ভূমিকম্প কেন হয়? পায়ের নিচের প্লেটের গল্প
· পড়তে ৮ মিনিট · ✓ তথ্য যাচাই করা
ছোট উত্তর · ১০ সেকেন্ডে
ভূমিকম্প হয় কারণ পৃথিবীর বাইরের শক্ত খোসা কয়েকটা টেকটোনিক প্লেটে ভাগ করা, যেগুলো বছরে কয়েক সেন্টিমিটার করে সরে। প্লেটের সীমানায় পাথর আটকে গিয়ে বছরের পর বছর চাপ জমে। চাপ সীমা ছাড়ালে ফল্ট বরাবর পাথর হঠাৎ পিছলে যায়, আর জমা শক্তি কম্পন-তরঙ্গ হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
হঠাৎ খাট দুলে উঠল, ফ্যান কাঁপছে, ফোনে সবাই লিখছে 'টের পেলে?' ঠিক তখনই মাথায় আসে প্রশ্নটা: ভূমিকম্প কেন হয়? মাটি তো শক্ত, স্থির — সে হঠাৎ নড়ে ওঠে কেন? উত্তরটা লুকিয়ে আছে আমাদের পায়ের অনেক নিচে, বিশাল পাথরের কিছু টুকরোর ধীর কিন্তু থামতে-না-জানা চলাফেরায়। চলো, সহজ ভাষায় পুরো গল্পটা শুনি।
সংক্ষেপে ভূমিকম্প কেন হয়: প্লেট আটকে থাকে, হঠাৎ ছুটে যায়
পৃথিবীর বাইরের শক্ত খোসাটা কয়েকটা বড় টুকরোয় ভাগ করা, এদের বলে টেকটোনিক প্লেট। প্লেটগুলো খুব ধীরে, বছরে মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার করে সরে — মোটামুটি তোমার নখ যত দ্রুত বাড়ে, তত। কিন্তু দুই প্লেটের সীমানায় পাথরগুলো ঘষা খেয়ে আটকে যায়। প্লেট সরতেই থাকে, আটকে থাকা জায়গায় চাপ জমতে থাকে বছরের পর বছর, এমনকি শত বছর।
একদিন সেই চাপ পাথরের সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়। আটকে থাকা অংশ হঠাৎ পিছলে যায়, আর জমানো শক্তি কম্পন-তরঙ্গ হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। সেই তরঙ্গ যখন আমাদের পায়ের নিচে পৌঁছায়, আমরা বলি: ভূমিকম্প হচ্ছে। একটা রাবারের স্কেল বাঁকিয়ে ছেড়ে দিলে যেমন চট করে ছিটকে কাঁপে, ব্যাপারটা অনেকটা তেমন।
- ➡️প্লেট সরে
- 🔒সীমানায় আটকে যায়
- ⏳চাপ জমে
- 💥হঠাৎ পিছলায়
- 🌊তরঙ্গ ছড়ায়
পৃথিবীর খোসা: টেকটোনিক প্লেট
পৃথিবীকে একটা সেদ্ধ ডিমের মতো ভাবো, যার খোসায় ফাটল ধরেছে। ওপরের শক্ত স্তরটা (ভূত্বক আর তার নিচের ম্যান্টলের শক্ত অংশ মিলে) গড়ে অন্তত ৮০ কিলোমিটার পুরু, আর সেটা কয়েকটা বড় প্লেট আর অনেকগুলো ছোট প্লেটে ভাঙা। এই প্লেটগুলো ভাসছে নিচের গরম, ধীরে প্রবাহিত হওয়া পাথরের স্তরের ওপর।
প্লেটগুলো তিনভাবে একে অপরের সাথে মেলে। কোথাও দুটো প্লেট দূরে সরে যায়, যেমন আটলান্টিক মহাসাগরের মাঝখানে। কোথাও একটা আরেকটার নিচে ঢুকে যায়, একে বলে সাবডাকশন। আবার কোথাও দুটো প্লেট পাশাপাশি ঘষে চলে যায়। পৃথিবীর বেশিরভাগ ভূমিকম্প হয় এই সীমানাগুলোর কাছেই। প্রশান্ত মহাসাগরের চারপাশে যে 'আগুনের বলয়', সেখানেই পৃথিবীর বড় ভূমিকম্পগুলোর বেশিরভাগ হয়।
টেকটোনিক প্লেট এত ধীরে চলে যে আমরা টের পাই না, কিন্তু লাখো বছরে তারা মহাদেশ বদলে দেয়। ভারত একসময় এশিয়া থেকে আলাদা ছিল; উত্তরে সরে এশিয়ায় ধাক্কা দিয়েই হিমালয় তৈরি হয়েছে। সেই ধাক্কা আজও চলছে, আর তার একটা ফল আমাদের অঞ্চলের ভূমিকম্প।
ফল্ট, কেন্দ্র আর উপকেন্দ্র
পাথরের যে ফাটল বরাবর দুই পাশ একে অপরের সাপেক্ষে সরে, তাকে বলে ফল্ট বা চ্যুতি। ভূমিকম্প মানে আসলে কোনো ফল্টে হঠাৎ পিছলে যাওয়া।
কেন্দ্র (হাইপোসেন্টার)
মাটির নিচে ঠিক যে বিন্দু থেকে পিছলানো শুরু হয়, সেটা ভূমিকম্পের কেন্দ্র। এটা কয়েক কিলোমিটার থেকে কয়েকশো কিলোমিটার গভীরে হতে পারে। সাধারণভাবে, অগভীর ভূমিকম্প ওপরে বেশি ঝাঁকুনি দেয়।
উপকেন্দ্র (এপিসেন্টার)
কেন্দ্রের ঠিক সোজা ওপরে, মাটির পৃষ্ঠের বিন্দুটা হলো উপকেন্দ্র। খবরে যখন বলে 'উপকেন্দ্র অমুক জায়গায়', তার মানে এই বিন্দু। সাধারণত উপকেন্দ্রের কাছে কম্পন সবচেয়ে জোরালো হয়।
কম্পন ছড়ায় কয়েক রকম তরঙ্গে। প্রথমে আসে দ্রুতগামী P-তরঙ্গ, যা হালকা ধাক্কার মতো লাগে। তারপর আসে ধীর S-তরঙ্গ আর পৃষ্ঠতরঙ্গ, এগুলোই দোলায় বেশি আর ক্ষতিও বেশি করে। দুটো তরঙ্গের পৌঁছানোর সময়ের ফারাক মেপেই বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন ভূমিকম্প কত দূরে হয়েছে।
মাত্রা আর তীব্রতা: রিখটার নিয়ে ভুল ধারণা
রিখটার স্কেল মানে কি? ১৯৩৫ সালে চার্লস রিখটার ভূমিকম্পের আকার মাপার একটা পদ্ধতি বানান। নামটা এত জনপ্রিয় হয়েছে যে আজও সবাই বলে 'রিখটার স্কেলে ৫ মাত্রা'। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, বিজ্ঞানীরা এখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে 'মোমেন্ট ম্যাগনিচুড' নামের আরও নির্ভুল স্কেল ব্যবহার করেন, বিশেষ করে বড় ভূমিকম্পের জন্য। সংখ্যাগুলো কাছাকাছি, তাই সাধারণ মানুষের কাছে পার্থক্যটা চোখে পড়ে না।
সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা হলো, স্কেলটা সাধারণ সিঁড়ির মতো। আসলে মাত্রা ১ বাড়লে মাটির কম্পনের মাপ প্রায় ১০ গুণ হয়, আর মুক্ত হওয়া শক্তি বাড়ে প্রায় ৩২ গুণ। তাই ৭ মাত্রা ৬-এর চেয়ে 'একটু বড়' নয়, প্রায় ৩২ গুণ বেশি শক্তি; আর ৫-এর চেয়ে প্রায় হাজার গুণ।
- মাত্রা ৭১,০০০ গুণ শক্তি
- মাত্রা ৬৩২ গুণ শক্তি
- মাত্রা ৫১ গুণ শক্তি
আরেকটা জিনিস হলো তীব্রতা। মাত্রা একটাই সংখ্যা — ভূমিকম্পটা নিজে কত বড়। কিন্তু তীব্রতা জায়গাভেদে আলাদা — কোথায় কতটা ঝাঁকুনি লাগল আর কতটা ক্ষতি হলো। উপকেন্দ্রের কাছে তীব্রতা বেশি, দূরে কম। নরম পলিমাটিতে কম্পন বেড়েও যেতে পারে, যা বাংলাদেশের মতো ব-দ্বীপ এলাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
জানেন কি?ট্যাপ করে দেখুন
যন্ত্রে মাপা সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প হয়েছিল ১৯৬০ সালে চিলিতে, মাত্রা ৯.৫। তার সমুদ্রঢেউ প্রশান্ত মহাসাগর পেরিয়ে হাওয়াই আর জাপানেও পৌঁছেছিল।
বাংলাদেশ কেন ঝুঁকিতে
বাংলাদেশ বসে আছে ভারতীয় প্লেটের কিনারায়। উত্তরে ভারতীয় প্লেট ইউরেশীয় প্লেটের দিকে ঠেলছে, আর পূর্বে আছে বার্মা প্লেট। মানে আমাদের চারপাশে প্লেটের সীমানা। পূর্ব দিকে ভারতীয় প্লেট ধীরে ধীরে বার্মা প্লেটের নিচে ঢুকে যাচ্ছে।
২০১৬ সালে Nature Geoscience জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় GPS মাপজোখ দিয়ে দেখা যায়, বাংলাদেশের পূর্বাংশের নিচে এই সীমানার একটা বড় অংশ আটকে আছে এবং চাপ জমছে। গবেষকরা বলেছেন, এই চাপ একসাথে মুক্তি পেলে খুব বড় ভূমিকম্প হতে পারে, তবে কবে — সেটা কেউ জানে না। এ ছাড়া উত্তরে সিলেটের কাছে ডাউকি ফল্টও ঝুঁকির উৎস। ইতিহাসেও এর প্রমাণ আছে: ১৮৯৭ সালের আসাম ভূমিকম্প আর ১৭৬২ সালের আরাকান ভূমিকম্প এই অঞ্চলকে কাঁপিয়েছিল।
ঝুঁকি শুধু প্লেটের কারণে নয়। ঘনবসতি, নরম পলিমাটি আর বিল্ডিং কোড না মেনে বানানো ভবন একই ভূমিকম্পকে অনেক বেশি বিপজ্জনক করে তোলে। ঢাকায় বড় ভূমিকম্প হলে কী হতে পারে, তা নিয়ে বিস্তারিত পড়ো [ঢাকায় বড় ভূমিকম্প হলে কী হবে?](/articles/dhaka-big-earthquake) লেখায়। আর প্রকৃতির আরেক নীরব বিপদ নিয়ে জানতে পড়ো [বাংলাদেশে বজ্রপাতে মৃত্যু](/articles/lightning-deaths-bangladesh)।
ভূমিকম্প কি আগে থেকে বলা যায়?
সোজা উত্তর: না, এখনো না। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক সংস্থা USGS স্পষ্ট বলে, কোনো বিজ্ঞানী কখনো বড় ভূমিকম্পের সঠিক দিন, জায়গা আর মাত্রা একসাথে আগে থেকে বলতে পারেননি। তাই ফেসবুকে 'অমুক তারিখে বড় ভূমিকম্প' দেখলে বিশ্বাস কোরো না, শেয়ারও কোরো না।
বিজ্ঞান যা পারে, তা হলো সম্ভাবনা বলা: কোন এলাকায় আগামী কয়েক দশকে বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি কতটা। এই হিসাব দিয়েই বিল্ডিং কোড বানানো হয়। কিছু দেশে 'আগাম সতর্কবার্তা' ব্যবস্থাও আছে। এটা পূর্বাভাস নয়; ভূমিকম্প শুরু হওয়ার পর দ্রুত P-তরঙ্গ ধরে দূরের শহরে কয়েক সেকেন্ড আগে সতর্ক করে, যাতে মানুষ টেবিলের নিচে ঢুকতে পারে বা ট্রেন থামানো যায়।
শেষে একটা মজার তুলনা: আমরা যে পৃথিবীর খোসা নিয়ে এত চিন্তা করি, মহাবিশ্বের বড় নক্ষত্রের পাশে সেই পৃথিবী একটা বিন্দুর মতো। দেখো [পৃথিবী বনাম সবচেয়ে বড় নক্ষত্র](/facts/earth-vs-biggest-stars)। ভূমিকম্প কেন হয় — এই প্রশ্নের উত্তর জানা থাকলে কম্পনের সময় ভয় কিছুটা কমে, আর প্রস্তুতি বাড়ে। সেটাই আসল লাভ।
ভূমিকম্প কি জিনিস, এক লাইনে বললে: মাটির নিচে জমে থাকা শক্তির হঠাৎ মুক্তি, যা তরঙ্গ হয়ে আমাদের কাছে পৌঁছায়। প্রতিদিন পৃথিবীতে অসংখ্য ছোট ভূমিকম্প হয়, যার বেশিরভাগ শুধু যন্ত্রে ধরা পড়ে। আমরা টের পাই খুব অল্পগুলোই।
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
ছোট কম্পন কি বড় ভূমিকম্পের সংকেত?
সবসময় না। বেশিরভাগ ছোট কম্পনের পরে বড় কিছু হয় না। কখনো কখনো বড় ভূমিকম্পের আগে ছোট কম্পন (ফোরশক) হয়, কিন্তু সেটা যে ফোরশক, তা বোঝা যায় বড়টা হয়ে যাওয়ার পরে। তাই ছোট কম্পন আতঙ্কের নয়, প্রস্তুতি ঝালিয়ে নেওয়ার ভালো সময়।
পশুপাখি কি ভূমিকম্প আগে টের পায়?
অনেক গল্প আছে, কিন্তু নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। USGS বলে, ভূমিকম্পের কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক সেকেন্ড আগে পশুদের অস্বাভাবিক আচরণের গল্প শোনা যায়, কিন্তু নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য আচরণ, বা তা কীভাবে কাজ করে তার ব্যাখ্যা, এখনো পাওয়া যায়নি। তাই পশুপাখি দেখে ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়া যায় না।
রাতে ভূমিকম্প কেন বেশি জোরে মনে হয়?
ভূমিকম্প দিনে-রাতে সমানভাবেই হয়। রাতে চারপাশ চুপচাপ থাকে, আমরা শুয়ে বা স্থির থাকি, তাই ছোট কম্পনও সহজে টের পাই। ঘুম ভেঙে অন্ধকারে ভয়ও বেশি লাগে। তাই রাতের কম্পন বেশি মনে থাকে।
আফটারশক কী?
বড় ভূমিকম্পের পর একই এলাকায় যে ছোট ছোট কম্পন হয়, সেগুলো আফটারশক। ফল্টের আশপাশের পাথর নতুন অবস্থায় মানিয়ে নিতে গিয়ে এগুলো হয়। প্রথম কয়েক দিন বেশি হয়, পরে কমে আসে, তবে মাস বা বছর ধরেও চলতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে তাই সাবধান থাকতে হয়।
ভূমিকম্প কি শুধু প্লেটের সীমানায় হয়?
বেশিরভাগ বড় ভূমিকম্প প্লেটের সীমানায় হয়। তবে প্লেটের ভেতরেও পুরোনো ফল্ট থাকে, সেখানেও মাঝে মাঝে ভূমিকম্প হয়। আমাদের অঞ্চলে সিলেট সীমান্তের কাছের ডাউকি ফল্ট আর দেশের ভেতরের মধুপুর ফল্ট এমন ফল্টের উদাহরণ।
নিজে দেখুন
নিজে দেখো: USGS-এর লাইভ ম্যাপে (earthquake.usgs.gov) গত সাত দিনের ভূমিকম্পগুলো দেখো। খেয়াল করবে, বিন্দুগুলো এলোমেলো নয় — প্লেটের সীমানা বরাবর সারি বেঁধে আছে!
ছোট্ট যাচাই
কতটা মনে আছে, দেখে নিন
১. যন্ত্রে মাপা সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প কোথায় হয়েছিল?
২. ছোট কম্পন কি সবসময় বড় ভূমিকম্পের সংকেত?
তথ্যসূত্র
- ১USGS — The Science of Earthquakes usgs.gov ↗
- ২USGS — Earthquake Magnitude, Energy Release, and Shaking Intensity usgs.gov ↗
- ৩USGS FAQ — Can you predict earthquakes? usgs.gov ↗
- ৪USGS FAQ — Can animals predict earthquakes? usgs.gov ↗
- ৫USGS FAQ — Foreshocks, aftershocks: what's the difference? usgs.gov ↗
- ৬Steckler et al. 2016, Nature Geoscience — Locked and loading megathrust beneath the Indo-Burman Ranges nature.com ↗
- ৭NOAA NCEI — 1960 Chile earthquake and tsunami (M9.5) ncei.noaa.gov ↗
- ৮USGS FAQ — Where do earthquakes occur? (Ring of Fire, ~81% of largest quakes) usgs.gov ↗
- ৯USGS FAQ — How fast do tectonic plates move? usgs.gov ↗
- ১০USGS This Dynamic Earth — Inside the Earth (lithosphere) pubs.usgs.gov ↗
- ১১USGS This Dynamic Earth — Understanding plate motions pubs.usgs.gov ↗
কৃতজ্ঞতা
- তথ্য যাচাই: ২৫ অক্টোবর, ২০২৬