপ শুধু জিনের নির্দেশে তৈরি হয় না। গর্ভের তৃতীয় থেকে চতুর্থ মাসে আঙুলের ডগার চামড়ায় ভাঁজ তৈরি হয়, আর তখন গর্ভে শিশুর অবস্থান, চারপাশের তরলের চাপ, আঙুলের বৃদ্ধির গতি, এসব সামান্য পার্থক্য প্রত্যেকের জন্য আলাদা নকশা এঁকে দেয়। তাই পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের মধ্যে আপনার আঙুলের ছাপ শুধু আপনারই।
৭. পাকস্থলীর অ্যাসিড ধাতুও ক্ষয় করতে পারে
খাবার হজমের জন্য পাকস্থলী হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড তৈরি করে। খালি পেটে এর অম্লতা প্রায় পিএইচ ১.৫ থেকে ৩.৫, অর্থাৎ লেবুর রসের মতো বা তার চেয়েও কড়া, এবং কিছু ধাতুকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করতে পারে। তাহলে পাকস্থলী নিজে গলে যায় না কেন? এর দেয়াল সারাক্ষণ ঘন শ্লেষ্মা তৈরি করে একটা সুরক্ষা আস্তরণ বানায়, আর সেই শ্লেষ্মা অ্যাসিডকে প্রশমিত করার উপাদানও ধরে রাখে। এই ভারসাম্য নষ্ট হলেই আলসারের মতো সমস্যা দেখা দেয়।
৮. অন্ত্রের আস্তরণ কয়েক দিন পরপর নতুন হয়
আমাদের ক্ষুদ্রান্ত্রের ভেতরের দেয়ালের কোষগুলো প্রতিদিন অ্যাসিড, এনজাইম আর খাবারের ঘষা সহ্য করে। তাই এরা বেশিদিন টেকে না। এই আস্তরণের কোষগুলো মোটামুটি তিন থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে ঝরে পড়ে আর নিচ থেকে নতুন কোষ উঠে এসে জায়গা নেয়। চামড়ার বাইরের স্তরও কয়েক সপ্তাহে বদলে যায়। অর্থাৎ আয়নায় যে মুখ দেখেন, তার উপরের স্তরটা কয়েক সপ্তাহ আগের মুখ নয়।
৯. গায়ে কাঁটা দেওয়া পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া চিহ্ন
ঠান্ডা লাগলে বা দারুণ কোনো গান শুনলে গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়। প্রতিটি লোমের গোড়ায় একটা ছোট্ট পেশি থাকে, যা সংকুচিত হলে লোম দাঁড়িয়ে যায় আর চামড়ায় ছোট ছোট উঁচু বিন্দু ফুটে ওঠে। ঘন লোমওয়ালা প্রাণীদের জন্য এটা খুব কাজের: লোম ফুলে উঠলে গায়ের কাছে গরম বাতাসের স্তর আটকে থাকে, আবার ভয় পেলে শরীর বড় দেখায়। আমাদের শরীরের লোম এত পাতলা যে এই সুবিধা আর তেমন কাজে লাগে না, তবু প্রতিবর্তটা রয়ে গেছে।
১০. নাক হয়তো লাখ কোটি গন্ধ আলাদা করতে পারে
আগে বলা হতো মানুষ প্রায় দশ হাজার রকম গন্ধ চিনতে পারে। ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একদল গবেষক স্বেচ্ছাসেবকদের বিভিন্ন গন্ধের মিশ্রণ শুঁকিয়ে পরীক্ষা করেন, আর সেই ফল থেকে হিসাব করেন যে আমাদের নাক অন্তত এক লাখ কোটি গন্ধের মিশ্রণ আলাদা করতে পারে। সংখ্যাটা নিয়ে অন্য বিজ্ঞানীরা প্রশ্নও তুলেছেন, কারণ হিসাবের পদ্ধতির ওপর ফল অনেক বদলায়। তবে একটা বিষয়ে সবাই একমত: মানুষের ঘ্রাণশক্তি আমরা যতটা দুর্বল ভাবতাম, আসলে ততটা নয়।
- সকালে লম্বা: মেরুদণ্ডের চাকতি রাতে ফুলে ওঠে।
- জীবাণু ও নিজের কোষ: প্রায় সমান সংখ্যায়।
- শরীরের আলো: আছে, তবে চোখে দেখার অযোগ্য ক্ষীণ।
- সবচেয়ে ছোট হাড়: কানের স্টেপিস, প্রায় ৩ মিলিমিটার।
- নবজাতক: প্রায় ৩০০ টুকরো, বড়দের ২০৬টি হাড়।
- আঙুলের ছাপ: যমজদেরও আলাদা।
- পাকস্থলীর অ্যাসিড: শ্লেষ্মার আস্তরণে নিজেকে বাঁচায়।
- অন্ত্রের আস্তরণ: কয়েক দিনে নতুন।
- গায়ে কাঁটা: লোমওয়ালা পূর্বপুরুষদের উত্তরাধিকার।
- ঘ্রাণশক্তি: ধারণার চেয়ে অনেক শক্তিশালী।
এই তথ্যগুলোর বেশিরভাগ আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পরেও সত্য থাকবে, কারণ এগুলো কোনো খবর বা প্রবণতা নয়, বরং মানুষের শরীরের গঠন আর কাজের মৌলিক নিয়ম। তবে বিজ্ঞান সবসময় নতুন প্রমাণের জন্য খোলা থাকে। যেমন জীবাণুর সংখ্যা বা ঘ্রাণশক্তির হিসাব নতুন পদ্ধতিতে আরও নিখুঁত হতে পারে। তাই কোনো চমকপ্রদ সংখ্যা শুনলে জিজ্ঞেস করুন, এটা কে মেপেছে, কীভাবে মেপেছে।
শেষ কথা
মানবদেহ একটা চলমান কারখানা, যেখানে প্রতি মুহূর্তে কোষ বদলাচ্ছে, হাড় নিজেকে সারাচ্ছে, আর কোটি কোটি জীবাণুর সাথে আমরা একসাথে বাস করছি। এই অদ্ভুত তথ্যগুলো মনে করিয়ে দেয়, নিজের শরীরকে চেনার কাজ কখনো শেষ হয় না। শরীরের আরও রহস্য জানতে পড়ুন [হেঁচকি কেন ওঠে](/articles/why-hiccups-happen) আর [ভাত খেলে ঘুম পায় কেন](/articles/rice-makes-you-sleepy)।
নিজে দেখুন
নিজে দেখুন: সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে মাথার উচ্চতায় পেন্সিলের হালকা দাগ দিন। রাতে শোয়ার আগে একই ভাবে আবার মাপুন। দুই দাগের ফাঁকটাই আপনার মেরুদণ্ডের চাকতির দিনভর চেপে যাওয়ার মাপ।
ছোট্ট যাচাই
কতটা মনে আছে, দেখে নিন
১. সকালে আমরা কেন একটু বেশি লম্বা থাকি?
২. শরীরের সবচেয়ে ছোট হাড় কোথায় থাকে?
তথ্যসূত্র
- ১Sender, Fuchs & Milo 2016, PLOS Biology — Revised estimates for the number of human and bacteria cells in the body journals.plos.org ↗
- ২Kobayashi et al. 2009, PLOS ONE — Imaging of ultraweak spontaneous photon emission from human body journals.plos.org ↗
- ৩Bushdid et al. 2014, Science — Humans can discriminate more than 1 trillion olfactory stimuli science.org ↗
- ৪Library of Congress — Everyday Mysteries: Are you taller in the morning than at night? loc.gov ↗
কৃতজ্ঞতা
- তথ্য যাচাই: ১ নভেম্বর, ২০২৬