এসএসসি জীববিজ্ঞান · অধ্যায় ১৪
জীবপ্রযুক্তি
এক কথায়
জীবপ্রযুক্তি হলো জীব বা জীবের অংশ (কোষ, এনজাইম, DNA) কাজে লাগিয়ে মানুষের দরকারি পণ্য ও সেবা তৈরির কৌশল। এর দুটি প্রধান হাতিয়ার হলো টিস্যু কালচার, যাতে ছোট টুকরো থেকে অসংখ্য একই রকম চারা জন্মে, আর জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, যাতে এক জীবের জিন আরেক জীবে বসানো হয়। ইনসুলিন উৎপাদন, বিটি বেগুন, DNA টেস্ট এর উদাহরণ।
জীবপ্রযুক্তি কী: হাজার বছরের পুরোনো, আবার একদম নতুন
জীবপ্রযুক্তি (Biotechnology) হলো জীবিত কোষ, অণুজীব বা তাদের থেকে পাওয়া উপাদান ব্যবহার করে মানুষের প্রয়োজনীয় দ্রব্য উৎপাদন বা কোনো প্রক্রিয়াকে উন্নত করার প্রযুক্তি। শুনতে আধুনিক লাগলেও এর শিকড় বেশ পুরোনো। দুধ থেকে দই পাতা, ভাত থেকে পান্তা, ইস্ট দিয়ে রুটি ফোলানো বা ভিনেগার তৈরি সবই অণুজীবের কাজ, অর্থাৎ প্রাচীন জীবপ্রযুক্তি।
আধুনিক জীবপ্রযুক্তি আরও এক ধাপ এগিয়ে। এখানে বিজ্ঞানীরা সরাসরি কোষের ভেতরে ঢুকে DNA কাটছাঁট করেন, এক জীবের জিন আরেক জীবে বসান, কিংবা একটি পাতার ছোট টুকরো থেকে হাজার হাজার চারা জন্মান। এসএসসি পাঠ্যে এর দুটি প্রধান শাখা গুরুত্বপূর্ণ: টিস্যু কালচার এবং জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং।
টিস্যু কালচার: এক টুকরো থেকে পুরো গাছ
উদ্ভিদের কোনো অঙ্গ বা টিস্যুর ছোট অংশ জীবাণুমুক্ত অবস্থায়, পুষ্টি মাধ্যমে, নিয়ন্ত্রিত আলো ও তাপমাত্রায় রেখে নতুন চারা তৈরির কৌশলকে টিস্যু কালচার বলে। যে অংশটি কেটে নেওয়া হয় তাকে এক্সপ্লান্ট (explant) বলে; যেমন কাণ্ডের অগ্রভাগ, পাতা, মূলের টুকরো বা কক্ষমুকুল।
এটি সম্ভব হয় উদ্ভিদকোষের একটি অসাধারণ গুণের কারণে, যার নাম টটিপোটেন্সি (totipotency)। অর্থাৎ একটি জীবিত উদ্ভিদকোষের ভেতরে পুরো গাছ তৈরির সব তথ্য থাকে, আর সঠিক পরিবেশ পেলে সে আবার পূর্ণাঙ্গ উদ্ভিদে পরিণত হতে পারে। অস্ট্রীয় উদ্ভিদবিজ্ঞানী হ্যাবারল্যান্ড (Haberlandt) ১৯০২ সালে প্রথম এই ধারণা দেন।
- মাধ্যম: সাধারণত MS মাধ্যম (Murashige ও Skoog), যাতে খনিজ লবণ, সুক্রোজ, ভিটামিন, হরমোন (অক্সিন ও সাইটোকাইনিন) এবং জমাট বাঁধাতে অ্যাগার থাকে।
- অক্সিন ও সাইটোকাইনিনের অনুপাত ঠিক করে দেয় কোষ মূল বানাবে না কাণ্ড; সাইটোকাইনিন বেশি হলে কাণ্ড, অক্সিন বেশি হলে মূল তৈরিতে উৎসাহ পায়।
টিস্যু কালচারের ধাপগুলো
পুরো কাজটা জীবাণুমুক্ত না হলে ছত্রাক বা ব্যাকটেরিয়া মাধ্যম দখল করে নেয়। তাই প্রতিটি ধাপে সাবধানতা জরুরি।
- ১. মাতৃগাছ নির্বাচন: রোগমুক্ত, উন্নত গুণের গাছ বেছে নেওয়া।
- ২. মাধ্যম তৈরি ও জীবাণুমুক্ত করা: কালচার মাধ্যম অটোক্লেভে প্রায় 121 °C তাপমাত্রায় 15–20 মিনিট রাখা হয়।
- ৩. এক্সপ্লান্ট জীবাণুমুক্ত করে মাধ্যমে স্থাপন: লেমিনার এয়ার ফ্লো কেবিনেটের ভেতরে কাজ করা হয়।
- ৪. ক্যালাস সৃষ্টি: এক্সপ্লান্টের কোষ বিভাজিত হয়ে অবিন্যস্ত কোষপিণ্ড তৈরি করে, একে ক্যালাস বলে।
- ৫. মূল ও কাণ্ড সৃষ্টি: হরমোনের অনুপাত বদলে ক্যালাস থেকে কাণ্ড ও মূল জন্মানো হয়।
- ৬. চারা স্থানান্তর ও খাপ খাওয়ানো (hardening): চারাকে ধীরে ধীরে বাইরের পরিবেশে অভ্যস্ত করে মাটিতে লাগানো হয়।
টিস্যু কালচারের সুবিধা ও ব্যবহার
বীজ থেকে জন্মানো চারায় বাবা-মায়ের বৈশিষ্ট্য মিশে যায়, কিন্তু টিস্যু কালচারে প্রতিটি চারা মাতৃগাছের হুবহু কপি, অর্থাৎ ক্লোন। এটাই এর বড় শক্তি।
- অল্প জায়গায় অল্প সময়ে বিপুল সংখ্যক একই রকম চারা উৎপাদন।
- কাণ্ডের অগ্রভাগ (meristem) কালচার করে ভাইরাসমুক্ত চারা পাওয়া যায়; যেমন আলু ও কলা।
- যেসব গাছের বীজ হয় না বা বীজ থেকে চারা কঠিন, সেগুলোর বংশবৃদ্ধি; যেমন কলা, অর্কিড।
- বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদ সংরক্ষণ এবং সারা বছর চারা উৎপাদন।
- বাংলাদেশে আলু, কলা, আনারস, অর্কিড, স্ট্রবেরি ইত্যাদির চারা টিস্যু কালচারে তৈরি হয়।
জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও রিকম্বিনেন্ট DNA
কোনো জীবের DNA থেকে কাঙ্ক্ষিত জিন কেটে আলাদা করে অন্য জীবের DNA-তে স্থাপন করে নতুন বৈশিষ্ট্যের জীব তৈরির কৌশলকে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বলে। দুই উৎসের DNA জোড়া লাগিয়ে যে নতুন DNA তৈরি হয় তাকে রিকম্বিনেন্ট DNA (rDNA) বলে। আর যে জীবে বাইরের জিন বসানো হয়, তাকে ট্রান্সজেনিক জীব বা GMO (Genetically Modified Organism) বলে।
এই কাজে কিছু বিশেষ হাতিয়ার লাগে। রেস্ট্রিকশন এনজাইম হলো আণবিক কাঁচি, যা DNA-র নির্দিষ্ট ক্রমে কাটে; যেমন EcoRI। লাইগেজ এনজাইম হলো আণবিক আঠা, যা কাটা টুকরো জোড়া দেয়। আর ভেক্টর হলো বাহক, যা জিনটিকে নতুন কোষে পৌঁছে দেয়; ব্যাকটেরিয়ার প্লাজমিড সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ভেক্টর।
- প্লাজমিড: ব্যাকটেরিয়ার প্রধান ক্রোমোসোমের বাইরে থাকা ছোট, বৃত্তাকার, দ্বিসূত্রক DNA, যা নিজে নিজে প্রতিলিপি তৈরি করতে পারে।
- উদ্ভিদে জিন প্রবেশে Agrobacterium tumefaciens ব্যাকটেরিয়ার Ti প্লাজমিড বহুল ব্যবহৃত।
রিকম্বিনেন্ট DNA তৈরির ধাপ: ইনসুলিনের উদাহরণ
ডায়াবেটিস রোগীর জন্য দরকারি মানব ইনসুলিন এখন ব্যাকটেরিয়া দিয়েই তৈরি হয়। ১৯৮২ সালে প্রথম এভাবে তৈরি মানব ইনসুলিন অনুমোদন পায়। ধাপগুলো এরকম:
- ১. মানুষের কোষ থেকে ইনসুলিন তৈরির কাঙ্ক্ষিত জিন শনাক্ত করে রেস্ট্রিকশন এনজাইম দিয়ে কেটে আলাদা করা।
- ২. E. coli ব্যাকটেরিয়া থেকে প্লাজমিড বের করে একই রেস্ট্রিকশন এনজাইম দিয়ে কাটা, যাতে মিলে যাওয়ার মতো প্রান্ত (sticky end) তৈরি হয়।
- ৩. লাইগেজ এনজাইম দিয়ে জিনটি প্লাজমিডে জুড়ে রিকম্বিনেন্ট DNA তৈরি।
- ৪. রিকম্বিনেন্ট প্লাজমিড পোষক ব্যাকটেরিয়ায় প্রবেশ করানো (transformation)।
- ৫. ব্যাকটেরিয়া দ্রুত বিভাজিত হয়ে জিনের অসংখ্য কপি তৈরি করে এবং ইনসুলিন উৎপাদন করে; পরে তা আলাদা ও বিশুদ্ধ করা হয়।
কৃষি, চিকিৎসা ও পরিবেশে জীবপ্রযুক্তি
জীবপ্রযুক্তির প্রয়োগ এখন আমাদের খাবারের প্লেট থেকে হাসপাতাল পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে।
- বিটি বেগুন: Bacillus thuringiensis ব্যাকটেরিয়ার Bt জিন বেগুনে বসানো হয়েছে, যা ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা প্রতিরোধী প্রোটিন তৈরি করে। বাংলাদেশ ২০১৩ সালে এর চাষ অনুমোদন দেয়, ফলে কীটনাশকের ব্যবহার কমেছে।
- গোল্ডেন রাইস: বিটা-ক্যারোটিন (ভিটামিন A-এর পূর্বসূরি) সমৃদ্ধ ধান, যার দানা হলুদাভ।
- চিকিৎসা: ইনসুলিন, মানব বৃদ্ধি হরমোন, ইন্টারফেরন, হেপাটাইটিস B-এর টিকা রিকম্বিনেন্ট পদ্ধতিতে তৈরি; জিন থেরাপিতে ত্রুটিপূর্ণ জিনের জায়গায় সুস্থ জিন বসানোর চেষ্টা চলে।
- পরিবেশ: জিন পরিবর্তিত ব্যাকটেরিয়া দিয়ে সমুদ্রে ছড়ানো তেল ভাঙানো ও দূষণ কমানো (bioremediation)।
- শিল্প: এনজাইম, অ্যালকোহল, জৈব জ্বালানি ও অ্যান্টিবায়োটিক উৎপাদন।
DNA টেস্ট ও ফিঙ্গারপ্রিন্টিং
অভিন্ন যমজ ছাড়া প্রত্যেক মানুষের DNA-র ক্রম অনন্য। DNA-র কিছু অংশে বারবার পুনরাবৃত্ত ক্রম থাকে, যার দৈর্ঘ্য মানুষভেদে আলাদা। রেস্ট্রিকশন এনজাইম দিয়ে DNA কেটে জেল ইলেকট্রোফোরেসিসে দৌড় করালে প্রত্যেকের জন্য আলাদা ব্যান্ডের নকশা পাওয়া যায়; একে DNA ফিঙ্গারপ্রিন্টিং বলে। অল্প নমুনা থেকে DNA-র বহু কপি বানাতে PCR (Polymerase Chain Reaction) ব্যবহার করা হয়।
রক্ত, চুলের গোড়া, লালা বা ত্বকের কোষ থেকেই DNA পাওয়া যায়। এই পদ্ধতি অপরাধী শনাক্তকরণ, পিতৃত্ব-মাতৃত্ব নির্ণয়, দুর্ঘটনায় মৃত ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত এবং বংশগত রোগ নির্ণয়ে ব্যবহৃত হয়।
সুবিধার পাশাপাশি সতর্কতা: জীবনিরাপত্তা ও নৈতিকতা
যে কোনো শক্তিশালী প্রযুক্তির মতো জীবপ্রযুক্তিরও সম্ভাব্য ঝুঁকি আছে। জিন পরিবর্তিত ফসলের জিন বুনো আত্মীয় উদ্ভিদে ছড়িয়ে পড়তে পারে, জীববৈচিত্র্যে প্রভাব পড়তে পারে, কিছু মানুষের অ্যালার্জির প্রশ্ন ওঠে। মানুষের জিন নিয়ে কাজের ক্ষেত্রে নৈতিক প্রশ্নও বড়।
তাই প্রতিটি GMO ছাড়ার আগে কঠোর পরীক্ষা ও সরকারি অনুমোদন লাগে। আন্তর্জাতিকভাবে কার্টাহেনা প্রটোকল (জীবনিরাপত্তা চুক্তি) এবং বাংলাদেশে জাতীয় জীবনিরাপত্তা নির্দেশিকা এই বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করে। বিজ্ঞানকে কাজে লাগাতে হবে দায়িত্বের সাথে।
বহুনির্বাচনী প্রশ্ন (MCQ)
১. উদ্ভিদকোষ থেকে পূর্ণাঙ্গ উদ্ভিদ সৃষ্টির ক্ষমতাকে কী বলে?
- ক) ক্যালাস
- খ) টটিপোটেন্সি
- গ) ট্রান্সফরমেশন
- ঘ) ক্লোনিং
উত্তর দেখো
উত্তর: খ) টটিপোটেন্সি — একটি জীবিত উদ্ভিদকোষের পূর্ণ উদ্ভিদ তৈরির সুপ্ত ক্ষমতাকে টটিপোটেন্সি বলে।
২. টিস্যু কালচারে এক্সপ্লান্ট থেকে সৃষ্ট অবিন্যস্ত কোষপিণ্ডকে কী বলে?
- ক) ক্যালাস
- খ) ভেক্টর
- গ) প্লাজমিড
- ঘ) মেরিস্টেম
উত্তর দেখো
উত্তর: ক) ক্যালাস — এক্সপ্লান্টের কোষ বিভাজনে তৈরি অবিন্যস্ত কোষগুচ্ছই ক্যালাস।
৩. DNA কাটার জন্য কোন এনজাইম ব্যবহৃত হয়?
- ক) লাইগেজ
- খ) অ্যামাইলেজ
- গ) রেস্ট্রিকশন এনজাইম
- ঘ) পেপসিন
উত্তর দেখো
উত্তর: গ) রেস্ট্রিকশন এনজাইম — রেস্ট্রিকশন এনজাইম DNA-র নির্দিষ্ট ক্রমে কাটে, তাই একে আণবিক কাঁচি বলা হয়।
৪. কাটা DNA টুকরো জোড়া লাগায় কোন এনজাইম?
- ক) লাইগেজ
- খ) EcoRI
- গ) লাইপেজ
- ঘ) ট্রিপসিন
উত্তর দেখো
উত্তর: ক) লাইগেজ — লাইগেজ এনজাইম DNA খণ্ডের মধ্যে বন্ধন তৈরি করে জোড়া দেয়।
৫. প্লাজমিড সাধারণত কোথায় পাওয়া যায়?
- ক) মানুষের নিউক্লিয়াসে
- খ) ব্যাকটেরিয়ার সাইটোপ্লাজমে
- গ) উদ্ভিদের কোষপ্রাচীরে
- ঘ) ভাইরাসের আবরণে
উত্তর দেখো
উত্তর: খ) ব্যাকটেরিয়ার সাইটোপ্লাজমে — প্লাজমিড ব্যাকটেরিয়ার প্রধান ক্রোমোসোমের বাইরে সাইটোপ্লাজমে থাকা ছোট বৃত্তাকার DNA।
৬. বিটি বেগুনে কোন জীবের জিন স্থাপন করা হয়েছে?
- ক) Escherichia coli
- খ) Agrobacterium tumefaciens
- গ) Bacillus thuringiensis
- ঘ) Saccharomyces cerevisiae
উত্তর দেখো
উত্তর: গ) Bacillus thuringiensis — Bt নামটি এসেছে Bacillus thuringiensis থেকে; এর জিন পোকা প্রতিরোধী প্রোটিন তৈরি করে।
৭. টিস্যু কালচারে কাণ্ড সৃষ্টিতে কোন হরমোন বেশি দিলে উৎসাহ পায়?
- ক) অক্সিন
- খ) সাইটোকাইনিন
- গ) ইথিলিন
- ঘ) অ্যাবসিসিক অ্যাসিড
উত্তর দেখো
উত্তর: খ) সাইটোকাইনিন — সাইটোকাইনিনের অনুপাত বেশি হলে কাণ্ড, আর অক্সিন বেশি হলে মূল সৃষ্টি উৎসাহিত হয়।
৮. অল্প নমুনা থেকে DNA-র অসংখ্য কপি তৈরির পদ্ধতি কোনটি?
- ক) PCR
- খ) অটোক্লেভ
- গ) ক্যালাস কালচার
- ঘ) হাইব্রিডাইজেশন
উত্তর দেখো
উত্তর: ক) PCR — PCR বা Polymerase Chain Reaction দিয়ে নির্দিষ্ট DNA অংশের বহু কপি তৈরি করা যায়।
সৃজনশীল প্রশ্ন
উদ্দীপক: রহিম সাহেবের কলাবাগানে ভাইরাস রোগ ছড়িয়ে পড়ায় ফলন কমে গেছে। কৃষি কর্মকর্তা তাঁকে একটি গবেষণাগার থেকে চারা আনতে বললেন, যেখানে একটি রোগমুক্ত কলাগাছের কাণ্ডের অগ্রভাগ জীবাণুমুক্ত পুষ্টি মাধ্যমে রেখে হাজারো একই রকম চারা তৈরি করা হয়।
- ক) এক্সপ্লান্ট কী?
- খ) টিস্যু কালচারে মাধ্যম জীবাণুমুক্ত রাখা জরুরি কেন? ব্যাখ্যা করো।
- গ) উদ্দীপকে উল্লিখিত পদ্ধতির ধাপগুলো বর্ণনা করো।
- ঘ) রহিম সাহেবের সমস্যা সমাধানে পদ্ধতিটি কতটা কার্যকর? বিশ্লেষণ করো।
উত্তর দেখো
- টিস্যু কালচারের জন্য উদ্ভিদের যে অঙ্গ বা টিস্যুর ছোট অংশ কেটে নেওয়া হয় তাকে এক্সপ্লান্ট বলে।
- পুষ্টি মাধ্যমে চিনি ও খনিজ থাকায় ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া সেখানে উদ্ভিদকোষের চেয়ে অনেক দ্রুত বাড়ে। মাধ্যম দূষিত হলে জীবাণু পুষ্টি দখল করে এক্সপ্লান্টকে নষ্ট করে দেয়, তাই অটোক্লেভ ও লেমিনার এয়ার ফ্লো দিয়ে জীবাণুমুক্ত রাখা হয়।
- পদ্ধতিটি টিস্যু কালচার। ধাপ: রোগমুক্ত মাতৃগাছ নির্বাচন; MS মাধ্যম তৈরি করে অটোক্লেভে জীবাণুমুক্ত করা; কাণ্ডের অগ্রভাগ জীবাণুমুক্ত করে মাধ্যমে স্থাপন; ক্যালাস সৃষ্টি; হরমোনের অনুপাত বদলে কাণ্ড ও মূল সৃষ্টি; শেষে চারা ধীরে ধীরে বাইরের পরিবেশে খাপ খাইয়ে মাটিতে রোপণ।
- খুবই কার্যকর। কাণ্ডের অগ্রভাগের ভাজক টিস্যুতে সাধারণত ভাইরাস কম বা থাকে না, তাই এখান থেকে ভাইরাসমুক্ত চারা পাওয়া যায়। প্রতিটি চারা রোগমুক্ত মাতৃগাছের ক্লোন বলে ফলন ও গুণ একই থাকবে। কলার বীজ থেকে চারা হয় না, তাই অল্প সময়ে বিপুল চারা পেতে এটিই সেরা উপায়। তবে বাগানের মাটিতে রোগের উৎস থেকে গেলে নতুন চারাও আক্রান্ত হতে পারে, তাই আক্রান্ত গাছ সরিয়ে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে।
উদ্দীপক: নাসরিনের বাবা ডায়াবেটিস রোগী, নিয়মিত ইনসুলিন নেন। নাসরিন পড়ল, আগে গরু-শূকরের অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন আনা হতো, কিন্তু এখন একটি ব্যাকটেরিয়ার ভেতরে মানুষের জিন বসিয়ে মানব ইনসুলিন তৈরি হয়। একই পদ্ধতিতে পোকা প্রতিরোধী একটি সবজিও বাংলাদেশে চাষ হচ্ছে।
- ক) রিকম্বিনেন্ট DNA কী?
- খ) প্লাজমিডকে আদর্শ ভেক্টর বলা হয় কেন?
- গ) উদ্দীপকের ইনসুলিন উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করো।
- ঘ) উদ্দীপকে উল্লিখিত প্রযুক্তি মানবকল্যাণে কতটা ভূমিকা রাখে? মূল্যায়ন করো।
উত্তর দেখো
- দুটি ভিন্ন উৎসের DNA জোড়া লাগিয়ে তৈরি নতুন DNA অণুকে রিকম্বিনেন্ট DNA বলে।
- প্লাজমিড ছোট ও বৃত্তাকার, তাই সহজে আলাদা করা ও কোষে প্রবেশ করানো যায়; এটি নিজে প্রতিলিপি তৈরি করতে পারে, ফলে বসানো জিনেরও বহু কপি হয়; রেস্ট্রিকশন এনজাইমে কাটার নির্দিষ্ট স্থান থাকে। এসব কারণে একে আদর্শ ভেক্টর বলা হয়।
- এটি জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং। মানুষের কোষ থেকে ইনসুলিনের জিন রেস্ট্রিকশন এনজাইম দিয়ে কাটা হয়; E. coli-র প্লাজমিড একই এনজাইমে কেটে লাইগেজ দিয়ে জিনটি জোড়া দিয়ে রিকম্বিনেন্ট DNA বানানো হয়; এটি ব্যাকটেরিয়ায় প্রবেশ করানো হয়; ব্যাকটেরিয়া বিভাজিত হয়ে ইনসুলিন তৈরি করে, যা পরে বিশুদ্ধ করা হয়।
- ভূমিকা ব্যাপক। চিকিৎসায় প্রাণিজ ইনসুলিনের চেয়ে মানব ইনসুলিনে অ্যালার্জির ঝুঁকি কম, এবং ব্যাকটেরিয়া দ্রুত বাড়ে বলে কম খরচে প্রচুর উৎপাদন সম্ভব; গ্রোথ হরমোন ও টিকাও একইভাবে তৈরি হয়। কৃষিতে বিটি বেগুনের মতো ফসল কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে কৃষকের খরচ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি কমায়। তবে জিন ছড়িয়ে পড়া ও জীববৈচিত্র্যের ঝুঁকি থাকায় জীবনিরাপত্তা নীতি মেনে ব্যবহার করলে এ প্রযুক্তি মানবকল্যাণে অত্যন্ত ইতিবাচক।
বাস্তব জীবনে মজার যোগসূত্র
তুমি যে কলা খাও, খুব সম্ভব তার বাগানের চারা কোনো গবেষণাগারের কাচের বোতলে জন্মেছিল, আর সেই বোতলের হাজারো চারা আসলে একটিমাত্র গাছের যমজ ভাই! আবার পৃথিবীর লাখো ডায়াবেটিস রোগী প্রতিদিন যে ইনসুলিন নেন, সেটি বানাচ্ছে চোখে দেখা যায় না এমন ব্যাকটেরিয়া, যার ভেতরে বসানো আছে মানুষেরই একটি জিন।
প্রশ্ন ও উত্তর
জীবপ্রযুক্তি আর জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং কি একই জিনিস?
না। জীবপ্রযুক্তি বড় ছাতা, যার মধ্যে দই তৈরি থেকে টিস্যু কালচার সব পড়ে। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং তার একটি শাখা, যেখানে সরাসরি জিন কেটে অন্য জীবে বসানো হয়।
টিস্যু কালচারের চারা কি বীজের চারার চেয়ে ভালো?
টিস্যু কালচারের চারা মাতৃগাছের হুবহু ক্লোন, তাই গুণ একই থাকে এবং ভাইরাসমুক্ত করা যায়। তবে সব চারা একই রকম বলে জিনগত বৈচিত্র্য কম, যা কোনো নতুন রোগ এলে ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
GMO খাবার কি খাওয়া নিরাপদ?
বাজারে আসার আগে প্রতিটি অনুমোদিত GMO ফসল নিরাপত্তা পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে অনুমোদিত GM খাবার মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবে প্রতিটি নতুন ফসল আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি।
DNA টেস্টে কি একটা চুল থেকেই মানুষ চেনা যায়?
চুলের গোড়ায় (ফলিকল) কোষ থাকলে তা থেকে DNA পাওয়া যায়, আর PCR দিয়ে সেটির বহু কপি বানিয়ে পরীক্ষা করা সম্ভব। গোড়াবিহীন শুধু চুলের শ্যাফটে নিউক্লিয়ার DNA খুব কম থাকে।
পরীক্ষায় এই অধ্যায় থেকে কী বেশি আসে?
টিস্যু কালচারের ধাপ ও সুবিধা, রিকম্বিনেন্ট DNA তৈরির ধাপ, রেস্ট্রিকশন এনজাইম, লাইগেজ ও প্লাজমিডের ভূমিকা, বিটি বেগুন ও ইনসুলিনের উদাহরণ এবং DNA টেস্টের ব্যবহার।
আরও পড়ো
সূত্র: NCTB জীববিজ্ঞান, নবম-দশম শ্রেণি (জীবপ্রযুক্তি অধ্যায়) · WHO — Food, genetically modified (Q&A) · National Human Genome Research Institute — Biotechnology & Recombinant DNA