বাংলাদেশে বজ্রপাতে এত মানুষ মারা যায় কেন?
· পড়তে ৬ মিনিট · ✓ তথ্য যাচাই করা

ছোট উত্তর · ১০ সেকেন্ডে
২০১৬ সাল থেকে বাংলাদেশে বজ্রপাতে বছরে প্রায় ২৫০–৪০০ জন মারা যান, যা জনসংখ্যার অনুপাতে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে প্রায় ২০ গুণ বেশি। কারণ, বছরের সবচেয়ে বেশি বজ্রঝড় হয় এপ্রিল–জুনে, ঠিক যখন হাওরের খোলা মাঠে লাখো কৃষক বোরো ধান কাটেন। আশপাশে আশ্রয় নেই, আর মাঠে সবচেয়ে উঁচু জিনিসটাই মানুষ।
প্রতি বছর বৈশাখ এলে খবরের কাগজে একই রকম শিরোনাম: ‘ধান কাটতে গিয়ে বজ্রপাতে কৃষকের মৃত্যু’। ২০১৬ সালের মে মাসে মাত্র কয়েক দিনে দুইশোর বেশি মানুষ মারা যাওয়ার পর সরকার বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করে। প্রশ্ন হলো, বজ্রপাত তো সারা পৃথিবীতেই হয়। বাংলাদেশে মৃত্যু এত বেশি কেন?
সংখ্যাগুলো কী বলে
আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশ্লেষণে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০১৬ সালে ৩৯১ জন, ২০২১ সালে ৪২৭ জন, ২০২৪ সালে ২৭১ জন মারা গেছেন বজ্রপাতে। তবে একেক সংস্থার হিসাব একেক রকম। যেমন ২০২১ সালের জন্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে ৩৬২ জন, আর বেসরকারি সংগঠন সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্টর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরাম (SSTAF)-এর হিসাব সাধারণত আরও কম। সব মিলিয়ে নিরাপদে বলা যায়: ২০১৬ থেকে বছরে প্রায় ২৫০–৪০০ জন, গড়ে প্রায় ৩০০।
- ২০২১৪২৭ জন
- ২০২০৪০১ জন
- ২০১৬৩৯১ জন
- ২০১৮৩৮৮ জন
- ২০২২৩৬৩ জন
- ২০২৩৩২২ জন
- ২০২৪২৭১ জন
- ২০২৫২৪৩ জন
দীর্ঘ মেয়াদে ছবিটা আরও চোখে পড়ার মতো। NASA-র আর্থ অবজারভেটরি লিখেছে, ১৯৯০-এর দশকে বছরে কয়েক ডজন মৃত্যুর খবর পাওয়া যেত, আর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রতি বছর কয়েকশো মানুষ হতাহত হচ্ছেন। তবে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন: এর একটা বড় অংশ সম্ভবত ভালোভাবে খবর সংগ্রহ আর বেশি মানুষের ঝুঁকিতে থাকার ফল; বজ্রপাত নিজে একটানা বাড়ছে, এমন প্রমাণ নেই।
২০গুণ
যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় মৃত্যুহার
যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ১০ লাখে প্রায় ০.০৮ জন (২০০৯–২০১৮), বাংলাদেশে প্রায় ১.৮ জন (২০১৮, সংবাদপত্র-ভিত্তিক)
ভুল সময়, ভুল জায়গা
বজ্রপাত আসলে কী? বজ্রমেঘের ভেতরে বরফকণা আর শিলা ওঠানামার সময় ঘষা খেয়ে বৈদ্যুতিক চার্জ আলাদা হয়ে যায়। মেঘের নিচের অংশে জমা ঋণাত্মক চার্জ আর মাটির ধনাত্মক চার্জের মধ্যে টান যখন খুব বেশি হয়ে যায়, তখন মুহূর্তের মধ্যে বাতাস ভেদ করে বিশাল বিদ্যুৎপ্রবাহ ছুটে আসে। সেটাই বাজ। এই প্রবাহ সাধারণত সবচেয়ে কাছের, অর্থাৎ সবচেয়ে উঁচু জিনিসটা বেছে নেয়।
NASA-র উপগ্রহের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের বজ্রপাতের প্রায় ৬৯% হয় বর্ষার আগে, মধ্য-এপ্রিল থেকে জুনে, যখন কালবৈশাখী আসে। বঙ্গোপসাগরের গরম, আর্দ্র বাতাস উত্তরে এসে মেঘালয়ের পাহাড়ে ধাক্কা খায়, উঠে যায় ওপরে, আর তৈরি হয় বিশাল বজ্রমেঘ। তাই উত্তর-পূর্বাঞ্চল সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। গবেষক রোনাল্ড হোলের মতে, সকাল থেকে দুপুরের মধ্যে বজ্রপাতের দিক থেকে বাংলাদেশ পৃথিবীতে শীর্ষে, আর ওই সময়টাই মাঠে কাজের সময়।
এবার ক্যালেন্ডারটা মিলিয়ে দেখুন। মধ্য-এপ্রিল থেকে হাওরে বোরো ধান কাটা শুরু হয়। হাওর মানে মাইলের পর মাইল সমতল খোলা জমি, যেখানে না আছে উঁচু দালান, না আছে নিরাপদ আশ্রয়। ধান পেকে গেলে আগাম বন্যার ভয়ে কৃষক ঝড়ের মধ্যেও কাজ থামাতে পারেন না। খোলা মাঠে দাঁড়ানো মানুষটাই তখন আশপাশের সবচেয়ে উঁচু বস্তু, আর বজ্রপাত সাধারণত উঁচু জিনিসেই আঘাত করে।
লাল: হাওর অঞ্চল ও বজ্রপাতে বেশি হতাহতের জেলা
কারা মারা যান
বজ্রপাত শুধু সরাসরি আঘাতে মারে না। কাছে কোথাও বাজ পড়লে বিদ্যুৎ মাটি বা পানি দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে, আর ভেজা মাঠে বা কাদাপানিতে দাঁড়ানো মানুষ সেই প্রবাহে আক্রান্ত হন। হাওরের ধানখেত বর্ষার আগেই ভেজা থাকে, অনেকে খালি পায়ে কাজ করেন, তাই ঝুঁকি আরও বাড়ে। একসঙ্গে দলবেঁধে কাজ করার সময় একটা বাজেই একাধিক মানুষ হতাহত হওয়ার খবরও প্রায়ই আসে।
১৯৯০ থেকে ২০১৬ সালের প্রায় ৩,১০০ মৃত্যুর হিসাবে প্রায় ৪০% মারা গেছেন কৃষিকাজের সময়। মাছ ধরা, নৌকায় থাকা বা গোসলের সময় মারা গেছেন আরও দুইশোর বেশি। ২০১৮ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, হতাহতদের প্রায় ৮৪% পুরুষ, কারণ মাঠে আর নদীতে কাজ করেন মূলত তাঁরাই। অবাক করা তথ্য হলো, বড় একটা অংশ মারা গেছেন ঘরের ভেতরেও; কাঁচা বা টিনের ঘর বজ্রপাত থেকে পাকা দালানের মতো সুরক্ষা দেয় না।
তালগাছ দিয়ে কি সমাধান হলো?
২০১৭ সালে সরকার সারা দেশে তালগাছ লাগানোর প্রকল্প নেয়, যুক্তি ছিল উঁচু গাছ বজ্র টেনে নিয়ে মানুষকে বাঁচাবে। প্রায় ৩৮ লাখ চারা লাগানো হয়। কিন্তু অনেক চারা মরে যায়, আর একটা তালগাছ পূর্ণ উচ্চতায় পৌঁছাতে ৩০–৪০ বছর লাগে। ২০২২ সালে প্রকল্পটি বাতিল করা হয়। এরপর কিছু জেলায় প্রায় ৩০০টির বেশি বজ্রনিরোধক দণ্ড বসানো হয়েছে, আর ২০১৮ সালে আবহাওয়া অধিদপ্তর বজ্রপাত শনাক্তের সেন্সর বসিয়েছে, যা দিয়ে কয়েক ঘণ্টা আগে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়। তবে সতর্কবার্তা মাঠের কৃষকের কাছে সময়মতো পৌঁছানোই এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
নিজেকে বাঁচাবেন কীভাবে
বাজ কত দূরে, তা নিজেই মাপতে পারেন। আলো প্রায় সঙ্গে সঙ্গে পৌঁছায়, কিন্তু শব্দ বাতাসে সেকেন্ডে প্রায় ৩৪৩ মিটার চলে। তাই বিদ্যুৎ চমকানোর পর গর্জন শোনা পর্যন্ত যত সেকেন্ড লাগে, তাকে ৩ দিয়ে ভাগ করলে মোটামুটি কিলোমিটারে দূরত্ব পাবেন। গর্জন শোনা যাচ্ছে মানেই ঝড় যথেষ্ট কাছে; বাজ ঝড়ের কেন্দ্র থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার (১০ মাইল) দূরেও আঘাত করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আবহাওয়া সংস্থার মূল বার্তা একটাই: মেঘ ডাকলে ঘরে যান। বজ্রঝড়ের সময় বাইরে কোনো জায়গাই পুরোপুরি নিরাপদ না।
- ⛈️মেঘ ডাকল
বাজ আপনার নাগালে
- 🏠পাকা দালানে যান
বা বন্ধ গাড়িতে
- 🚣পানি থেকে উঠুন
নৌকা, পুকুর, খোলা মাঠ ছাড়ুন
- ⏱️৩০ মিনিট অপেক্ষা
শেষ গর্জনের পর
- আকাশে কালো মেঘ জমলে, বিশেষ করে এপ্রিল–জুনে, মাঠ বা নৌকার কাজ আগেই থামান।
- পাকা দালান বা ধাতব ছাদের বন্ধ গাড়ি নিরাপদ; খোলা ছাউনি, টং দোকান বা গাছতলা নিরাপদ না।
- একা দাঁড়ানো উঁচু গাছ, বিদ্যুতের খুঁটি আর খোলা পানি থেকে দূরে থাকুন।
- ঘরের ভেতরে জানালা, পানির কল আর তারযুক্ত বৈদ্যুতিক যন্ত্র থেকে দূরে থাকুন।
- শেষবার মেঘ ডাকার পর অন্তত ৩০ মিনিট বাইরে যাবেন না।
- কেউ বজ্রাহত হলে তাঁর শরীরে বিদ্যুৎ থাকে না; সঙ্গে সঙ্গে ধরুন, প্রয়োজনে সিপিআর দিন আর হাসপাতালে নিন।
নিজে দেখুন
পরের বার বিদ্যুৎ চমকালে সেকেন্ড গুনুন, গর্জন শোনা পর্যন্ত। প্রতি ৩ সেকেন্ডে প্রায় ১ কিলোমিটার। গর্জন শুনতে পেলেই বুঝবেন, আপনি বজ্রপাতের নাগালে।
ছোট্ট যাচাই
কতটা মনে আছে, দেখে নিন
১. বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বজ্রঝড় হয় কোন সময়ে?
২. ঝড়ের সময় একা দাঁড়ানো উঁচু গাছের নিচে দাঁড়ালে কী ঘটতে পারে?
তথ্যসূত্র
- ১Mongabay — Bangladesh's lightning death toll persists (জুন ২০২৬) news.mongabay.com ↗
- ২Prothom Alo English — তালগাছ প্রকল্প ও বজ্রনিরোধক en.prothomalo.com ↗
- ৩The Daily Star — How Bangladesh can reduce lightning deaths thedailystar.net ↗
- ৪Dhaka Tribune — Lightning deaths rise as rural Bangladesh lacks shelters dhakatribune.com ↗
- ৫Dewan, Holle et al. — Lightning fatalities in Bangladesh 1990–2016 (AMS 2017) ams.confex.com ↗
- ৬BMRC Bulletin — Lightning deaths in Bangladesh (banglajol) banglajol.info ↗
- ৭NASA Earth Observatory — Assessing lightning risk in South Asia science.nasa.gov ↗
- ৮US National Weather Service — Lightning odds weather.gov ↗
- ৯US National Weather Service — Lightning safety weather.gov ↗
- ১০Wikimedia Commons — হিরো ছবি commons.wikimedia.org ↗
- ১১Financial Express — 3.8m palm trees planted (২০১৯) old.thefinancialexpress.com.bd ↗
কৃতজ্ঞতা
- প্রধান ছবি: “Nature's city light and night” — Shuvo.bala, Wikimedia Commons, CC BY-SA 4.0 (আকার ছোট করা হয়েছে)
- তথ্য যাচাই: ২১ অক্টোবর, ২০২৬