জগদীশ চন্দ্র বসু কী আবিষ্কার করেন? রেডিও থেকে গাছের প্রাণ
· পড়তে ৮ মিনিট · ✓ তথ্য যাচাই করা
ছোট উত্তর · ১০ সেকেন্ডে
জগদীশ চন্দ্র বসু দুটি বড় কাজের জন্য বিখ্যাত। ১৮৯০-এর দশকে তিনি খুব ছোট দৈর্ঘ্যের অদৃশ্য রেডিও তরঙ্গ (আজকের মাইক্রোওয়েভ) তৈরি ও ধরার যন্ত্র বানান। পরে ক্রেস্কোগ্রাফের মতো সূক্ষ্ম যন্ত্র দিয়ে দেখান, গাছও তাপ, আঘাত বা বিষে বৈদ্যুতিক সাড়া দেয়, ঠিক প্রাণীর মতো।
একটা লজ্জাবতী পাতায় আঙুল ছোঁয়ালেই পাতাগুলো গুটিয়ে যায়। কিন্তু আমগাছ বা লাউগাছ কি কিছু ‘টের পায়’? একশো বছরেরও বেশি আগে বিক্রমপুরের এক বাঙালি বিজ্ঞানী এই প্রশ্নের পেছনে ছুটেছিলেন, আর তার আগে তিনি এমন অদৃশ্য তরঙ্গ নিয়ে খেলেছিলেন যা আজ আপনার মোবাইল আর ওয়াইফাইয়ের আত্মীয়। তাহলে জগদীশ চন্দ্র বসু কি আবিষ্কার করেন, সত্যি করে? পাঠ্যবইয়ে এক লাইনে যা পড়েছি, আসল গল্পটা তার চেয়ে অনেক মজার। চলুন, খুলে দেখি।
সংক্ষেপে: জগদীশ চন্দ্র বসু কি আবিষ্কার করেন
এক কথায় বললে, জগদীশ চন্দ্র বসুর আবিষ্কার দুই ভাগে পড়ে। প্রথম ভাগ পদার্থবিজ্ঞান: তিনি মিলিমিটার আকারের খুব ছোট রেডিও তরঙ্গ তৈরি করেন, সেগুলো ধরার যন্ত্র বানান, আর দেখান এই তরঙ্গ আলোর মতোই প্রতিফলিত ও প্রতিসরিত হয়। এই তরঙ্গকেই আজ আমরা মাইক্রোওয়েভ বলি। দ্বিতীয় ভাগ উদ্ভিদবিজ্ঞান: তিনি এমন সূক্ষ্ম যন্ত্র বানান যা গাছের অতি ধীর বৃদ্ধি আর তাপ, ঠান্ডা, আঘাত বা বিষে গাছের বৈদ্যুতিক সাড়া মাপতে পারে।
১৮৫৮
জন্ম
৩০ নভেম্বর
১৮৮৫
প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপনা শুরু
১৮৯৫
কলকাতায় অদৃশ্য তরঙ্গের প্রদর্শনী
১৯০৪
যুক্তরাষ্ট্রে ডিটেক্টরের পেটেন্ট
১৯১৭
বসু বিজ্ঞান মন্দির প্রতিষ্ঠা
১৯২০
রয়্যাল সোসাইটির ফেলো
১৯৩৭
মৃত্যু
২৩ নভেম্বর
বিক্রমপুরের ছেলে (মুন্সীগঞ্জ, ১৮৫৮)
জগদীশ চন্দ্র বসুর জন্ম ১৮৫৮ সালের ৩০ নভেম্বর। বাবা ভগবান চন্দ্র বসু তখন সরকারি চাকরিতে ময়মনসিংহে ছিলেন, তাই জন্মটা সেখানেই। কিন্তু পরিবারের আদি বাড়ি বিক্রমপুরের রাড়িখাল গ্রামে, আজকের মুন্সীগঞ্জ জেলার শ্রীনগরে। এই কারণেই তাঁকে আদর করে বলা হয় বিক্রমপুরের বিজ্ঞানী। রাড়িখালে আজও তাঁর নামে একটি স্কুল-কলেজ আর স্মৃতি কমপ্লেক্সে একটি ছোট জাদুঘর আছে।
মজার ব্যাপার, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা হয়েও বাবা ছেলেকে ইংরেজি স্কুলে না দিয়ে গ্রামের বাংলা পাঠশালায় পাঠান। সেখানে কৃষক আর জেলের ছেলেদের পাশে বসে তিনি শিখেছিলেন মাটি, গাছ, পোকামাকড় আর নদীর গল্প। পরে বসু নিজেই বলেছেন, প্রকৃতির প্রতি টান সেখান থেকেই। এরপর কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স, তারপর ইংল্যান্ডের কেমব্রিজে পড়াশোনা। ফিরে এসে ১৮৮৫ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে পদার্থবিজ্ঞান পড়াতে শুরু করেন।
জানেন কি?ট্যাপ করে দেখুন
প্রেসিডেন্সি কলেজে শুরুতে ভারতীয় হওয়ায় তাঁকে ইংরেজ অধ্যাপকদের চেয়ে কম বেতন দেওয়া হচ্ছিল। প্রতিবাদে তিনি প্রায় তিন বছর বেতন নিতেই অস্বীকার করেন। শেষে কলেজ পুরো বেতন বকেয়াসহ দিতে বাধ্য হয়।
অদৃশ্য তরঙ্গের পরীক্ষা (১৮৯৫) ও পেটেন্ট না নেওয়া
১৮৮০-এর দশকে জার্মান বিজ্ঞানী হাইনরিখ হার্ৎস প্রমাণ করেন যে চোখে দেখা যায় না এমন বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ সত্যিই আছে। আলোও আসলে এই পরিবারেরই সদস্য — শুধু দৈর্ঘ্যে আলাদা। আকাশ কেন নীল, সেটাও আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের খেলা; পড়ে দেখতে পারেন [আকাশ নীল কেন](/facts/why-sky-blue)। বসু ভাবলেন, যদি তরঙ্গ অনেক ছোট করা যায়, তাহলে ছোট্ট টেবিলের ওপরেই আলোর সব পরীক্ষা এই অদৃশ্য তরঙ্গ দিয়ে করে দেখানো যাবে।
তিনি তাই করলেন। তাঁর যন্ত্র কয়েক মিলিমিটার থেকে কয়েক সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্যের তরঙ্গ তৈরি করত, যা আজকের হিসাবে মাইক্রোওয়েভ বা মিলিমিটার তরঙ্গ। এগুলো ধরার জন্য তিনি নিজেই নানা রকম ডিটেক্টর বানান, সাথে বানান তরঙ্গ ঘোরানোর ও বাঁকানোর জন্য লেন্স, পোলারাইজার আর ‘হর্ন অ্যান্টেনা’র মতো জিনিস। ১৮৯৫ সালে কলকাতায় এক প্রদর্শনীতে তিনি এই তরঙ্গ একাধিক দেয়াল পেরিয়ে প্রায় ২৩ মিটার দূরে পাঠিয়ে একটা ঘণ্টা বাজান আর বারুদের ছোট বিস্ফোরণ ঘটান। দর্শকদের কাছে সেটা ছিল প্রায় জাদু।
পেটেন্ট নিয়ে আসল গল্প
প্রায়ই শোনা যায়, বসু কখনো পেটেন্ট নেননি। কথাটা পুরোপুরি ঠিক নয়। তিনি জ্ঞানকে সবার সম্পদ মনে করতেন, তাই নিজের বেশিরভাগ আবিষ্কারের পেটেন্ট করতে চাননি, ব্যবসাও করেননি। তবে বন্ধুদের চাপে ১৯০৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে একটি পেটেন্ট নেওয়া হয় — গ্যালেনা নামের খনিজ-স্ফটিক দিয়ে বানানো তরঙ্গ ধরার যন্ত্রের জন্য। এটিকে অর্ধপরিবাহী (সেমিকন্ডাক্টর) দিয়ে তরঙ্গ ধরার প্রথম দিকের উদাহরণ হিসেবে ধরা হয় — আজকের কম্পিউটার চিপের অনেক দূরের পূর্বপুরুষ।
জানেন কি?ট্যাপ করে দেখুন
২০১২ সালে প্রকৌশলীদের বিশ্বের বড় সংগঠন IEEE তাঁর মিলিমিটার তরঙ্গের কাজকে ‘মাইলস্টোন’ বা ইতিহাসের মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, কলকাতায় তার ফলক বসানো আছে।
ক্রেস্কোগ্রাফ: গাছের বৃদ্ধি মাপা
১৯০০ সালের দিকে বসু ধাতুর ওপর তরঙ্গের প্রভাব নিয়ে কাজ করতে গিয়ে খেয়াল করলেন, ধাতুর ‘ক্লান্তি’র মতো আচরণ জীবন্ত টিস্যুর সাড়ার সাথে মেলে। এখান থেকেই তাঁর মনোযোগ ঘুরে গেল গাছের দিকে। কিন্তু সমস্যা হলো, গাছ এত ধীরে বাড়ে যে খালি চোখে এক মিনিটে কিছুই বোঝা যায় না। এর সমাধান তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত যন্ত্র — ক্রেস্কোগ্রাফ (লাতিন ‘ক্রেস্কো’ মানে ‘আমি বাড়ি’)।
- 🌱গাছের ডগায় সুতো বাঁধা
- ⚙️লিভারে নড়াচড়া হাজার গুণ বড়
- ⏱️ঘড়ির তালে কাঁচে দাগ পড়ে
- 📈দাগের ফাঁক = বৃদ্ধির হার
↺ আবার প্রথম ধাপে ফিরে যায়
ক্রেস্কোগ্রাফে গাছের ডগার সাথে কয়েকটা সূক্ষ্ম লিভার জুড়ে দেওয়া হতো। প্রতিটা লিভার নড়াচড়াকে কয়েক গুণ বাড়ায়, সব মিলিয়ে বৃদ্ধি প্রায় দশ হাজার গুণ বড় হয়ে (পরের উন্নত সংস্করণে আরও বহু গুণ) ধোঁয়ামাখা কাঁচের প্লেটে দাগ হিসেবে পড়ত। ঘড়ির তালে নির্দিষ্ট সময় পরপর দাগ পড়ত, তাই দাগের দূরত্ব দেখে বোঝা যেত গাছ কত দ্রুত বাড়ছে। এরপর গাছে সার, তাপ, ঠান্ডা, বিদ্যুৎ বা বিষ দিলে কয়েক মিনিটেই দেখা যেত বৃদ্ধি বাড়ছে, কমছে নাকি থেমে যাচ্ছে।
ক্রেস্কোগ্রাফ ছাড়াও তিনি গাছের ভেতরের ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিক সংকেত মাপার যন্ত্র বানান। ভাবুন তো, যে মানুষ যন্ত্র দিয়ে অদৃশ্য তরঙ্গ ধরেছেন, তিনিই আবার অদৃশ্য বৃদ্ধি মাপছেন। দুটো কাজের মূল সূত্র একই: যা চোখে পড়ে না, তা মাপার উপায় বের করা। চোখের সীমা ভাঙার আরেক গল্প পাবেন [টেলিস্কোপের ইতিহাসে](/telescope/02-history)।
‘গাছের প্রাণ আছে’ — আসলে কী প্রমাণ করেছিলেন
পাঠ্যবইয়ে প্রায়ই লেখা থাকে, ‘জগদীশ চন্দ্র বসু প্রমাণ করেন গাছের প্রাণ আছে।’ কিন্তু গাছ যে জীবন্ত, সেটা মানুষ হাজার বছর ধরেই জানত — গাছ জন্মায়, বাড়ে, মরে যায়। বসুর আসল কৃতিত্ব আরও সূক্ষ্ম। তিনি দেখান যে উদ্ভিদও উদ্দীপনায় সাড়া দেয়, আর সেই সাড়া বৈদ্যুতিক সংকেতের মাধ্যমে ছড়ায়, যা অনেকটা প্রাণীর স্নায়ু আর পেশির সাড়ার মতো।
- আঘাত বা গরম পানির ছোঁয়ায় গাছের টিস্যুতে বৈদ্যুতিক পরিবর্তন দেখা যায়।
- বারবার উদ্দীপনা দিলে সাড়া দুর্বল হয়, অনেকটা ক্লান্ত পেশির মতো।
- ক্লোরোফর্ম বা বিষে গাছের সাড়া কমে বা থেমে যায়, আবার কিছু ক্ষেত্রে ফিরেও আসে।
- লজ্জাবতীর মতো গাছে সংকেত পাতার এক অংশ থেকে আরেক অংশে ছড়িয়ে যায়।
সেই সময় অনেক ইউরোপীয় বিজ্ঞানী এ কথা মানতে চাননি। তবে কিছু ব্যাখ্যা, যেমন গাছের ‘অনুভূতি’ বা ‘স্মৃতি’ নিয়ে তাঁর কাব্যিক কথাগুলো আজকের বিজ্ঞানীরা হুবহু মানেন না — গাছের মস্তিষ্ক বা স্নায়ু নেই। কিন্তু গাছের ভেতরে বৈদ্যুতিক সংকেত চলে, এটা এখন আধুনিক উদ্ভিদবিজ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত সত্য। আজকের বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, পোকা পাতা কামড়ালে গাছের ভেতর দিয়ে সংকেত দ্রুত ছড়িয়ে অন্য পাতায় প্রতিরক্ষা চালু করে। বসু সেই পথের অনেক আগের পথিক।
বসু বিজ্ঞান মন্দির ও উত্তরাধিকার
১৯১৭ সালের ৩০ নভেম্বর, নিজের জন্মদিনে, তিনি কলকাতায় প্রতিষ্ঠা করেন বসু বিজ্ঞান মন্দির (বোস ইনস্টিটিউট)। নিজের সঞ্চয়ের বড় অংশ তিনি এতে দান করেন। এটি এশিয়ার প্রথম দিকের আধুনিক গবেষণাকেন্দ্রগুলোর একটি, আর আজও সেখানে উদ্ভিদবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান ও পদার্থবিজ্ঞানে গবেষণা চলে। এর আগের বছর, ১৯১৬ সালে তিনি ব্রিটিশ সরকারের ‘নাইট’ উপাধি পান, আর ১৯২০ সালে লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হন। ১৯৩৭ সালের ২৩ নভেম্বর তিনি মারা যান।
তাঁর বড় উত্তরাধিকার শুধু যন্ত্র নয়, একটা মনোভাব: বাংলায় বসেও বিশ্বমানের বিজ্ঞান করা যায়, আর কৌতূহল কোনো এক বিষয়ে আটকে থাকে না। বন্ধু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে নিয়ে কবিতাও লিখেছিলেন। আজ মুন্সীগঞ্জের রাড়িখালে তাঁর স্মৃতি কমপ্লেক্সে গেলে বোঝা যায়, এক গ্রামের পাঠশালার ছেলে কীভাবে পুরো বিশ্বের বিজ্ঞানে নাম লিখিয়েছিল। জগদীশ চন্দ্র বসু কি আবিষ্কার করেন — এই প্রশ্নের সবচেয়ে বড় উত্তর হয়তো এটাই: তিনি দেখিয়েছিলেন, অদৃশ্যকেও মাপা যায়।
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
জগদীশ চন্দ্র বসুর আবিষ্কার নিয়ে সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নগুলো আসে, তার উত্তর নিচে দেওয়া হলো।
নিজে দেখুন
নিজে দেখো: একটা লজ্জাবতী গাছের পাতায় আলতো করে একটা পাতার ডগা ছুঁয়ে দাও, তারপর ঘড়ি ধরে দেখো সাড়াটা কত দূর আর কত দ্রুত ছড়ায়, আবার খুলতে কত মিনিট লাগে। এরপর একটা পাতার পাতলা টুকরো মাইক্রোস্কোপে দেখো — ছোট ছোট কোষগুলোই সেই সাড়ার আসল কারিগর।
ছোট্ট যাচাই
কতটা মনে আছে, দেখে নিন
১. কম বেতনের প্রতিবাদে প্রেসিডেন্সি কলেজে বসু কী করেছিলেন?
২. বসুর সূক্ষ্ম যন্ত্র গাছ সম্পর্কে কী দেখিয়েছিল?
তথ্যসূত্র
- ১Encyclopaedia Britannica — Sir Jagadish Chandra Bose britannica.com ↗
- ২IEEE / ETHW — Milestones: First Millimeter-wave Communication Experiments by J.C. Bose, 1894-96 ethw.org ↗
- ৩Bose Institute — History jcbose.ac.in ↗
- ৪Bose (lunar crater) — far side, named for J.C. Bose en.wikipedia.org ↗
- ৫US Patent 755,840 — Detector for electrical disturbances (J.C. Bose, 1904) patents.google.com ↗
- ৬Banglapedia — Bose, Sir Jagadish Chandra en.banglapedia.org ↗
- ৭Dhaka Tribune — A journey to Rarikhal: JC Bose Complex dhakatribune.com ↗
কৃতজ্ঞতা
- তথ্য যাচাই: ২৫ অক্টোবর, ২০২৬