ডিএনএ কী? আপনার শরীরের রেসিপি বই
· পড়তে ৮ মিনিট · ✓ তথ্য যাচাই করা
ছোট উত্তর · ১০ সেকেন্ডে
ডিএনএ হলো প্রায় প্রতিটি কোষের নিউক্লিয়াসে গুটিয়ে রাখা পেঁচানো মইয়ের মতো একটি লম্বা অণু। এতে A, T, G, C এই চারটি রাসায়নিক অক্ষরে শরীর গড়া ও চালানোর সব নির্দেশ লেখা থাকে। কোষ এই নির্দেশ পড়ে প্রোটিন বানায়, তাই একে শরীরের রেসিপি বই বলা হয়।
আপনার চোখের রং, চুল কোঁকড়া না সোজা, কোন খাবারে পেট ফাঁপে, এমনকি কিছু রোগের ঝুঁকি, এসবের নির্দেশনা লেখা আছে শরীরের প্রায় প্রতিটি কোষের ভেতরে। সেই লেখার নাম ডিএনএ। একে অনেকে বলেন শরীরের রেসিপি বই, আর তুলনাটা আশ্চর্যরকম ঠিক। একটা রেসিপি বইয়ে যেমন অক্ষর দিয়ে শব্দ, শব্দ দিয়ে রেসিপি লেখা থাকে, ডিএনএ-তেও তেমনি চারটি রাসায়নিক 'অক্ষর' দিয়ে লেখা থাকে হাজার হাজার প্রোটিন বানানোর নির্দেশ। চলুন দেখি, এই বইটা দেখতে কেমন, কোথায় রাখা থাকে, আর কীভাবে পড়া হয়।
সংক্ষেপে: ডিএনএ কী?
ডিএনএ-র পুরো নাম ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড। এটা একটা অতি লম্বা, সরু অণু, দেখতে পেঁচানো মইয়ের মতো। বিজ্ঞানীরা এই আকৃতিকে বলেন ডাবল হেলিক্স বা দ্বি-সর্পিল। মইয়ের দুই পাশের রেলিং তৈরি চিনি আর ফসফেট দিয়ে, আর মাঝের প্রতিটি ধাপ তৈরি দুটি করে 'বেস' জোড়া লেগে।
বেস মোট চার রকম: অ্যাডেনিন (A), থাইমিন (T), গুয়ানিন (G) আর সাইটোসিন (C)। এদের জোড়া বাঁধার নিয়ম খুব কড়া: A সবসময় T-এর সাথে, আর G সবসময় C-এর সাথে। এই নিয়মের কারণে মইয়ের এক পাশ জানলেই অন্য পাশটা নিখুঁতভাবে বলে দেওয়া যায়। ডিএনএ নিজের কপি বানানোর সময় ঠিক এই সুবিধাটাই কাজে লাগায়।
জানেন কি?ট্যাপ করে দেখুন
মজার তথ্য: একটি মানব কোষের সব ডিএনএ টেনে সোজা করলে লম্বায় প্রায় দুই মিটার হয়। অথচ সেটা গুটিয়ে রাখা থাকে এমন এক নিউক্লিয়াসে, যার ব্যাস এক মিলিমিটারের একশো ভাগের এক ভাগেরও কম। শরীরের সব কোষের ডিএনএ জোড়া দিলে তা পৃথিবী থেকে সূর্য পর্যন্ত বহুবার যাওয়া-আসা করার মতো লম্বা হবে।
রেসিপি বইয়ের তুলনা: অক্ষর, শব্দ, অধ্যায়
ডিএনএ-কে রেসিপি বই ভাবলে পুরো ব্যাপারটা সাজানো যায় খুব সহজে। নিচের তালিকাটা দেখুন:
- অক্ষর: চারটি বেস, A, T, G, C। পুরো বইটা লেখা মাত্র এই চার অক্ষরে।
- শব্দ: পরপর তিনটি বেস মিলে একটি 'কোডন'। প্রতিটি কোডন একটি নির্দিষ্ট অ্যামিনো অ্যাসিড বোঝায়, বা বলে দেয় 'এখানে শুরু' কিংবা 'এখানে শেষ'।
- রেসিপি: একটি জিন। জিন হলো ডিএনএ-র এমন একটা অংশ, যেখানে একটি প্রোটিন বা কার্যকর অণু বানানোর পুরো নির্দেশ থাকে।
- অধ্যায়: ক্রোমোজোম। মানুষের কোষে ডিএনএ ভাগ হয়ে থাকে ৪৬টি ক্রোমোজোমে, অর্থাৎ ২৩ জোড়া। প্রতিটি জোড়ার একটি আসে মায়ের কাছ থেকে, একটি বাবার কাছ থেকে।
- পুরো বই: জিনোম। একজন মানুষের সম্পূর্ণ ডিএনএ সেট, যেখানে প্রায় ৩০০ কোটি বেস-জোড়া আছে।
ভাবুন তো, ৩০০ কোটি অক্ষর! প্রতি পৃষ্ঠায় তিন হাজার অক্ষর ধরে ছাপালে প্রায় দশ লাখ পৃষ্ঠার বই হবে। আর এই বইয়ের একটা পূর্ণ কপি থাকে আপনার শরীরের প্রায় প্রতিটি কোষে। ব্যতিক্রম আছে অবশ্য: পরিণত লোহিত রক্তকণিকায় নিউক্লিয়াস থাকে না, তাই সেখানে ডিএনএ-ও নেই।
রেসিপি থেকে খাবার: ডিএনএ কীভাবে কাজ করে
রেসিপি বই নিজে রান্না করে না; কাউকে সেটা পড়ে রান্না করতে হয়। কোষেও ঠিক তাই। ডিএনএ থাকে নিউক্লিয়াসের ভেতরে সুরক্ষিত, অনেকটা দামি মূল বইয়ের মতো, যেটা রান্নাঘরে নেওয়া হয় না। দরকারি রেসিপিটার একটা কাজের কপি বানানো হয়, যার নাম মেসেঞ্জার আরএনএ (mRNA)। এই কপি বানানোর ধাপকে বলে ট্রান্সক্রিপশন।
এরপর সেই কপি নিউক্লিয়াস থেকে বেরিয়ে যায় কোষের 'রান্নাঘরে', যেখানে রাইবোসোম নামের ক্ষুদ্র যন্ত্র তিন অক্ষর করে পড়ে আর প্রতিটি কোডন অনুযায়ী একটি করে অ্যামিনো অ্যাসিড জোড়া দেয়। এই ধাপের নাম ট্রান্সলেশন। শেষে অ্যামিনো অ্যাসিডের লম্বা শিকলটি ভাঁজ হয়ে তৈরি হয় প্রোটিন। হিমোগ্লোবিন অক্সিজেন বয়ে নেয়, কেরাটিন চুল-নখ বানায়, ইনসুলিন রক্তের চিনি সামলায়, আর এনজাইমেরা হজম থেকে শুরু করে প্রায় সব রাসায়নিক কাজ চালায়। এরা সবাই প্রোটিন, সবার রেসিপি লেখা ডিএনএ-তে।
জানেন কি?ট্যাপ করে দেখুন
অবাক করা তথ্য: মানুষের জিনোমে প্রোটিন বানানোর জিন মাত্র প্রায় ২০ হাজার, আর এরা মিলে পুরো ডিএনএ-র মাত্র এক থেকে দুই শতাংশ জুড়ে আছে। বাকি বড় অংশের অনেকটা জিন কখন, কোথায়, কতটা চালু হবে তা নিয়ন্ত্রণ করে। অনেকটা রেসিপির পাশে লেখা নোটের মতো: 'শুধু উৎসবে বানাও', 'অল্প আঁচে রাঁধো'।
একই বই, তবু প্রতিটি কোষ আলাদা কেন?
আপনার চোখের কোষ আর পায়ের পাতার চামড়ার কোষে একই ডিএনএ। তাহলে একটা আলো দেখে, আরেকটা শক্ত চামড়া বানায় কেন? কারণ প্রতিটি কোষ পুরো বই পড়ে না, শুধু নিজের দরকারি পাতাগুলো খোলে। বাকি পাতা থাকে বন্ধ। কোন জিন চালু আর কোনটা বন্ধ থাকবে, তা ঠিক করে নানা রাসায়নিক চিহ্ন আর নিয়ন্ত্রক প্রোটিন। এই চালু-বন্ধের খেলার বিজ্ঞানকে বলে এপিজেনেটিক্স। খাদ্য, বয়স, পরিবেশের মতো বিষয়ও কিছু কিছু চিহ্নকে প্রভাবিত করতে পারে, যদিও মূল লেখা অর্থাৎ বেসের ক্রম বদলায় না।
আপনি কতটা অনন্য?
যেকোনো দুজন মানুষের ডিএনএ প্রায় ৯৯.৯ শতাংশ একই। মাত্র ০.১ শতাংশের পার্থক্য, কিন্তু ৩০০ কোটি অক্ষরের ০.১ শতাংশ মানে প্রায় ত্রিশ লাখ জায়গায় অমিল। এই ছোট ছোট পার্থক্যই ঠিক করে দেয় আমাদের উচ্চতা, গায়ের রং, কিছু রোগের ঝুঁকি আর আরও অনেক বৈশিষ্ট্য। একমাত্র ব্যতিক্রম অভিন্ন যমজ, যারা একই নিষিক্ত ডিম থেকে আসে, তাই জন্মের সময় তাদের ডিএনএ প্রায় হুবহু এক।
এই অনন্যতার জন্যই ডিএনএ পরীক্ষা দিয়ে অপরাধী শনাক্ত করা যায়, পিতৃত্ব নিশ্চিত করা যায়, দুর্ঘটনায় হারানো মানুষের পরিচয় বের করা যায়। আবার তুলনামূলকভাবে দেখলে, শিম্পাঞ্জির সাথে আমাদের ডিএনএ-র মিল প্রায় ৯৮ থেকে ৯৯ শতাংশ, আর একটা কলাগাছের সাথেও অনেক মৌলিক জিন মিলে যায়। কারণ সব জীবই একই চার অক্ষরের ভাষায় লেখা, আর কোষ চালানোর অনেক মৌলিক রেসিপি সবার কাছেই প্রায় এক।
ছাপার ভুল: মিউটেশন
প্রতিবার কোষ বিভাজনের সময় পুরো ৩০০ কোটি অক্ষরের বই নতুন করে কপি করতে হয়। কোষের কপি-যন্ত্র অসাধারণ নিখুঁত, নিজেই ভুল ধরে ঠিকও করে। তবু মাঝে মাঝে একটা-দুটো অক্ষর বদলে যায়, বাদ পড়ে বা বেশি ঢুকে যায়। এগুলোকে বলে মিউটেশন। সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি, তামাকের ধোঁয়া বা কিছু রাসায়নিকও ডিএনএ-তে ক্ষতি করে মিউটেশনের ঝুঁকি বাড়ায়।
বেশিরভাগ মিউটেশন কোনো প্রভাবই ফেলে না, কারণ সেগুলো এমন জায়গায় ঘটে যেখানে বড় কোনো নির্দেশ লেখা নেই। কিছু মিউটেশন ক্ষতিকর, যেমন থ্যালাসেমিয়া বা সিকেল সেল রোগের পেছনে হিমোগ্লোবিন জিনের পরিবর্তন থাকে। আবার কিছু মিউটেশন কাজেও লাগে। লাখ লাখ বছর ধরে এমন ছোট ছোট পরিবর্তন জমেই জীবজগতে এত বৈচিত্র্য এসেছে। মানে, ছাপার ভুলই বিবর্তনের কাঁচামাল।
কীভাবে আমরা ডিএনএ চিনলাম
ডিএনএ প্রথম আলাদা করেন সুইস বিজ্ঞানী ফ্রিডরিখ মিশার, ১৮৬৯ সালে, যদিও তখন কেউ জানত না এটা কী কাজ করে। প্রায় আশি বছর পর পরীক্ষায় দেখা গেল, বংশগতির তথ্য বহন করে ডিএনএ-ই। ১৯৫৩ সালে জেমস ওয়াটসন আর ফ্রান্সিস ক্রিক ডাবল হেলিক্স মডেল প্রকাশ করেন। সেই মডেল তৈরিতে রোজালিন্ড ফ্র্যাংকলিনের তোলা এক্স-রে ছবি, বিশেষ করে বিখ্যাত 'ফটো ৫১', ছিল অপরিহার্য, যদিও তাঁর অবদান বহু বছর যথাযথ স্বীকৃতি পায়নি। এরপর ২০০৩ সালে আন্তর্জাতিক হিউম্যান জিনোম প্রকল্প মানুষের প্রায় পুরো ডিএনএ-র ক্রম পড়ে শেষ করে।
ডিএনএ এত ছোট জায়গায় আঁটে কীভাবে?
দুই মিটার লম্বা সুতো একটা আণুবীক্ষণিক বলের ভেতরে ঢোকানো সহজ কাজ নয়। কোষ এটা করে খুব গোছানো উপায়ে। ডিএনএ প্রথমে হিস্টোন নামের ছোট ছোট প্রোটিনের চারপাশে পেঁচিয়ে যায়, অনেকটা সুতো যেমন নাটাইয়ে প্যাঁচানো থাকে। এই নাটাইগুলো পাশাপাশি সাজিয়ে দেখতে হয় মালার পুঁতির মতো। তারপর সেই মালা আবার পাকিয়ে, ভাঁজ করে, আরও ঘন হয়ে তৈরি হয় ক্রোমোজোম।
এই প্যাঁচানো শুধু জায়গা বাঁচানোর জন্য নয়। যে অংশ শক্ত করে প্যাঁচানো, সেখানকার জিন সাধারণত পড়া যায় না; যে অংশ একটু ঢিলা, সেখানকার জিন সহজে চালু হয়। মানে, বইয়ের কোন পাতা খোলা থাকবে আর কোনটা আঠা দিয়ে আটকানো থাকবে, তা অনেকটাই নির্ভর করে এই গোছানোর ধরনের ওপর। কোষ বিভাজনের ঠিক আগে ক্রোমোজোম সবচেয়ে বেশি ঘন হয়, তখনই অণুবীক্ষণ যন্ত্রে এদের পরিচিত X-এর মতো আকৃতিতে দেখা যায়।
শেষ কথা
তাহলে ডিএনএ কী? এটা চার অক্ষরে লেখা একটা বিশাল রেসিপি বই, যেটা আপনার প্রায় প্রতিটি কোষে গুটিয়ে রাখা আছে। কোষ সেখান থেকে দরকারি রেসিপি কপি করে প্রোটিন বানায়, আর সেই প্রোটিনেরাই গড়ে তোলে ও চালায় আপনার শরীর। বইটা আপনি পেয়েছেন অর্ধেক মায়ের কাছ থেকে, অর্ধেক বাবার কাছ থেকে, আর তার মিশ্রণটা পৃথিবীতে কেবল আপনারই। পরের বার আয়নায় তাকালে মনে রাখবেন, আপনি এক অর্থে প্রায় ৩০০ কোটি অক্ষরের একটা চলমান গল্প।
নিজে দেখুন
নিজে দেখুন: এক চিমটি লবণ, দু-ফোঁটা থালাবাসন ধোয়ার তরল আর অল্প পানিতে কয়েকটা থেঁতো করা স্ট্রবেরি বা পাকা কলা মিশিয়ে ছেঁকে নিন। তারপর গ্লাসের কিনারা বেয়ে খুব ঠান্ডা অ্যালকোহল (রাবিং অ্যালকোহল) আস্তে ঢালুন। কয়েক মিনিটে দুই স্তরের মাঝখানে সাদা সুতোর মতো যে জিনিস ভেসে উঠবে, সেটা হাজার হাজার কোষের ডিএনএ-র জট। অ্যালকোহল দাহ্য, আগুন থেকে দূরে রাখুন।
ছোট্ট যাচাই
কতটা মনে আছে, দেখে নিন
১. ডিএনএ-র চার অক্ষরের জোড়া বাঁধার নিয়ম কোনটা?
২. একটি মানব কোষের সব ডিএনএ টেনে সোজা করলে লম্বায় কত হবে?
তথ্যসূত্র
- ১NIH National Human Genome Research Institute — Deoxyribonucleic Acid (DNA) Fact Sheet genome.gov ↗
- ২MedlinePlus Genetics (US NLM) — What is DNA? medlineplus.gov ↗
- ৩NHGRI — Human Genome Project FAQ genome.gov ↗
- ৪Nature Education Scitable — Discovery of DNA Structure and Function: Watson and Crick nature.com ↗
কৃতজ্ঞতা
- তথ্য যাচাই: ১ নভেম্বর, ২০২৬