জোয়ার-ভাটা কেন হয়? চাঁদের টানে সাগর
· পড়তে ৮ মিনিট · ✓ তথ্য যাচাই করা
ছোট উত্তর · ১০ সেকেন্ডে
জোয়ার-ভাটা হয় মূলত চাঁদের মহাকর্ষের টানে, সাথে সূর্যেরও। চাঁদ পৃথিবীর কাছের পাশের পানিকে বেশি আর দূরের পাশের পানিকে কম টানে, ফলে দুই পাশেই সাগর ফুলে ওঠে। পৃথিবী ঘোরার সময় কোনো উপকূল এই ফোলার নিচ দিয়ে গেলে জোয়ার, সরে গেলে ভাটা। তাই বেশির ভাগ জায়গায় দিনে দুবার জোয়ার হয়।
নদীর ঘাটে দাঁড়িয়ে খেয়াল করেছেন? সকালে যে সিঁড়ি পানির নিচে ডুবে ছিল, বিকেলে সেটা শুকনো, কাদা বেরিয়ে আছে। আবার রাতে পানি ফিরে আসে। কেউ পাম্প চালায়নি, কেউ বাঁধ খোলেনি। তাহলে জোয়ার ভাটা কেন হয়? উত্তরটা লুকিয়ে আছে আকাশে, প্রায় ৩ লাখ ৮৪ হাজার কিলোমিটার দূরে থাকা চাঁদের মধ্যে। চলুন, সহজ করে দেখি কীভাবে চাঁদ পুরো সাগরকে টেনে নাড়ায়।
সংক্ষেপে — জোয়ার ভাটা কেন হয়: চাঁদ ও সূর্যের মহাকর্ষ সাগরকে টানে
মহাবিশ্বের সব বস্তু একে অপরকে টানে, এর নাম মহাকর্ষ। পৃথিবী যেমন চাঁদকে টেনে ধরে রেখেছে, চাঁদও পৃথিবীকে টানে। কিন্তু মাটি শক্ত, সে সহজে নড়ে না। সাগরের পানি তরল, তাই চাঁদের টানে পানি একটু সরে গিয়ে ফুলে ওঠে। পানি যেখানে ফুলে ওঠে, সেখানে হয় জোয়ার। আর যেখান থেকে পানি সরে যায়, সেখানে হয় ভাটা।
সূর্য চাঁদের চেয়ে বহুগুণ ভারী, তবু জোয়ারে চাঁদই বড় খেলোয়াড়। কারণ জোয়ারের জন্য আসল ব্যাপার মোট টান নয়, বরং পৃথিবীর কাছের পাশ আর দূরের পাশের টানের পার্থক্য। চাঁদ অনেক কাছে বলে এই পার্থক্য বেশি। হিসাব বলে, সূর্যের জোয়ার-শক্তি চাঁদের প্রায় অর্ধেকের একটু কম। তাই জোয়ার ভাটার কারণ মূলত চাঁদ, সূর্য তার সহকারী।
- চাঁদের জোয়ার-শক্তি১০০ তুলনামূলক
- সূর্যের জোয়ার-শক্তি৪৬ তুলনামূলক
জানেন কি?ট্যাপ করে দেখুন
মাটিও জোয়ারে ফোলে! চাঁদের টানে পৃথিবীর শক্ত ভূমিও দিনে কয়েক দশ সেন্টিমিটার পর্যন্ত ওঠানামা করে। আমরা টের পাই না, কারণ আমাদের চারপাশের সবকিছু একসাথে ওঠে-নামে।
প্রশ্ন যেভাবেই করুন, উত্তরের মূল কথা একটাই: টানের পার্থক্য। চাঁদ পৃথিবীর এক পাশকে বেশি, অন্য পাশকে কম টানে, আর এই পার্থক্যই সাগরকে লম্বাটে করে দেয়, অনেকটা ডিমের মতো। এই একটা ধারণা বুঝলে বাকি সব প্রশ্নের উত্তর নিজে থেকেই মিলে যায়।
দিনে দুবার জোয়ার কেন? পৃথিবীর দুই পাশে ফোলা
এখানেই মজার ধাঁধা। চাঁদ যদি পানিকে নিজের দিকে টানে, তাহলে তো দিনে একবারই জোয়ার হওয়ার কথা, যখন আমরা চাঁদের দিকে থাকি। অথচ বেশির ভাগ উপকূলে দিনে দুবার জোয়ার আর দুবার ভাটা হয়। কেন?
ব্যাপারটা হলো, চাঁদের টান পৃথিবীর সব জায়গায় সমান নয়। চাঁদের দিকের সাগর সবচেয়ে বেশি টান পায়, পৃথিবীর মাঝখান তার চেয়ে কম, আর উল্টো পাশের সাগর সবচেয়ে কম। ফলে কাছের পাশের পানি চাঁদের দিকে একটু এগিয়ে যায়, আর দূরের পাশের পানি যেন একটু পেছনে পড়ে থাকে। দুই দিকেই পানি ফুলে ওঠে, তৈরি হয় দুটি ‘জোয়ারের ঢেউ-ফোলা’। মাঝের দুই পাশে পানি কমে যায়, সেখানে ভাটা।
এবার পৃথিবী ঘুরছে, দিনে একবার পুরো পাক। ঘোরার সময় আপনার শহর একবার কাছের ফোলার নিচ দিয়ে যায়, আবার একবার দূরের ফোলার নিচ দিয়ে। তাই দিনে দুবার জোয়ার, মাঝে দুবার ভাটা। এক জোয়ার থেকে পরের ভাটা আসতে লাগে প্রায় ৬ ঘণ্টা ১২ মিনিট।
- 🌊জোয়ার
- 🏝️ভাটা
- 🌊আবার জোয়ার
- 🏝️আবার ভাটা
↺ আবার প্রথম ধাপে ফিরে যায়
ভরা কটাল ও মরা কটাল: কখন জোয়ার সবচেয়ে বড়?
জেলে আর মাঝিরা জানেন, সব জোয়ার এক রকম নয়। কোনো কোনো দিন পানি অনেক উঁচুতে ওঠে, ভাটায় অনেক নিচে নামে। আবার কোনো দিন জোয়ার-ভাটা দুটোই দুর্বল। এর নাম ভরা কটাল আর মরা কটাল।
ভরা কটাল (Spring tide)
অমাবস্যা আর পূর্ণিমায় সূর্য, পৃথিবী আর চাঁদ প্রায় এক সরলরেখায় থাকে। তখন চাঁদ আর সূর্যের টান একসাথে কাজ করে, ফোলা হয় সবচেয়ে বড়। জোয়ার বেশি উঁচু, ভাটা বেশি নিচু। এটাই ভরা কটাল। নামটা ইংরেজিতে ‘স্প্রিং’ হলেও বসন্তকালের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই, মাসে দুবার এটা হয়।
মরা কটাল (Neap tide)
চাঁদ যখন অর্ধেক দেখা যায়, তখন সূর্য আর চাঁদ পৃথিবীর সাথে সমকোণে থাকে। একজন এক দিকে টানে, আরেকজন অন্য দিকে। টান খানিকটা কাটাকাটি হয়ে যায়, তাই জোয়ার-ভাটার পার্থক্য সবচেয়ে কম। এটাই মরা কটাল।
- 🌑অমাবস্যা: ভরা কটাল
- 🌓অর্ধচন্দ্র: মরা কটাল
- 🌕পূর্ণিমা: ভরা কটাল
- 🌗অর্ধচন্দ্র: মরা কটাল
↺ আবার প্রথম ধাপে ফিরে যায়
তাই ক্যালেন্ডারে পূর্ণিমা বা অমাবস্যা দেখলেই বুঝবেন, উপকূলে ভরা কটালের সময় আসছে। আরেকটা মজার তথ্য: চাঁদ সূর্যের মুখ ঢেকে যে সূর্যগ্রহণ ঘটায়, সেটা হয় শুধু অমাবস্যায়, তাই সূর্যগ্রহণ সবসময় ভরা কটালের সময়েই পড়ে।
সুন্দরবন ও নদীতে জোয়ারের জীবন
বাংলাদেশে জোয়ার-ভাটা শুধু সাগরতীরের ব্যাপার নয়। বঙ্গোপসাগরের জোয়ার নদীর মোহনা দিয়ে ভেতরে ঢুকে বহু দূর পর্যন্ত যায়। খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলার অনেক নদীতে দিনে দুবার পানি বাড়ে-কমে। নৌকার মাঝিরা জোয়ারের স্রোত ধরে উজানে যান, ভাটার স্রোতে ফেরেন, এতে তেল আর পরিশ্রম দুটোই বাঁচে।
সুন্দরবন জোয়ারের তৈরি এক জগৎ। দিনে দুবার বনের বড় অংশের মাটি পানিতে ডোবে, আবার জেগে ওঠে। এই নোনা কাদায় সাধারণ গাছ বাঁচতে পারে না। তাই সুন্দরী, কেওড়ার মতো অনেক ম্যানগ্রোভ গাছ মাটির ওপর খাড়া শ্বাসমূল বের করে, যাতে ডুবে থাকা কাদাতেও বাতাস নিতে পারে। ভাটার সময় কাদায় বেরিয়ে আসে কাঁকড়া আর ছোট মাছ। জোয়ারের পানি আবার নিয়ে আসে নতুন পলি আর খাবার।
জোয়ারের পানি দক্ষিণ থেকে নদী বেয়ে ভেতরে ঢোকে
কৃষকরাও জোয়ারের হিসাব রাখেন। উপকূলের কিছু এলাকায় জোয়ারের মিঠা পানি খালে ঢুকিয়ে সেচ দেওয়ার রীতি বহু পুরোনো। আবার জোয়ারের নোনা পানি ক্ষেতে ঢুকলে ফসলের ক্ষতি হয়, তাই বাঁধ আর স্লুইসগেট দিয়ে পানি নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।
জোয়ার কি প্রতিদিন একই সময়ে আসে? প্রায় ৫০ মিনিট পিছিয়ে যায়
না, জোয়ার প্রতিদিন একই সময়ে আসে না। আজ যদি দুপুর ১২টায় জোয়ার হয়, কাল হবে প্রায় দুপুর ১২টা ৫০-এ। কেন?
পৃথিবী যখন একবার ঘোরে, চাঁদও বসে থাকে না। চাঁদ নিজের কক্ষপথে একই দিকে কিছুটা এগিয়ে যায়। তাই চাঁদকে আবার মাথার ওপরে পেতে পৃথিবীকে আরও প্রায় ৫০ মিনিট ঘুরতে হয়। এ কারণে একটা ‘জোয়ার-দিন’ ২৪ ঘণ্টা নয়, প্রায় ২৪ ঘণ্টা ৫০ মিনিট। চাঁদ ওঠার সময়ও ঠিক এভাবেই রোজ পিছায়, খেয়াল করে দেখবেন।
৫০মিনিট
রোজ জোয়ার পিছায় প্রায়
একটা জোয়ার-দিন প্রায় ২৪ ঘণ্টা ৫০ মিনিট
তবে এই হিসাব গড়। উপকূলের গড়ন, নদীর গভীরতা আর বাতাসের কারণে কোনো জায়গায় জোয়ার একটু আগে-পরে হয়। তাই বন্দরগুলো প্রতিটি জায়গার জন্য আলাদা জোয়ারের সময়সূচি তৈরি করে।
জানেন কি?ট্যাপ করে দেখুন
জোয়ার আস্তে আস্তে চাঁদকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। জোয়ারের ঘর্ষণে পৃথিবীর ঘূর্ণন খুব ধীরে কমছে, আর সেই শক্তি পেয়ে চাঁদ বছরে প্রায় ৩.৮ সেন্টিমিটার করে সরে যাচ্ছে। বিস্তারিত পড়ুন: [চাঁদ কি দূরে সরে যাচ্ছে?](/scheduled/moon-moving-away)
চাঁদের পুরো গল্প জানতে ঘুরে আসুন আমাদের [চাঁদে যাত্রা](/journey/moon) পাতায়। আর সূর্যের আলো যে প্রায় ৮ মিনিটে পৃথিবীতে আসে, সেই মজার হিসাব আছে [এখানে](/facts/sun-light-8-minutes)।
এক নজরে মনে রাখার কথা
- জোয়ার ভাটা কেন হয়: চাঁদ ও সূর্যের টানের পার্থক্যে সাগর দুই পাশে ফোলে।
- দিনে দুবার জোয়ার কেন: পৃথিবী ঘুরতে ঘুরতে দুই ফোলার নিচ দিয়েই যায়।
- ভরা কটাল হয় পূর্ণিমা-অমাবস্যায়, মরা কটাল অর্ধচন্দ্রে।
- জোয়ার রোজ প্রায় ৫০ মিনিট পিছিয়ে আসে।
- সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন বেঁচে আছে এই জোয়ার-ভাটার ছন্দে।
পরের বার নদীর ঘাটে পানি বাড়তে দেখলে মনে রাখবেন, প্রায় ৩ লাখ ৮৪ হাজার কিলোমিটার দূর থেকে চাঁদ নিঃশব্দে টান দিচ্ছে। এর চেয়ে সুন্দর দূরের বন্ধুত্ব আর কী হতে পারে?
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
পুকুরে বা দিঘিতে জোয়ার-ভাটা হয় না কেন?
জোয়ারের টান আসলে দুই পাশের টানের পার্থক্য থেকে আসে। পুকুর এত ছোট যে তার এক পাড় আর অন্য পাড়ে চাঁদের টান প্রায় হুবহু এক। তাই পানি এক দিকে জমা হওয়ার সুযোগই পায় না। বড় হ্রদে খুব সামান্য, কয়েক সেন্টিমিটারের জোয়ার মাপা যায়, কিন্তু চোখে পড়ে না। বিশাল সাগরেই জোয়ার স্পষ্ট হয়।
চাঁদ না থাকলে কি জোয়ার-ভাটা হতো না?
হতো, তবে অনেক দুর্বল। সূর্যও সাগরকে টানে, কিন্তু সূর্যের জোয়ার-শক্তি চাঁদের প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি। চাঁদ না থাকলে শুধু সূর্যের ছোট জোয়ার থাকত, ভরা কটাল-মরা কটালের ওঠানামাও থাকত না। উপকূলের গাছপালা, মাছ আর জেলেদের জীবনও হতো একেবারে অন্যরকম।
জলোচ্ছ্বাস আর জোয়ার কি একই জিনিস?
না। জোয়ার হয় চাঁদ-সূর্যের টানে, নিয়ম মেনে, আগে থেকে হিসাব করা যায়। জলোচ্ছ্বাস হয় ঘূর্ণিঝড়ের প্রবল বাতাস আর কম বায়ুচাপে সাগরের পানি উপকূলে ঠেলে ওঠায়। সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো যখন জলোচ্ছ্বাস ভরা জোয়ারের সময় আসে, তখন দুটো মিলে পানি আরও উঁচুতে ওঠে। তাই ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কবার্তা পেলেই আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে হবে।
জোয়ার-ভাটা দিয়ে কি বিদ্যুৎ বানানো যায়?
যায়। জোয়ারের সময় পানি একটা বাঁধের পেছনে আটকে রেখে ভাটার সময় টারবাইনের ভেতর দিয়ে ছেড়ে দিলে বিদ্যুৎ তৈরি হয়, অনেকটা জলবিদ্যুতের মতো। ফ্রান্সের লা রঁস নদীর মোহনায় ১৯৬৬ সাল থেকে এমন কেন্দ্র চলছে। জোয়ার রোজ নিয়ম করে আসে বলে এই বিদ্যুৎ আগে থেকেই হিসাব করা যায়, তবে বাঁধ বানানো ব্যয়বহুল আর পরিবেশের ওপর প্রভাবও ভাবতে হয়।
নিজে দেখুন
পরের পূর্ণিমা বা অমাবস্যার দিনে কাছের নদীঘাটে একটা খুঁটি বা সিঁড়ির ধাপ চিহ্ন দিয়ে রাখুন, সকাল-বিকেল পানির উচ্চতা দেখুন। এক সপ্তাহ পর অর্ধচন্দ্রের দিনে আবার মিলিয়ে দেখুন, ভরা কটাল আর মরা কটালের পার্থক্য নিজের চোখেই ধরা পড়বে। রাতে চাঁদের কলাও খেয়াল রাখুন।
ছোট্ট যাচাই
কতটা মনে আছে, দেখে নিন
১. জোয়ার-ভাটা মূলত কীসের টানে হয়?
২. জোয়ার প্রতিদিন প্রায় কত মিনিট পিছিয়ে যায়?
তথ্যসূত্র
- ১NOAA Ocean Service — Tides and Water Levels tutorial oceanservice.noaa.gov ↗
- ২NOAA Ocean Service — What are spring and neap tides? oceanservice.noaa.gov ↗
- ৩NOAA — Changing tide times (tidal day 24 h 50 min) oceanservice.noaa.gov ↗
- ৪NASA Science — Tides science.nasa.gov ↗
- ৫Encyclopaedia Britannica — Tide britannica.com ↗
- ৬Banglapedia — Bay of Bengal (semi-diurnal tides) en.banglapedia.org ↗
- ৭NOAA Ocean Service — Variations in tides (solar tides about half of lunar) oceanservice.noaa.gov ↗
- ৮NASA Science — Earth's Moon facts (mean distance 384,400 km) science.nasa.gov ↗
- ৯NASA — Laser beams reflected between Earth and Moon (Moon recedes ~3.8 cm/yr) nasa.gov ↗
- ১০PNNL Tethys — La Rance Tidal Barrage (opened 1966) tethys.pnnl.gov ↗
- ১১Earth tide (overview; solid-earth tide up to ~30 cm) en.wikipedia.org ↗
কৃতজ্ঞতা
- তথ্য যাচাই: ২৫ অক্টোবর, ২০২৬