ভূমিকম্প হলে কী করবেন? ঘরে, অফিসে, রাস্তায়
· পড়তে ৭ মিনিট · ✓ তথ্য যাচাই করা
ছোট উত্তর · ১০ সেকেন্ডে
ভূমিকম্প হলে করণীয়: দৌড়াবেন না। যেখানে আছেন সেখানেই বসে পড়ুন, শক্ত টেবিলের নিচে ঢুকে মাথা-ঘাড় ঢাকুন, আর কম্পন না থামা পর্যন্ত টেবিলের পায়া ধরে থাকুন। লিফট ব্যবহার করবেন না, জানালা-বারান্দা থেকে দূরে থাকুন। কম্পন থামলে গ্যাস বন্ধ করে সিঁড়ি দিয়ে খোলা জায়গায় যান।
রাতে ঘুমের মধ্যে হঠাৎ খাট দুলে উঠল, জানালার কাচ ঝনঝন করছে। আপনি কী করবেন? বেশিরভাগ মানুষ এই প্রশ্নের উত্তর প্রথমবার ভাবে ঠিক ওই মুহূর্তে, যখন ভাবার সময় থাকে মাত্র কয়েক সেকেন্ড। তাই ভূমিকম্প হলে করণীয় কী, সেটা আজকেই, শান্ত মাথায় জেনে রাখা দরকার। বাংলাদেশ ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে, আর [ঢাকায় বড় ভূমিকম্প হলে কী হতে পারে](/articles/dhaka-big-earthquake) সেটা আমরা আগেই দেখেছি। এবার দেখি, ঘরে, অফিসে, রাস্তায় বা গাড়িতে থাকলে ঠিক কী করবেন।
একটা কথা আগে বলে রাখি: ভূমিকম্পে মানুষ সাধারণত মাটির কাঁপুনিতে আহত হয় না। আহত হয় পড়ে যাওয়া জিনিস, ভাঙা কাচ, ধসে পড়া দেয়াল আর হুড়োহুড়িতে। তাই সব নিয়মের মূল লক্ষ্য একটাই: মাথা আর ঘাড় বাঁচানো, আর আতঙ্কে ভুল কিছু না করা।
ভূমিকম্প হলে করণীয়ের মূল নিয়ম: বসুন, মাথা ঢাকুন, ধরে থাকুন
ভূমিকম্পের সময় কি করা উচিত, এই প্রশ্নে সারা পৃথিবীর নিরাপত্তা সংস্থাগুলো প্রায় একই উত্তর দেয়। ইংরেজিতে একে বলে Drop, Cover, Hold On, বাংলায় ড্রপ কাভার হোল্ড, বা সহজ কথায় ‘বসুন, ঢাকুন, ধরুন’। যুক্তরাষ্ট্রের USGS, Ready.gov আর রেড ক্রস সবাই এই তিন ধাপের পরামর্শ দেয়, বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের নির্দেশনাও একই কথা বলে।
ড্রপ কাভার হোল্ড
- ⬇️বসে পড়ুন
হাঁটু গেড়ে মেঝেতে বসুন, যাতে কম্পনে পড়ে না যান
- 🛡️মাথা ঢাকুন
শক্ত টেবিলের নিচে ঢুকুন; না থাকলে হাত দিয়ে মাথা-ঘাড় ঢাকুন
- ✊ধরে থাকুন
টেবিলের পায়া শক্ত করে ধরুন, কম্পন না থামা পর্যন্ত
কেন বসে পড়বেন? কারণ জোরালো কম্পনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় অসম্ভব, পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত লাগে। কেন টেবিলের নিচে? কারণ উপর থেকে পড়া ফ্যান, তাকের জিনিস বা পলেস্তারার টুকরো থেকে টেবিল আপনাকে আড়াল দেয়। আর কেন ধরে থাকবেন? কম্পনে টেবিলও সরে যায়; পায়া ধরে থাকলে আশ্রয়টা আপনার সাথে সাথে থাকে।
কাছে টেবিল না থাকলে ভেতরের দিকের কোনো দেয়ালের পাশে বসুন, জানালা, কাচের আলমারি, ভারী তাক আর ঝোলানো জিনিস থেকে দূরে। হাত দিয়ে মাথা আর ঘাড় ঢেকে রাখুন। রান্নাঘরে থাকলে সম্ভব হলে চুলা বন্ধ করে সরে আসুন, গরম হাঁড়ি-কড়াই থেকে দূরে থাকুন।
উঁচু ভবনে বা অফিসে থাকলে: সিঁড়ি, লিফট নয়
ঢাকার মতো শহরে অনেকেই থাকেন বা কাজ করেন আট-দশ তলার উপরে। উঁচু ভবনে কম্পন অনেক সময় বেশি জোরালো মনে হয়, কারণ উপরের তলা পেন্ডুলামের মতো দোলে। ভয় পাওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু নিয়ম একই: যেখানে আছেন সেখানেই বসুন, ঢাকুন, ধরুন।
লিফট কেন একদম নয়
কম্পনে বিদ্যুৎ চলে যেতে পারে, লিফটের তার বা রেল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তখন আপনি দুই তলার মাঝখানে আটকে যেতে পারেন, আর উদ্ধারকারীরা হয়তো ঘণ্টার পর ঘণ্টা আসতে পারবেন না। লিফটের ভেতরে থাকা অবস্থায় কম্পন শুরু হলে সবগুলো তলার বোতাম চাপুন, যে তলায় দরজা খোলে সেখানে নেমে পড়ুন।
অফিসে কী করবেন
ডেস্কের নিচে ঢুকে পায়া ধরে থাকুন। কাচের পার্টিশন আর বড় জানালা থেকে দূরে থাকুন। বারান্দা বা জানালা দিয়ে লাফ দেওয়ার কথা কখনো ভাববেন না; বাংলাদেশে ছোট ভূমিকম্পেও আতঙ্কে লাফিয়ে বা হুড়োহুড়িতে মানুষ আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। কম্পন থামার পর সিঁড়ি দিয়ে, শান্তভাবে, একজন একজন করে নামুন। অফিসে আগে থেকে ঠিক করা জমায়েতের জায়গা থাকলে সেখানে যান।
রাস্তায় বা গাড়িতে থাকলে
খোলা আকাশের নিচে থাকলে ভবন, গাছ, বৈদ্যুতিক খুঁটি, তার, বিলবোর্ড আর ফ্লাইওভার থেকে দূরে কোনো ফাঁকা জায়গায় সরে যান, তারপর বসে মাথা ঢাকুন। শহরের রাস্তায় সবচেয়ে বড় বিপদ উপর থেকে পড়া কাচ, ইট আর সাইনবোর্ড, তাই দোকানের সামনের ছাউনির নিচে আশ্রয় নেবেন না।
গাড়ি চালালে ধীরে রাস্তার পাশে থামান, তবে সেতু, ফ্লাইওভার, ওভারপাস, গাছ বা খুঁটির নিচে নয়। হ্যান্ডব্রেক টেনে কম্পন না থামা পর্যন্ত সিটবেল্ট বেঁধে গাড়ির ভেতরেই থাকুন। রিকশা বা বাসে থাকলে চালককে থামতে বলুন এবং ভেতরেই নিচু হয়ে মাথা ঢাকুন। কম্পন থামার পর সাবধানে চালান, কারণ রাস্তায় ফাটল বা ছেঁড়া তার থাকতে পারে।
কম্পন থামার পর কী করবেন
কম্পন থেমে গেলেই বিপদ শেষ নয়। বড় ভূমিকম্পের পর কয়েক মিনিট, ঘণ্টা, এমনকি কয়েক দিন ধরে আফটারশক বা পরাঘাত আসতে পারে। প্রতিবার কাঁপলে আবার বসুন, ঢাকুন, ধরুন।
- আগে নিজের আর আশপাশের মানুষের আঘাত দেখুন। জুতা পরে নিন, মেঝেতে ভাঙা কাচ থাকতে পারে।
- গ্যাসের গন্ধ পেলে চুলার চাবি আর মেইন লাইন বন্ধ করুন, ম্যাচ বা লাইটার জ্বালাবেন না, সুইচও টিপবেন না। আলোর জন্য টর্চ ব্যবহার করুন।
- দেয়ালে বা কলামে বড় তির্যক ফাটল দেখলে ভবন থেকে বেরিয়ে খোলা জায়গায় যান, প্রকৌশলী না দেখা পর্যন্ত আর ঢুকবেন না।
- ধ্বংসস্তূপে আটকে গেলে নড়াচড়া কম করুন, কাপড় দিয়ে নাক-মুখ ঢাকুন, পাইপ বা দেয়ালে ঠুকে শব্দ করুন বা বাঁশি বাজান। একটানা চিৎকার করলে ধুলা ঢোকে আর শক্তি ফুরায়।
- ফোনে লম্বা কল না করে ছোট মেসেজ পাঠান, যাতে জরুরি কলের জন্য নেটওয়ার্ক খালি থাকে।
- গুজবে কান দেবেন না। ‘আরও বড়টা আসছে অমুক সময়’ এমন পোস্ট ছড়ায়, কিন্তু বিজ্ঞান এখনো ভূমিকম্পের দিনক্ষণ আগে বলতে পারে না।
আগেভাগে প্রস্তুতি: জরুরি ব্যাগ ও পরিবারের পরিকল্পনা
ভূমিকম্পের সময় যা করবেন, তার চেয়েও বেশি কাজে দেয় আগে যা করে রাখবেন। বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো তিনটা জিনিসে জোর দেয়: ঘর নিরাপদ করা, একটা জরুরি ব্যাগ, আর পরিবারের একটা পরিকল্পনা।
ঘর নিরাপদ করুন
ভারী আলমারি, বইয়ের তাক আর ফ্রিজ দেয়ালের সাথে ব্র্যাকেট দিয়ে আটকান। ভারী জিনিস নিচের তাকে রাখুন। খাটের মাথার উপরে ভারী ছবি বা আয়না ঝোলাবেন না। গ্যাস সিলিন্ডার শিকল দিয়ে বেঁধে রাখুন আর পরিবারের সবাইকে শিখিয়ে দিন মেইন গ্যাস ও বিদ্যুতের সুইচ কোথায়। প্রতিটা ঘরে একটা ‘নিরাপদ কোণ’ ঠিক করুন: শক্ত টেবিল বা ভেতরের দেয়ালের পাশ।
ভূমিকম্প প্রস্তুতি ব্যাগ
একটা ব্যাগ গুছিয়ে দরজার কাছে রাখুন, যাতে বের হওয়ার সময় হাতে তুলে নেওয়া যায়। অন্ধকারে সবচেয়ে কাজের জিনিস একটা ভালো টর্চ বা রিচার্জেবল লণ্ঠন, মোমবাতি নয়, কারণ গ্যাস লিক থাকলে আগুন লাগতে পারে।
- পানি (প্রতিজনের জন্য অন্তত কয়েক লিটার) আর শুকনো খাবার: চিড়া, মুড়ি, বিস্কুট, খেজুর।
- টর্চ বা লণ্ঠন, বাড়তি ব্যাটারি, পাওয়ার ব্যাংক।
- বাঁশি, আটকে গেলে সাহায্য ডাকার জন্য।
- প্রাথমিক চিকিৎসার বাক্স আর পরিবারের নিয়মিত ওষুধ, প্রেসক্রিপশনের কপিসহ।
- জাতীয় পরিচয়পত্র, জরুরি কাগজের ফটোকপি প্লাস্টিকের প্যাকেটে, কিছু নগদ টাকা।
- মাস্ক, শক্ত জুতা, একটা গরম কাপড়, ছোট রেডিও।
- শিশু, বয়স্ক বা অসুস্থ সদস্যের বিশেষ দরকারের জিনিস।
ব্যাগের খাবার, ওষুধ আর ব্যাটারির মেয়াদ বছরে অন্তত একবার দেখে বদলে দিন। কোনো ওষুধ খেতে ভুলে গেলে কী করবেন, সেটা নিয়েও আমাদের একটা লেখা আছে: [ওষুধের ডোজ মিস হলে কী করবেন](/facts/missed-dose-what-to-do)।
পরিবারের পরিকল্পনা
আজ রাতে পরিবারের সবাইকে নিয়ে দশ মিনিট বসুন। ঠিক করুন বাসার বাইরে কোন খোলা মাঠ বা জায়গায় সবাই মিলবেন। ভিন্ন শহরের একজন আত্মীয়কে ‘যোগাযোগ ব্যক্তি’ বানান, সবাই তাঁকে খবর দেবেন। শিশুদের খেলার ছলে ড্রপ কাভার হোল্ড অনুশীলন করান, বছরে দু’বার মহড়া দিন। বজ্রপাতের মতো অন্য দুর্যোগেও এমন প্রস্তুতি কাজে লাগে; পড়ে দেখতে পারেন [বাংলাদেশে বজ্রপাতে এত মানুষ মারা যায় কেন](/articles/lightning-deaths-bangladesh)।
জানেন কি?ট্যাপ করে দেখুন
ভূমিকম্প প্রস্তুতিতে জাপান পৃথিবীর অন্যতম উদাহরণ। সেখানে স্কুলে নিয়মিত মহড়া হয়, তাই শিশুরাও কম্পন টের পেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে টেবিলের নিচে ঢুকে পড়ে। অভ্যাস থাকলে ভয়ের মুহূর্তে মাথা কাজ না করলেও শরীর ঠিক কাজটা করে।
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
ভূমিকম্পের সময় দৌড়ে বের হওয়া কি ঠিক?
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে না। কম্পনের সময় হাঁটতে বা দৌড়াতে গেলেই মানুষ পড়ে যায়, আর ভবনের ঠিক বাইরে কাচ, ইট আর সাইনবোর্ড পড়ে। আপনি যদি নিচতলায় দরজার একদম পাশে থাকেন এবং বাইরে খোলা জায়গা থাকে, তবেই দ্রুত বের হওয়ার কথা ভাবুন। নইলে যেখানে আছেন সেখানেই বসুন, মাথা ঢাকুন, ধরে থাকুন।
দরজার চৌকাঠের নিচে দাঁড়ানো কি নিরাপদ?
এটা পুরোনো একটা ধারণা। আধুনিক বাসায় চৌকাঠ বাকি দেয়ালের চেয়ে বেশি মজবুত নয়, আর দোলার সময় দরজার পাল্লা গায়ে আঘাত করতে পারে। মার্কিন সংস্থা USGS ও Ready.gov তাই চৌকাঠের বদলে শক্ত টেবিলের নিচে আশ্রয় নিতে বলে।
বিছানায় থাকলে কী করব?
বিছানাতেই থাকুন। উপুড় হয়ে শুয়ে বালিশ দিয়ে মাথা আর ঘাড় ঢেকে রাখুন। অন্ধকারে মেঝেতে নামলে ভাঙা কাচে পা কাটতে পারে। তবে মাথার উপরে ভারী ফ্রেম, তাক বা ঝাড়বাতি থাকলে আগে থেকেই সেগুলো সরিয়ে ফেলুন।
ভূমিকম্পের পর জরুরি নম্বর কোনটা?
বাংলাদেশে জাতীয় জরুরি সেবার নম্বর ৯৯৯, এখানে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও অ্যাম্বুলেন্স সবই পাওয়া যায়। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের হটলাইন ১০২ (আগের ৫ অঙ্কের নম্বর ১৬১৬৩ বন্ধ করে ১০২ চালু করা হয়েছে)। নম্বরগুলো ফোনে সেভ করে রাখুন এবং বাসার সবাইকে মুখস্থ করিয়ে দিন।
শেষ কথা
ভূমিকম্প কবে হবে কেউ জানে না, কিন্তু কী করতে হবে তা আমরা আজই জানতে পারি। ভূমিকম্প হলে করণীয় মনে রাখার সবচেয়ে সহজ উপায়: বসুন, মাথা ঢাকুন, ধরে থাকুন, তারপর শান্ত মাথায় বের হন। লেখাটা পরিবারের সবার সাথে শেয়ার করুন, আর আজকেই ব্যাগটা গুছিয়ে ফেলুন।
নিজে দেখুন
নিজে করে দেখুন: আজ রাতে বাতি নিভিয়ে পরিবারের সবাই মিলে এক মিনিটের মহড়া দিন। কে কত সেকেন্ডে নিজের ‘নিরাপদ কোণে’ পৌঁছায়, আর অন্ধকারে টর্চটা খুঁজে পান কি না, দেখুন।
ছোট্ট যাচাই
কতটা মনে আছে, দেখে নিন
১. দরজার চৌকাঠের নিচে দাঁড়ানো নিয়ে সত্যি কোনটা?
২. ভূমিকম্পের সময় লিফট নিয়ে কী করবেন?
তথ্যসূত্র
- ১USGS — ShakeOut: Drop, Cover, and Hold On (indoors, outdoors, driving) usgs.gov ↗
- ২Ready.gov (FEMA) — Earthquakes ready.gov ↗
- ৩American Red Cross — Earthquake Safety redcross.org ↗
- ৪Earthquake Country Alliance — Drop, Cover, and Hold On (doorway myth) earthquakecountry.org ↗
- ৫USGS — Can you predict earthquakes? usgs.gov ↗
- ৬Dhaka Courier — Fire Service earthquake safety guidelines dhakacourier.com.bd ↗
- ৭The Business Standard — Fire Service launches 3-digit hotline 102 (16163 to be discontinued) tbsnews.net ↗
- ৮Japan FDMA — If you are in an elevator during an earthquake fdma.go.jp ↗
- ৯Bangladesh Fire Service and Civil Defence fireservice.gov.bd ↗
- ১০National Emergency Service 999 (Bangladesh) 999.gov.bd ↗
কৃতজ্ঞতা
- তথ্য যাচাই: ২৫ অক্টোবর, ২০২৬