বজ্রপাত কেন হয়? মেঘে বিদ্যুৎ তৈরির বিজ্ঞান
· পড়তে ৭ মিনিট · ✓ তথ্য যাচাই করা
ছোট উত্তর · ১০ সেকেন্ডে
বজ্রপাত হয় যখন বজ্রমেঘের ভেতরে বরফকণা আর শিলার কোটি কোটি সংঘর্ষে ধনাত্মক ও ঋণাত্মক চার্জ আলাদা হয়ে জমে। চার্জের পার্থক্য এত বেড়ে যায় যে বাতাস আর আটকাতে পারে না, তখন এক ঝলকে বিপুল বিদ্যুৎ বয়ে যায়। সেই প্রচণ্ড তাপে বাতাস হঠাৎ প্রসারিত হয়ে গর্জন তোলে।
বর্ষার বিকেল। আকাশ কালো হয়ে আসে, হঠাৎ চোখ ধাঁধানো এক ঝলক আলো, আর কয়েক সেকেন্ড পরে কান ফাটানো গর্জন। ছোটবেলা থেকে আমরা শুনে এসেছি, মেঘে মেঘে ঘষা লাগলে বাজ পড়ে। কথাটা পুরো ভুল নয়, আবার পুরো ঠিকও নয়। একটা মেঘ, যা আসলে পানির কণা আর বরফের টুকরো ছাড়া কিছুই না, কীভাবে কোটি কোটি ভোল্টের বিদ্যুৎ তৈরি করে? চলো ধাপে ধাপে বুঝে দেখি।
সংক্ষেপে: বজ্রপাত কেন হয়?
বজ্রপাত হলো আকাশে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ বৈদ্যুতিক চার্জের হঠাৎ মুক্তি। বিশাল বজ্রমেঘের ভেতরে প্রবল ঊর্ধ্বমুখী বাতাস বরফকণা, শিলা আর অতিশীতল পানির ফোঁটাকে উপর-নিচে ছোটাছুটি করায়। এরা একে অপরের সাথে ধাক্কা খেলে ইলেকট্রন আদান-প্রদান হয়। হালকা বরফকণা সাধারণত ধনাত্মক চার্জ নিয়ে মেঘের মাথায় ওঠে, আর ভারী নরম শিলা (গ্রাউপেল) ঋণাত্মক চার্জ নিয়ে মেঘের মাঝ-নিচের অংশে জমে।
এভাবে মেঘটা যেন একটা বিশাল ব্যাটারিতে পরিণত হয়। বাতাস সাধারণত বিদ্যুৎ চলতে দেয় না, সে একটা অন্তরক। কিন্তু চার্জের পার্থক্য যখন এত বেশি হয়ে যায় যে বাতাস আর আটকাতে পারে না, তখন বাতাসের একটা সরু পথ ভেঙে পরিবাহী হয়ে যায়, আর এক মুহূর্তে বিপুল স্রোত বয়ে যায়। সেটাই আমরা দেখি বিদ্যুৎ চমক হিসেবে।
বজ্রমেঘ কীভাবে তৈরি হয়
সব মেঘ বাজ ফেলে না। বজ্রপাত হয় মূলত কিউমুলোনিম্বাস নামের মেঘ থেকে, যা দেখতে বিশাল তুলার পাহাড় বা কামারের নেহাইয়ের মতো। এই মেঘ মাটির কাছ থেকে শুরু করে দশ-পনেরো কিলোমিটার উঁচু পর্যন্ত উঠে যেতে পারে। গরম, আর্দ্র বাতাস দ্রুত উপরে উঠলে তা ঠান্ডা হয়, জলীয় বাষ্প জমে ফোঁটা হয়, আর ফোঁটা জমার সময় তাপ ছাড়ে, যা বাতাসকে আরও উপরে ঠেলে দেয়।
এই কারণেই গ্রীষ্ম আর বর্ষার শুরুতে, যখন মাটি গরম আর বাতাসে প্রচুর আর্দ্রতা থাকে, বজ্রঝড় সবচেয়ে বেশি হয়। বাংলাদেশে মার্চ থেকে মে মাসের কালবৈশাখী এর চেনা উদাহরণ। দক্ষিণের সাগর থেকে আসা ভেজা বাতাস আর উত্তর-পশ্চিমের শুকনো বাতাস মিললে আকাশে অল্প সময়েই বিশাল বজ্রমেঘ দাঁড়িয়ে যায়।
মেঘের ভেতরে চার্জ আলাদা হয় কীভাবে
বিজ্ঞানীরা এখনো পুরো খুঁটিনাটি নিয়ে গবেষণা করছেন, তবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যাটা হলো বরফের সংঘর্ষ। মেঘের যে অংশে তাপমাত্রা শূন্যের অনেক নিচে, সেখানে তিন রকম জিনিস একসাথে থাকে:
- ছোট ছোট বরফের স্ফটিক, যা খুব হালকা আর বাতাসে সহজে উপরে ওঠে।
- গ্রাউপেল বা নরম শিলা, যা তুলনামূলক ভারী আর নিচের দিকে পড়তে থাকে।
- অতিশীতল পানির ফোঁটা, যা শূন্যের নিচেও তরল থাকে আর কিছুতে লাগলেই জমে যায়।
ঊর্ধ্বমুখী বাতাস হালকা স্ফটিককে উপরে তোলে, আর ভারী গ্রাউপেল নিচে নামতে চায়। এই উল্টো চলার পথে তারা অগণিতবার ধাক্কা খায়। প্রতিটা ধাক্কায় সামান্য চার্জ এক কণা থেকে অন্য কণায় চলে যায়। একটা ধাক্কায় চার্জ খুব কম, কিন্তু একটা বড় মেঘে প্রতি সেকেন্ডে এমন ধাক্কা হয় অকল্পনীয় সংখ্যায়।
ফলাফল দাঁড়ায় একটা স্তরভিত্তিক মেঘ: মাথায় ধনাত্মক চার্জ, মাঝখানে বড় ঋণাত্মক অঞ্চল, আর নিচের দিকে প্রায়ই ছোট একটা ধনাত্মক অঞ্চল। মেঘের নিচের ঋণাত্মক চার্জ মাটির উপরের ইলেকট্রনকে দূরে ঠেলে দেয়, ফলে নিচের মাটি, গাছ, বাড়ি ধনাত্মক হয়ে ওঠে। মেঘ আর মাটির মধ্যে তৈরি হয় এক বিশাল বৈদ্যুতিক টান।
এক ঝলক আলোর ভেতরে কী ঘটে
চার্জের টান যখন চরমে পৌঁছায়, মেঘের নিচ থেকে একটা প্রায় অদৃশ্য, সরু বিদ্যুৎপথ ধাপে ধাপে নিচে নামতে শুরু করে। একে বলে স্টেপড লিডার। এটা আঁকাবাঁকা পথে, ডালপালা ছড়িয়ে, কয়েক দশ মিটার করে লাফিয়ে নামে। সেই কারণেই বজ্রপাতকে গাছের শিকড় বা নদীর শাখার মতো দেখায়।
লিডার মাটির কাছাকাছি এলে মাটির উঁচু জিনিস, যেমন গাছের মাথা, খুঁটি বা ছাদের কোণ থেকে উল্টো দিকে একটা ধনাত্মক স্রোত উপরে ওঠে। দুটো পথ মিলে গেলেই সার্কিট সম্পূর্ণ। তখন মাটি থেকে মেঘের দিকে প্রচণ্ড উজ্জ্বল ফেরত-স্রোত (রিটার্ন স্ট্রোক) ছুটে যায়। আমাদের চোখে যে ঝলক পড়ে, তার বেশিরভাগটাই এই ফেরত-স্রোত।
পুরো ঘটনা ঘটে এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে। প্রায়ই একই পথ দিয়ে কয়েকবার স্রোত আসা-যাওয়া করে, তাই বজ্রপাতকে মাঝে মাঝে কাঁপতে বা মিটমিট করতে দেখা যায়। একটা সাধারণ বজ্রপাতে প্রায় ত্রিশ হাজার অ্যাম্পিয়ার স্রোত থাকতে পারে, আর ভোল্টেজ কোটি ভোল্ট ছাড়িয়ে যায়।
জানেন কি?ট্যাপ করে দেখুন
মজার তথ্য: বজ্রপাতের পথে বাতাস মুহূর্তের মধ্যে প্রায় ৩০,০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত গরম হয়ে যায়, যা সূর্যের পৃষ্ঠের তাপমাত্রার প্রায় পাঁচ গুণ। অথচ পথটা মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার চওড়া।
বজ্রপাতের নানা রূপ
আমরা সাধারণত মেঘ থেকে মাটিতে নামা বাজের কথাই ভাবি, কিন্তু বিজ্ঞানীরা বজ্রপাতকে কয়েক ভাগে ভাগ করেন। সবচেয়ে বেশি হয় মেঘের ভেতরের বজ্রপাত, যখন একই মেঘের ধনাত্মক আর ঋণাত্মক অংশের মাঝে স্রোত বয়ে যায়। তখন পুরো মেঘটা ভেতর থেকে আলোকিত হয়ে ওঠে, অনেকে একে বলেন চাদর-বিদ্যুৎ। দুটো আলাদা মেঘের মাঝেও বজ্রপাত হতে পারে, আবার মেঘ থেকে আশপাশের পরিষ্কার আকাশেও।
মেঘ থেকে মাটির বজ্রপাত মোট বজ্রপাতের তুলনামূলক ছোট একটা অংশ, কিন্তু আমাদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক এটাই। এর বেশিরভাগ ঋণাত্মক চার্জ মাটিতে নামায়। অল্প কিছু বজ্রপাত আসে মেঘের মাথার ধনাত্মক অংশ থেকে, যা ঝড়ের মূল অংশ থেকে অনেক কিলোমিটার দূরেও পড়তে পারে। এই কারণেই মাথার উপর পরিষ্কার নীল আকাশ থাকলেও দূরে ঝড় চললে বাজ পড়তে পারে।
উপগ্রহের মাপজোক অনুযায়ী, পুরো পৃথিবীতে প্রতি সেকেন্ডে গড়ে প্রায় চল্লিশ থেকে পঞ্চাশটি বিদ্যুৎ চমক ঘটে। এর বেশিরভাগই স্থলভাগে, বিশেষ করে গরম, আর্দ্র ক্রান্তীয় অঞ্চলে, কারণ মাটি সাগরের চেয়ে দ্রুত গরম হয় আর শক্তিশালী ঊর্ধ্বমুখী বাতাস তৈরি করে।
বজ্রের গর্জন আসে কোথা থেকে
বিদ্যুৎ চমক আর বজ্রের শব্দ একই ঘটনার দুই রূপ। বজ্রপাতের পথে বাতাস হঠাৎ এত গরম হয় যে তা বিস্ফোরণের মতো চারদিকে প্রসারিত হয়। এই আকস্মিক প্রসারণ একটা প্রবল চাপের ঢেউ তৈরি করে, যা আমরা শুনি গুড়ুম গুড়ুম শব্দ হিসেবে। কাছের বাজ শোনায় তীক্ষ্ণ চড়চড় শব্দের মতো, আর দূরের বাজ শোনায় লম্বা গড়গড় আওয়াজের মতো, কারণ পথের বিভিন্ন অংশ থেকে শব্দ ভিন্ন সময়ে কানে পৌঁছায়।
আলো প্রায় সাথে সাথে পৌঁছায়, কিন্তু শব্দ বাতাসে চলে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩৪৩ মিটার। তাই ঝলক দেখার পর থেকে গর্জন শোনা পর্যন্ত সেকেন্ড গুনে তিন দিয়ে ভাগ করলে মোটামুটি বোঝা যায় বাজটা কত কিলোমিটার দূরে পড়েছে।
বজ্রপাত কোথায় পড়ে, আর কেন
বজ্রপাত সাধারণত মেঘ থেকে মাটিতে পৌঁছানোর সবচেয়ে সহজ পথ খোঁজে। খোলা মাঠে দাঁড়ানো একা মানুষ, উঁচু গাছ, পানির কাছাকাছি জায়গা বা টাওয়ার এই কারণে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। আবার 'একই জায়গায় দুবার বাজ পড়ে না' কথাটাও ভুল। উঁচু ভবন ও টাওয়ারে বছরে বহুবার বাজ পড়ে।
বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম বজ্রপাতপ্রবণ অঞ্চল। খোলা ধানক্ষেতে কাজ করা কৃষক, নদীতে মাছ ধরা জেলে আর খোলা মাঠে খেলা মানুষই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। তাই বজ্রপাতের বিজ্ঞান বোঝা শুধু কৌতূহলের বিষয় নয়, জীবন বাঁচানোরও বিষয়।
বজ্রঝড়ে নিরাপদ থাকার নিয়ম
- গর্জন শোনা গেলেই বুঝে নাও, তুমি বজ্রপাতের নাগালে আছো। দ্রুত পাকা দালান বা ধাতব ছাদের বন্ধ গাড়ির ভেতরে চলে যাও।
- খোলা মাঠ, পানি, নৌকা, উঁচু গাছ আর বিদ্যুতের খুঁটি থেকে দূরে থাকো। গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়া বিপজ্জনক।
- ঘরের ভেতরে থাকলে জানালা, দরজা, পানির কল আর তারযুক্ত যন্ত্র থেকে দূরে থাকো।
- আশ্রয় না পেলে পা জোড়া করে মাথা নিচু করে গুটিসুটি হয়ে বসো, শুয়ে পড়ো না।
- শেষ গর্জন শোনার পর অন্তত ৩০ মিনিট অপেক্ষা করে তবেই বাইরে বের হও।
শেষ কথা
একটা মেঘ, যার ভেতরে শুধু পানি আর বরফ, সেটাই কোটি কোটি ছোট সংঘর্ষে নিজেকে বিশাল ব্যাটারিতে পরিণত করে, আর এক ঝলকে সেই শক্তি ছেড়ে দেয়। প্রকৃতির এই দৃশ্য যেমন সুন্দর, তেমনি ভয়ংকর। পরের বার আকাশে বিদ্যুৎ চমকালে মনে রেখো, তুমি দেখছ পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে নাটকীয় পরীক্ষাগুলোর একটা, তবে দেখো নিরাপদ জায়গা থেকে। বজ্রপাতকে থামানো যায় না, কিন্তু এর বিজ্ঞান বুঝলে আর কয়েকটা সহজ নিয়ম মানলে এর বিপদ থেকে নিজেকে ও আশপাশের মানুষকে অনেকটাই রক্ষা করা যায়। জ্ঞানই এখানে সবচেয়ে ভালো বজ্রনিরোধক, আর সেই জ্ঞান পরিবারের সবার সাথে ভাগ করে নেওয়াটাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
নিজে দেখুন
নিজে দেখো: পরের বজ্রঝড়ে নিরাপদ ঘরের ভেতর থেকে ঝলক দেখার সাথে সাথে সেকেন্ড গোনা শুরু করো, গর্জন শুনলে থামো। সংখ্যাটাকে তিন দিয়ে ভাগ করলে পাবে বাজটা মোটামুটি কত কিলোমিটার দূরে। কয়েকবার গুনলে বুঝবে ঝড়টা কাছে আসছে না দূরে সরে যাচ্ছে!
ছোট্ট যাচাই
কতটা মনে আছে, দেখে নিন
১. বজ্রমেঘের ভেতরে চার্জ আলাদা হয় কীভাবে?
২. ঝলক দেখার পর গর্জন শুনতে যত সেকেন্ড লাগে, তাকে ৩ দিয়ে ভাগ করলে কী আন্দাজ মেলে?
তথ্যসূত্র
কৃতজ্ঞতা
- তথ্য যাচাই: ১ নভেম্বর, ২০২৬