বিজ্ঞানী টিমটিম
আজ রাতের আকাশঢাকার আকাশে আজ রাতে কী দেখা যাবে?লাইভ ম্যাপ

এসএসসি জীববিজ্ঞান · অধ্যায় ১৩

জীবের পরিবেশ

এক কথায়

কোনো এলাকার জীব ও তাদের চারপাশের জড় পরিবেশ মিলে যে স্বনির্ভর ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, তাই বাস্তুতন্ত্র। এর উপাদান দুই ধরনের: অজীব (আলো, পানি, মাটি, তাপ) ও জীব (উৎপাদক, খাদক, বিয়োজক)। সূর্যের শক্তি উৎপাদক থেকে খাদ্য শিকল ধরে খাদকে যায়; প্রতি ধাপে প্রায় ৯০% শক্তি হারিয়ে যায়, তাই শক্তিপ্রবাহ একমুখী। পুষ্টি উপাদান কিন্তু চক্রাকারে ঘোরে।

পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্র কী

একটি জীবের চারপাশে যা কিছু আছে, জীবন্ত কিংবা জড়, এবং যা তার জীবনকে প্রভাবিত করে, সব মিলেই তার পরিবেশ। পুকুরের একটি মাছের পরিবেশ মানে শুধু পানি নয়; পানির তাপমাত্রা, তাতে দ্রবীভূত অক্সিজেন, শ্যাওলা, অন্য মাছ, এমনকি তীরে বসা বক পাখিও।

কোনো নির্দিষ্ট এলাকার জীব সম্প্রদায় এবং তাদের অজীব পরিবেশ যখন পরস্পরের সাথে ক্রিয়া-বিক্রিয়া করে একটি স্বনির্ভর একক তৈরি করে, তাকে বাস্তুতন্ত্র (ecosystem) বলে। ১৯৩৫ সালে ব্রিটিশ উদ্ভিদবিজ্ঞানী এ. জি. ট্যান্সলি প্রথম 'ecosystem' শব্দটি ব্যবহার করেন। জীব ও পরিবেশের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে যে শাখা আলোচনা করে, তার নাম বাস্তুবিদ্যা (ecology)।

  • স্থলজ বাস্তুতন্ত্র: বন, তৃণভূমি, মরুভূমি।
  • জলজ বাস্তুতন্ত্র: পুকুর, নদী, হ্রদ (স্বাদু পানি) এবং সমুদ্র, মোহনা (লোনা পানি)।
  • কৃত্রিম বাস্তুতন্ত্র: মানুষের তৈরি, যেমন ধানক্ষেত বা অ্যাকুয়ারিয়াম।

বাস্তুতন্ত্রের উপাদান

প্রতিটি বাস্তুতন্ত্রে দুই ধরনের উপাদান থাকে: অজীব (abiotic) ও জীব (biotic)। অজীব উপাদান হলো জড় অংশ, যার ওপর জীবেরা নির্ভর করে। জীব উপাদানকে খাদ্য সংগ্রহের ধরন অনুযায়ী তিন ভাগে ভাগ করা হয়।

  • অজীব উপাদান: আলো, তাপ, পানি, বায়ু, মাটি, খনিজ লবণ, CO2, O2 এবং হিউমাস জাতীয় জৈব পদার্থ।
  • উৎপাদক: সবুজ উদ্ভিদ ও শৈবাল, যারা সালোকসংশ্লেষণে সূর্যের আলোকশক্তিকে খাদ্যের রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তর করে। পুকুরে ফাইটোপ্ল্যাংকটন প্রধান উৎপাদক।
  • প্রথম স্তরের খাদক (তৃণভোজী): সরাসরি উৎপাদক খায়, যেমন ঘাসফড়িং, গরু, জুপ্ল্যাংকটন।
  • দ্বিতীয় স্তরের খাদক (মাংসাশী): তৃণভোজীকে খায়, যেমন ব্যাঙ, ছোট মাছ।
  • তৃতীয় বা সর্বোচ্চ স্তরের খাদক: যেমন সাপ, বাজপাখি, বাঘ, বড় মাছ।
  • বিয়োজক: ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক, যারা মৃত জীবদেহ পচিয়ে খনিজ উপাদান আবার মাটি ও পানিতে ফিরিয়ে দেয়।

পুকুর: একটি আদর্শ বাস্তুতন্ত্র

পরীক্ষায় উদাহরণ হিসেবে সবচেয়ে বেশি আসে পুকুরের বাস্তুতন্ত্র, কারণ ছোট একটি জায়গায় সব উপাদান স্পষ্ট দেখা যায়। পানি, তলার কাদা, দ্রবীভূত O2 ও CO2, সূর্যালোক হলো অজীব উপাদান।

ভাসমান আণুবীক্ষণিক শৈবাল (ফাইটোপ্ল্যাংকটন), কচুরিপানা, শাপলা, পাতাঝাঁঝি উৎপাদক। ক্ষুদ্র প্রাণী জুপ্ল্যাংকটন এদের খায়; ছোট মাছ ও জলজ পোকা খায় জুপ্ল্যাংকটন; বড় মাছ, বক বা মাছরাঙা খায় ছোট মাছ। তলার কাদায় থাকা ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক মৃত দেহাবশেষ পচিয়ে পুষ্টি ফিরিয়ে দেয়, ফলে পুকুর বছরের পর বছর নিজেকে টিকিয়ে রাখে।

খাদ্য শিকল ও খাদ্য জাল

উৎপাদক থেকে শুরু করে পর্যায়ক্রমে এক জীব আরেক জীবকে খাওয়ার মাধ্যমে খাদ্যশক্তি যে ধারাবাহিক পথে স্থানান্তরিত হয়, তাকে খাদ্য শিকল (food chain) বলে। প্রতিটি ধাপকে বলে পুষ্টিস্তর বা ট্রফিক লেভেল।

বাস্তবে কোনো প্রাণী একটিমাত্র খাবারের ওপর নির্ভর করে না। ব্যাঙ ঘাসফড়িংও খায়, মশাও খায়; সাপ ব্যাঙও খায়, ইঁদুরও খায়। এভাবে অনেকগুলো খাদ্য শিকল পরস্পরের সাথে জড়িয়ে যে জালের মতো গঠন তৈরি করে, তাকে খাদ্য জাল (food web) বলে। খাদ্য জাল যত জটিল, বাস্তুতন্ত্র তত স্থিতিশীল, কারণ একটি খাবার কমে গেলে খাদক বিকল্প খুঁজে নিতে পারে।

  • শিকারি খাদ্য শিকল (grazing): সবুজ উদ্ভিদ থেকে শুরু। ঘাস → ঘাসফড়িং → ব্যাঙ → সাপ → বাজপাখি।
  • পরজীবী খাদ্য শিকল: বড় পোষক থেকে ছোট পরজীবীর দিকে যায়। গরু → উকুন → প্রোটোজোয়া।
  • মৃতজীবী বা ডেট্রিটাস খাদ্য শিকল (detritus): মৃত জৈব পদার্থ থেকে শুরু। ঝরা পাতা → কেঁচো → মুরগি → মানুষ।

বাস্তুতন্ত্রে শক্তিপ্রবাহ

সব বাস্তুতন্ত্রের শক্তির মূল উৎস সূর্য। উদ্ভিদ পাতায় পড়া সূর্যালোকের খুব সামান্য অংশ, মোটামুটি ১–২%, সালোকসংশ্লেষণে খাদ্যে আবদ্ধ করতে পারে। এরপর এক পুষ্টিস্তর থেকে পরের স্তরে যাওয়ার সময় বেশিরভাগ শক্তি শ্বসন, চলাফেরা ও দেহতাপ হিসেবে খরচ হয়ে যায়।

গড়ে প্রতি ধাপে মাত্র প্রায় ১০% শক্তি পরের স্তরে যায়; একে লিন্ডেম্যানের ১০% সূত্র বলে। যেমন উৎপাদকে ১০০০০ kJ শক্তি থাকলে তৃণভোজীতে যায় প্রায় ১০০০ kJ, মাংসাশীতে প্রায় ১০০ kJ, সর্বোচ্চ খাদকে প্রায় ১০ kJ। এজন্যই খাদ্য শিকল সাধারণত ৪–৫ ধাপের বেশি লম্বা হয় না।

শক্তি কখনো উল্টো দিকে সূর্যে ফেরে না, তাই শক্তিপ্রবাহ একমুখী। অথচ কার্বন, নাইট্রোজেন, ফসফরাসের মতো পুষ্টি উপাদান বিয়োজকের কাজে আবার পরিবেশে ফিরে আসে; তাই পুষ্টির প্রবাহ চক্রাকার।

পরবর্তী স্তরের শক্তি ≈ আগের স্তরের শক্তি × 10/100

সূর্যালোক → উৎপাদক → তৃণভোজী → মাংসাশী → সর্বোচ্চ খাদক (শক্তি একমুখী)

বাস্তুতাত্ত্বিক পিরামিড

পুষ্টিস্তরগুলোকে নিচে উৎপাদক রেখে ওপরে খাদক সাজালে পিরামিডের মতো আকৃতি পাওয়া যায়। শক্তির পিরামিড সবসময় সোজা (খাড়া), কারণ ওপরের দিকে শক্তি সবসময় কমে।

সংখ্যার পিরামিড সাধারণত সোজা হলেও সবসময় নয়। একটি বড় আমগাছে শত শত পোকা থাকতে পারে, তখন নিচের স্তরে সংখ্যা কম, ওপরে বেশি; পিরামিড উল্টো হয়ে যায়। কিন্তু শক্তির পিরামিড কখনো উল্টো হয় না, এটা পরীক্ষায় প্রায়ই জিজ্ঞেস করা হয়।

জীবের পারস্পরিক সম্পর্ক

একই বাস্তুতন্ত্রে বসবাসকারী জীবেরা নানাভাবে একে অপরের ওপর প্রভাব ফেলে। কেউ উপকৃত হয়, কেউ ক্ষতিগ্রস্ত, কেউ নিরপেক্ষ থাকে।

  • মিথোজীবিতা: দুই জীবই উপকৃত। যেমন লাইকেনে শৈবাল খাদ্য তৈরি করে আর ছত্রাক পানি ও আশ্রয় দেয়; শিমজাতীয় উদ্ভিদের মূলে রাইজোবিয়াম ব্যাকটেরিয়া নাইট্রোজেন সংবন্ধন করে।
  • সহভোজিতা: একজন উপকৃত, অন্যজনের লাভ বা ক্ষতি নেই। যেমন বড় গাছের ডালে পরাশ্রয়ী অর্কিড।
  • পরজীবিতা: পরজীবী উপকৃত, পোষক ক্ষতিগ্রস্ত। যেমন স্বর্ণলতা, মানুষের অন্ত্রে কৃমি।
  • শিকার: এক প্রাণী অন্য প্রাণীকে মেরে খায়। যেমন বাঘ ও হরিণ।
  • প্রতিযোগিতা: খাদ্য, আলো, জায়গা বা সঙ্গীর জন্য লড়াই; একই প্রজাতির মধ্যে বা ভিন্ন প্রজাতির মধ্যে হতে পারে।

পরিবেশের ভারসাম্য ও সংরক্ষণ

একটি সুস্থ বাস্তুতন্ত্রে উৎপাদক, খাদক ও বিয়োজকের সংখ্যা ও কাজ একটি ভারসাম্যে থাকে। কোনো একটি স্তর নষ্ট হলে পুরো শিকল দুলে ওঠে। ধরো খেতের সাপ মেরে ফেলা হলো; তখন ইঁদুর বেড়ে গিয়ে ফসলের বড় ক্ষতি করে।

বন উজাড়, জলাশয় ভরাট, কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার, শিল্পবর্জ্য ও প্লাস্টিক দূষণ আমাদের বাস্তুতন্ত্রকে দুর্বল করছে। কিছু কীটনাশক খাদ্য শিকলের প্রতিটি ধাপে জমতে জমতে ওপরের খাদকের দেহে অনেক বেশি ঘনত্বে পৌঁছায়; একে জৈব বিবর্ধন (biomagnification) বলে।

সুন্দরবন বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র। এটি ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের প্রাকৃতিক ঢাল, আবার রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ অসংখ্য প্রজাতির আবাস। বনায়ন, জলাশয় রক্ষা, কীটনাশকের পরিমিত ব্যবহার ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন মানা পরিবেশ টিকিয়ে রাখার মূল উপায়।

বহুনির্বাচনী প্রশ্ন (MCQ)

  1. ১. 'Ecosystem' শব্দটি প্রথম কে ব্যবহার করেন?

    • ক) চার্লস ডারউইন
    • খ) এ. জি. ট্যান্সলি
    • গ) আর. লিন্ডেম্যান
    • ঘ) আর্নস্ট হেকেল
    উত্তর দেখো

    উত্তর: খ) এ. জি. ট্যান্সলি — ১৯৩৫ সালে এ. জি. ট্যান্সলি প্রথম ecosystem শব্দটি ব্যবহার করেন।

  2. ২. নিচের কোনটি বাস্তুতন্ত্রের অজীব উপাদান?

    • ক) ছত্রাক
    • খ) ফাইটোপ্ল্যাংকটন
    • গ) হিউমাস
    • ঘ) কেঁচো
    উত্তর দেখো

    উত্তর: গ) হিউমাস — হিউমাস জড় জৈব পদার্থ, তাই অজীব উপাদান; বাকিগুলো জীব।

  3. ৩. পুকুরের বাস্তুতন্ত্রে প্রধান উৎপাদক কোনটি?

    • ক) জুপ্ল্যাংকটন
    • খ) ফাইটোপ্ল্যাংকটন
    • গ) ছোট মাছ
    • ঘ) ব্যাকটেরিয়া
    উত্তর দেখো

    উত্তর: খ) ফাইটোপ্ল্যাংকটন — ফাইটোপ্ল্যাংকটন সালোকসংশ্লেষণে খাদ্য তৈরি করে।

  4. ৪. ঘাস → ঘাসফড়িং → ব্যাঙ → সাপ শিকলে ব্যাঙ কোন স্তরের খাদক?

    • ক) প্রথম স্তর
    • খ) দ্বিতীয় স্তর
    • গ) তৃতীয় স্তর
    • ঘ) উৎপাদক
    উত্তর দেখো

    উত্তর: খ) দ্বিতীয় স্তর — ঘাসফড়িং প্রথম স্তরের খাদক, তাকে খাওয়া ব্যাঙ দ্বিতীয় স্তরের খাদক।

  5. ৫. উৎপাদকে 5000 kJ শক্তি থাকলে ১০% সূত্র অনুযায়ী দ্বিতীয় স্তরের খাদক কত শক্তি পাবে?

    • ক) 500 kJ
    • খ) 50 kJ
    • গ) 5 kJ
    • ঘ) 250 kJ
    উত্তর দেখো

    উত্তর: খ) 50 kJ — 5000 থেকে তৃণভোজীতে 500 kJ, তা থেকে দ্বিতীয় স্তরে 50 kJ।

  6. ৬. কোন পিরামিড কখনো উল্টো হয় না?

    • ক) সংখ্যার পিরামিড
    • খ) জীবভরের পিরামিড
    • গ) শক্তির পিরামিড
    • ঘ) সবগুলোই উল্টো হতে পারে
    উত্তর দেখো

    উত্তর: গ) শক্তির পিরামিড — ওপরের স্তরে শক্তি সবসময় কমে, তাই শক্তির পিরামিড সবসময় সোজা।

  7. ৭. লাইকেনে শৈবাল ও ছত্রাকের সম্পর্ক কোনটি?

    • ক) পরজীবিতা
    • খ) সহভোজিতা
    • গ) মিথোজীবিতা
    • ঘ) প্রতিযোগিতা
    উত্তর দেখো

    উত্তর: গ) মিথোজীবিতা — দুজনই উপকৃত হয়, তাই এটি মিথোজীবিতা।

  8. ৮. বাস্তুতন্ত্রে শক্তিপ্রবাহ সম্পর্কে কোনটি সঠিক? i. শক্তিপ্রবাহ একমুখী ii. প্রতি স্তরে শক্তি বাড়ে iii. শক্তির মূল উৎস সূর্য

    • ক) i ও ii
    • খ) i ও iii
    • গ) ii ও iii
    • ঘ) i, ii ও iii
    উত্তর দেখো

    উত্তর: খ) i ও iii — প্রতি স্তরে শক্তি কমে, তাই ii ভুল; i ও iii সঠিক।

সৃজনশীল প্রশ্ন

উদ্দীপক: রাফির গ্রামের পুকুরে শ্যাওলা, জুপ্ল্যাংকটন, পুঁটি মাছ ও বোয়াল মাছ আছে। তীরে প্রায়ই মাছরাঙা বসে থাকে। গত বছর পাশের খেতের কীটনাশক বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে পুকুরে মেশার পর দেখা গেল মাছরাঙার সংখ্যা কমে গেছে।

  • ক) বিয়োজক কাকে বলে?
  • খ) শক্তিপ্রবাহ একমুখী কেন? ব্যাখ্যা করো।
  • গ) উদ্দীপকের জীবগুলো দিয়ে একটি খাদ্য শিকল তৈরি করে পুষ্টিস্তর চিহ্নিত করো।
  • ঘ) মাছরাঙার সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণ বিশ্লেষণ করো।
উত্তর দেখো
  1. যেসব অণুজীব (ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক) মৃত জীবদেহ পচিয়ে জটিল জৈব পদার্থকে সরল খনিজ উপাদানে পরিণত করে পরিবেশে ফিরিয়ে দেয়, তাদের বিয়োজক বলে।
  2. সূর্য থেকে আসা শক্তি উৎপাদক থেকে খাদকের দিকে যায়, কিন্তু প্রতি স্তরে বেশিরভাগ শক্তি শ্বসন ও তাপ হিসেবে পরিবেশে হারিয়ে যায়। এই তাপশক্তি উৎপাদক আবার ব্যবহার করতে পারে না এবং শক্তি কখনো সূর্যে ফেরে না। তাই শক্তিপ্রবাহ একমুখী।
  3. শ্যাওলা → জুপ্ল্যাংকটন → পুঁটি মাছ → বোয়াল মাছ/মাছরাঙা। এখানে শ্যাওলা উৎপাদক (১ম পুষ্টিস্তর), জুপ্ল্যাংকটন প্রথম স্তরের খাদক, পুঁটি দ্বিতীয় স্তরের খাদক, বোয়াল ও মাছরাঙা তৃতীয় স্তরের বা সর্বোচ্চ খাদক। এটি একটি শিকারি খাদ্য শিকল।
  4. কীটনাশক অল্প মাত্রায় পানিতে মিশলেও তা সহজে ভাঙে না এবং জীবদেহের চর্বিতে জমে থাকে। প্ল্যাংকটন থেকে পুঁটি, পুঁটি থেকে মাছরাঙায় যাওয়ার সময় প্রতিটি ধাপে বহু খাবার খাওয়ার ফলে বিষের ঘনত্ব বাড়তে থাকে; একে জৈব বিবর্ধন বলে। ফলে শিকলের শীর্ষে থাকা মাছরাঙার দেহে সবচেয়ে বেশি বিষ জমে, তাদের প্রজনন ব্যাহত হয় ও মৃত্যু ঘটে। পাশাপাশি পুঁটি মাছ কমে গেলে খাদ্যসংকটও দেখা দেয়। তাই কীটনাশক দূষণই মাছরাঙা কমার মূল কারণ, যা বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট করছে।

উদ্দীপক: জীববিজ্ঞান ক্লাসে শিক্ষক বোর্ডে দুটি উদাহরণ লিখলেন। (A) শিমগাছের মূলের গুটিতে রাইজোবিয়াম ব্যাকটেরিয়া বাস করে। (B) একটি আমগাছের গায়ে স্বর্ণলতা জড়িয়ে আছে এবং গাছটি দিন দিন দুর্বল হচ্ছে।

  • ক) খাদ্য জাল কী?
  • খ) সংখ্যার পিরামিড উল্টো হতে পারে কেন? ব্যাখ্যা করো।
  • গ) A উদাহরণের সম্পর্কটি ব্যাখ্যা করো।
  • ঘ) A ও B সম্পর্কের মধ্যে কোনটি বাস্তুতন্ত্রের জন্য বেশি উপকারী? যুক্তিসহ মূল্যায়ন করো।
উত্তর দেখো
  1. একটি বাস্তুতন্ত্রে অনেকগুলো খাদ্য শিকল পরস্পর যুক্ত হয়ে যে জালের মতো জটিল খাদ্য সম্পর্ক গড়ে তোলে, তাকে খাদ্য জাল বলে।
  2. সংখ্যার পিরামিডে প্রতিটি স্তরের জীবের সংখ্যা দেখানো হয়, আকার নয়। একটি বড় গাছ (একটিমাত্র উৎপাদক) শত শত পোকার খাদ্য জোগাতে পারে। তখন নিচের স্তরে সংখ্যা কম আর ওপরের স্তরে বেশি হয়, ফলে পিরামিড উল্টো দেখায়।
  3. A তে মিথোজীবিতা দেখা যায়। রাইজোবিয়াম বাতাসের নাইট্রোজেন সংবন্ধন করে শিমগাছকে নাইট্রোজেন যৌগ জোগায়, যা উদ্ভিদের প্রোটিন তৈরিতে লাগে। বিনিময়ে ব্যাকটেরিয়া গাছের মূলে আশ্রয় ও শর্করা জাতীয় খাদ্য পায়। এভাবে দুজনই উপকৃত হয়।
  4. A এর মিথোজীবিতা বাস্তুতন্ত্রের জন্য বেশি উপকারী। এতে দুই জীবই লাভবান হয় এবং মাটিতে নাইট্রোজেন বাড়ে, ফলে পরের ফসল ও আশপাশের উদ্ভিদও উপকৃত হয়, রাসায়নিক সারের প্রয়োজন কমে। B তে স্বর্ণলতা পরজীবী; সে আমগাছ থেকে খাদ্য ও পানি শুষে নেয়, ফলে পোষক দুর্বল হয়, ফলন কমে এবং গাছটির ওপর নির্ভরশীল প্রাণীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই উৎপাদন ও ভারসাম্যের বিচারে A সম্পর্কটি বাস্তুতন্ত্রের জন্য অনেক বেশি উপকারী।

বাস্তব জীবনে মজার যোগসূত্র

অদ্ভুত শোনালেও সত্যি: খাদ্য শিকলের ১০% সূত্রের কারণে এক কেজি বাঘের দেহ গড়তে প্রকৃতিকে মোটামুটি একশো কেজি হরিণ আর হাজার কেজি ঘাস খরচ করতে হয়। এজন্যই পৃথিবীতে ঘাসফড়িং কোটি কোটি, কিন্তু বাঘ গোনা যায় হাজারে। আবার একটি ভাতের থালায় তুমি সরাসরি উৎপাদক খাচ্ছ, তাই শক্তির অপচয় সবচেয়ে কম।

প্রশ্ন ও উত্তর

পরিবেশ আর বাস্তুতন্ত্রের পার্থক্য কী?

পরিবেশ হলো কোনো জীবের চারপাশের সব জীব ও জড় উপাদান। বাস্তুতন্ত্র হলো একটি এলাকার জীব সম্প্রদায় ও অজীব পরিবেশের পারস্পরিক ক্রিয়ায় গড়া স্বনির্ভর একক, যেখানে শক্তিপ্রবাহ ও পুষ্টিচক্র চলে।

বিয়োজক না থাকলে কী হতো?

মৃতদেহ ও ঝরা পাতা পচত না, মাটিতে নাইট্রোজেন-ফসফরাসের মতো খনিজ ফিরে আসত না। কিছুদিনের মধ্যে উৎপাদকেরা পুষ্টির অভাবে মারা যেত এবং পুরো খাদ্য শিকল ভেঙে পড়ত।

খাদ্য শিকল সাধারণত ৪–৫ ধাপের বেশি হয় না কেন?

প্রতি ধাপে প্রায় ৯০% শক্তি হারায়। পাঁচ-ছয় ধাপ পর এত কম শক্তি অবশিষ্ট থাকে যে আরেকটি খাদক স্তর টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয় না।

শক্তিপ্রবাহ একমুখী কিন্তু পুষ্টি চক্রাকার কেন?

শক্তি তাপ হিসেবে পরিবেশে হারিয়ে যায় এবং আর ব্যবহারযোগ্য থাকে না। অন্যদিকে কার্বন, নাইট্রোজেনের মতো পদার্থ বিয়োজকের মাধ্যমে আবার মাটি, পানি ও বায়ুতে ফিরে এসে উদ্ভিদ পুনরায় গ্রহণ করে।

মানুষ কোন স্তরের খাদক?

মানুষ সর্বভুক। ভাত-সবজি খেলে প্রথম স্তরের, মাছ-মাংস খেলে দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্তরের খাদক হিসেবে কাজ করে।

আরও পড়ো

সূত্র: NCTB জীববিজ্ঞান, নবম-দশম শ্রেণি, ত্রয়োদশ অধ্যায়: জীবের পরিবেশ · Encyclopaedia Britannica — Ecosystem · National Geographic Education — Food Web