এসএসসি পদার্থবিজ্ঞান · অধ্যায় ৮
আলোর প্রতিফলন
এক কথায়
আলো কোনো মসৃণ তলে বাধা পেয়ে আগের মাধ্যমে ফিরে আসাকে প্রতিফলন বলে। প্রতিফলনের দুটি সূত্র: আপতন কোণ সমান প্রতিফলন কোণ, এবং আপতিত রশ্মি, প্রতিফলিত রশ্মি ও অভিলম্ব একই সমতলে থাকে। গোলীয় দর্পণে ফোকাস দূরত্ব f = r/2 এবং দর্পণের সূত্র 1/u + 1/v = 1/f।
আলো আর প্রতিফলন: আমরা দেখি কীভাবে
আলো এক ধরনের শক্তি, যা আমাদের চোখে দর্শনের অনুভূতি জাগায়। শূন্য মাধ্যমে আলোর বেগ প্রায় 3 × 10^8 m/s, আর সমসত্ত্ব মাধ্যমে আলো সরলরেখায় চলে। এই সরলরেখায় চলার কারণেই ছায়া তৈরি হয়।
আমরা যে টেবিল, বই বা মানুষের মুখ দেখি, সেগুলো নিজে আলো তৈরি করে না। সূর্য বা বাতির আলো তাদের গায়ে পড়ে চারদিকে প্রতিফলিত হয়, সেই আলো চোখে এলে আমরা বস্তুটি দেখি। তাই প্রতিফলন না থাকলে চারপাশের বেশির ভাগ জিনিসই আমাদের কাছে অদৃশ্য থাকত।
- আলোক রশ্মি: আলো যে সরলরেখা বরাবর চলে, তাকে তীর চিহ্ন দিয়ে আঁকা হয়।
- আলোক রশ্মিগুচ্ছ: সমান্তরাল, অভিসারী বা অপসারী হতে পারে।
- দীপ্ত বস্তু নিজে আলো দেয় (সূর্য, জ্বলন্ত মোমবাতি); অদীপ্ত বস্তু প্রতিফলিত আলোয় দৃশ্যমান হয় (চাঁদ, বই)।
প্রতিফলনের সূত্র
আলো যখন কোনো তলে পড়ে, তখন আপতন বিন্দুতে তলের ওপর লম্ব রেখাকে অভিলম্ব বলে। আপতিত রশ্মি অভিলম্বের সাথে যে কোণ করে তা আপতন কোণ (i), আর প্রতিফলিত রশ্মি অভিলম্বের সাথে যে কোণ করে তা প্রতিফলন কোণ (r)।
যত মসৃণ বা খসখসে তলই হোক, প্রতিটি রশ্মির ক্ষেত্রে প্রতিফলন নিচের দুটি সূত্র মেনে চলে। লম্বভাবে পড়লে i = 0°, তাই r = 0°, রশ্মি একই পথে ফিরে আসে।
- প্রথম সূত্র: আপতিত রশ্মি, প্রতিফলিত রশ্মি এবং আপতন বিন্দুতে প্রতিফলকের ওপর অঙ্কিত অভিলম্ব একই সমতলে থাকে।
- দ্বিতীয় সূত্র: আপতন কোণ ও প্রতিফলন কোণ সমান।
i = r
নিয়মিত ও ব্যাপ্ত প্রতিফলন
আয়না বা শান্ত পানির মতো খুব মসৃণ তলে একগুচ্ছ সমান্তরাল রশ্মি পড়লে প্রতিফলিত রশ্মিগুলোও সমান্তরাল থাকে। একে নিয়মিত প্রতিফলন বলে, আর এতেই পরিষ্কার প্রতিবিম্ব দেখা যায়।
কাগজ, দেয়াল বা কাপড়ের মতো অমসৃণ তলে প্রতিটি বিন্দুতে অভিলম্বের দিক আলাদা। তাই প্রতিটি রশ্মি সূত্র মেনেও ভিন্ন ভিন্ন দিকে ছড়িয়ে যায়। একে ব্যাপ্ত বা বিক্ষিপ্ত প্রতিফলন বলে। এর কারণেই ঘরের সব দিক থেকে বইয়ের পাতা পড়া যায় এবং দিনের বেলা ছায়ার জায়গাও পুরো অন্ধকার থাকে না।
দর্পণ ও প্রতিবিম্ব: সদ বনাম অসদ
যে মসৃণ তলে আলোর নিয়মিত প্রতিফলন ঘটে, তাকে দর্পণ বলে। সাধারণ দর্পণ হলো কাচের এক পিঠে ধাতুর পাতলা প্রলেপ দেওয়া, যেটি প্রতিফলক হিসেবে কাজ করে।
কোনো বিন্দু থেকে আসা রশ্মিগুলো প্রতিফলনের পর যদি সত্যিই কোনো বিন্দুতে মিলিত হয়, তবে সেখানে সদ বিম্ব তৈরি হয়; একে পর্দায় ফেলা যায়। আর যদি রশ্মিগুলো মিলিত না হয়ে শুধু কোনো বিন্দু থেকে আসছে বলে মনে হয়, তবে সেটি অসদ বিম্ব; একে পর্দায় ফেলা যায় না।
- সদ বিম্ব: প্রকৃত মিলন, পর্দায় ধরা যায়, সাধারণত উল্টো।
- অসদ বিম্ব: আপাত মিলন, পর্দায় ধরা যায় না, সাধারণত সোজা।
সমতল দর্পণে প্রতিবিম্ব
সমতল দর্পণে প্রতিবিম্ব সব সময় অসদ ও সোজা হয় এবং বস্তুর সমান আকারের হয়। দর্পণ থেকে বস্তু যত দূরে, প্রতিবিম্বও দর্পণের পেছনে ঠিক তত দূরে মনে হয়।
আয়নায় ডান হাত তুললে প্রতিবিম্ব যেন বাম হাত তোলে, একে পার্শ্বীয় পরিবর্তন বলে। এজন্যই অ্যাম্বুলেন্সের সামনে লেখা উল্টো করে লেখা থাকে, যাতে সামনের গাড়ির চালক রিয়ার-ভিউ আয়নায় সোজা পড়তে পারেন।
- বিম্ব অসদ ও সোজা।
- বিম্বের আকার বস্তুর সমান (বিবর্ধন 1)।
- দর্পণ থেকে বস্তুর দূরত্ব = দর্পণ থেকে বিম্বের দূরত্ব।
- পার্শ্বীয় পরিবর্তন ঘটে।
- নিজের পুরো দেহ দেখতে আয়নার দৈর্ঘ্য অন্তত নিজের উচ্চতার অর্ধেক লাগে।
গোলীয় দর্পণ: অবতল ও উত্তল
ফাঁপা গোলকের একটি অংশ দিয়ে তৈরি দর্পণকে গোলীয় দর্পণ বলে। ভেতরের বাঁকানো পিঠ প্রতিফলক হলে তা অবতল দর্পণ, বাইরের ফোলা পিঠ প্রতিফলক হলে তা উত্তল দর্পণ।
অবতল দর্পণ সমান্তরাল রশ্মিকে একটি বিন্দুতে মিলিত করে, তাই একে অভিসারী দর্পণ বলে। উত্তল দর্পণ সমান্তরাল রশ্মিকে ছড়িয়ে দেয়, তাই একে অপসারী দর্পণ বলে।
- মেরু (P): দর্পণের প্রতিফলক তলের মধ্যবিন্দু।
- বক্রতার কেন্দ্র (C): যে গোলকের অংশ দর্পণ, তার কেন্দ্র।
- বক্রতার ব্যাসার্ধ (r): মেরু থেকে বক্রতার কেন্দ্রের দূরত্ব।
- প্রধান অক্ষ: মেরু ও বক্রতার কেন্দ্র দিয়ে যাওয়া সরলরেখা।
- প্রধান ফোকাস (F): প্রধান অক্ষের সমান্তরাল রশ্মি প্রতিফলনের পর যে বিন্দুতে মিলিত হয় (অবতল) বা যে বিন্দু থেকে অপসৃত হচ্ছে বলে মনে হয় (উত্তল)।
- ফোকাস দূরত্ব (f): মেরু থেকে প্রধান ফোকাসের দূরত্ব, যা বক্রতার ব্যাসার্ধের অর্ধেক।
f = r/2
অবতল ও উত্তল দর্পণে বিম্ব গঠন
বিম্ব আঁকতে যেকোনো দুটি বিশেষ রশ্মি যথেষ্ট: প্রধান অক্ষের সমান্তরাল রশ্মি প্রতিফলনের পর ফোকাস দিয়ে যায় (বা ফোকাস থেকে আসছে মনে হয়); ফোকাস দিয়ে আসা রশ্মি প্রতিফলনের পর অক্ষের সমান্তরাল হয়; বক্রতার কেন্দ্র দিয়ে আসা রশ্মি একই পথে ফিরে আসে।
উত্তল দর্পণে বস্তু যেখানেই থাকুক, বিম্ব সব সময় অসদ, সোজা, খর্বিত এবং দর্পণের পেছনে মেরু ও ফোকাসের মাঝে তৈরি হয়। অবতল দর্পণে বিম্বের ধরন বস্তুর অবস্থানের ওপর নির্ভর করে:
- বস্তু অসীমে: বিম্ব F-এ, সদ, উল্টো, অত্যন্ত খর্বিত।
- বস্তু C-এর বাইরে: বিম্ব C ও F-এর মাঝে, সদ, উল্টো, খর্বিত।
- বস্তু C-তে: বিম্ব C-তে, সদ, উল্টো, সমান আকার।
- বস্তু C ও F-এর মাঝে: বিম্ব C-এর বাইরে, সদ, উল্টো, বিবর্ধিত।
- বস্তু F-এ: বিম্ব অসীমে, সদ, উল্টো, অত্যন্ত বিবর্ধিত।
- বস্তু F ও P-এর মাঝে: বিম্ব দর্পণের পেছনে, অসদ, সোজা, বিবর্ধিত।
দর্পণের সূত্র ও বিবর্ধন
মেরু থেকে বস্তুর দূরত্ব u, বিম্বের দূরত্ব v এবং ফোকাস দূরত্ব f হলে গোলীয় দর্পণের সূত্র নিচের মতো। পাঠ্যবইয়ের চিহ্ন প্রথা অনুযায়ী সদ বস্তু ও সদ বিম্বের দূরত্ব ধনাত্মক, অসদ বিম্বের দূরত্ব ঋণাত্মক; অবতল দর্পণের f ধনাত্মক, উত্তল দর্পণের f ঋণাত্মক।
বিম্বের দৈর্ঘ্য ও বস্তুর দৈর্ঘ্যের অনুপাতকে বিবর্ধন (m) বলে। এর কোনো একক নেই। m > 1 হলে বিম্ব বিবর্ধিত, m < 1 হলে খর্বিত, m = 1 হলে সমান আকার।
1/u + 1/v = 1/f
f = r/2
m = বিম্বের দৈর্ঘ্য / বস্তুর দৈর্ঘ্য = |v| / u
দৈনন্দিন জীবনে দর্পণের ব্যবহার
প্রতিফলনের সূত্র শুধু বইয়ের পাতায় নয়, আমাদের চারপাশে প্রতিদিন কাজ করছে। কোন দর্পণ কোথায় কেন ব্যবহার হয়, তা পরীক্ষায় 'জ্ঞানমূলক' ও 'অনুধাবনমূলক' প্রশ্নে প্রায়ই আসে।
- সমতল দর্পণ: ঘরের আয়না, পেরিস্কোপ, কেলিডোস্কোপ।
- অবতল দর্পণ: দাড়ি কামানো ও মেকআপ আয়না (কাছে রাখলে সোজা ও বড় বিম্ব), দাঁতের ডাক্তারের আয়না, টর্চ ও গাড়ির হেডলাইটের প্রতিফলক (বাল্ব ফোকাসে রাখলে সমান্তরাল আলো), সৌরচুল্লি, প্রতিফলক দূরবীক্ষণ যন্ত্র।
- উত্তল দর্পণ: গাড়ির পাশের ও রিয়ার-ভিউ আয়না, রাস্তার বাঁকের আয়না; এটি সব সময় সোজা বিম্ব দেয় এবং বড় এলাকা দেখায়।
সমাধান করা অংক
উদাহরণ ১: একটি অবতল দর্পণের বক্রতার ব্যাসার্ধ 40 cm। দর্পণ থেকে 30 cm দূরে একটি বস্তু রাখলে বিম্ব কোথায় হবে এবং বিবর্ধন কত?
- f = r/2 = 40/2 = 20 cm (অবতল, তাই ধনাত্মক)।
- u = 30 cm। সূত্র: 1/u + 1/v = 1/f।
- 1/v = 1/20 − 1/30 = (3 − 2)/60 = 1/60, তাই v = 60 cm।
- v ধনাত্মক, অর্থাৎ বিম্ব সদ ও উল্টো, দর্পণের সামনে।
- m = |v|/u = 60/30 = 2।
উত্তর: বিম্ব দর্পণের সামনে 60 cm দূরে, সদ ও উল্টো; বিবর্ধন 2 (বস্তুর দ্বিগুণ)।
উদাহরণ ২: 15 cm ফোকাস দূরত্বের একটি অবতল দর্পণ থেকে 10 cm দূরে একটি বস্তু রাখা হলো। বিম্বের অবস্থান ও প্রকৃতি নির্ণয় করো।
- f = 15 cm, u = 10 cm।
- 1/v = 1/f − 1/u = 1/15 − 1/10 = (2 − 3)/30 = −1/30।
- v = −30 cm। ঋণাত্মক মানে বিম্ব অসদ, দর্পণের পেছনে।
- m = |v|/u = 30/10 = 3।
উত্তর: বিম্ব দর্পণের পেছনে 30 cm দূরে, অসদ, সোজা ও তিনগুণ বিবর্ধিত। দাড়ি কামানোর আয়না এভাবেই কাজ করে।
উদাহরণ ৩: একটি উত্তল দর্পণের ফোকাস দূরত্ব 20 cm। দর্পণ থেকে 20 cm দূরে 6 cm লম্বা একটি বস্তু রাখলে বিম্বের অবস্থান ও দৈর্ঘ্য কত?
- উত্তল দর্পণ, তাই f = −20 cm; u = 20 cm।
- 1/v = 1/f − 1/u = −1/20 − 1/20 = −2/20 = −1/10।
- v = −10 cm, অর্থাৎ বিম্ব অসদ, দর্পণের পেছনে।
- m = |v|/u = 10/20 = 0.5।
- বিম্বের দৈর্ঘ্য = m × বস্তুর দৈর্ঘ্য = 0.5 × 6 = 3 cm।
উত্তর: বিম্ব দর্পণের পেছনে 10 cm দূরে, অসদ, সোজা ও খর্বিত; দৈর্ঘ্য 3 cm।
উদাহরণ ৪: একটি সমতল দর্পণ থেকে 2 m দূরে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি দর্পণের দিকে 0.5 m এগিয়ে গেলে তাঁর ও তাঁর প্রতিবিম্বের মধ্যে দূরত্ব কত হবে?
- এগোনোর পর দর্পণ থেকে মানুষের দূরত্ব = 2 − 0.5 = 1.5 m।
- সমতল দর্পণে বিম্ব দর্পণের পেছনে সমান দূরত্বে, অর্থাৎ 1.5 m।
- মানুষ ও বিম্বের দূরত্ব = 1.5 + 1.5 = 3 m।
উত্তর: 3 m।
বহুনির্বাচনী প্রশ্ন (MCQ)
১. আপতন কোণ 35° হলে প্রতিফলিত রশ্মি ও আপতিত রশ্মির মধ্যবর্তী কোণ কত?
- ক) 35°
- খ) 55°
- গ) 70°
- ঘ) 110°
উত্তর দেখো
উত্তর: গ) 70° — i = r = 35°, তাই দুই রশ্মির মধ্যবর্তী কোণ i + r = 70°।
২. গোলীয় দর্পণের ফোকাস দূরত্ব ও বক্রতার ব্যাসার্ধের সম্পর্ক কোনটি?
- ক) f = 2r
- খ) f = r/2
- গ) f = r
- ঘ) f = r²
উত্তর দেখো
উত্তর: খ) f = r/2 — প্রধান ফোকাস মেরু ও বক্রতার কেন্দ্রের ঠিক মাঝখানে থাকে, তাই f = r/2।
৩. গাড়ির রিয়ার-ভিউ আয়না হিসেবে কোন দর্পণ ব্যবহার করা হয়?
- ক) সমতল দর্পণ
- খ) অবতল দর্পণ
- গ) উত্তল দর্পণ
- ঘ) সমতল-অবতল দর্পণ
উত্তর দেখো
উত্তর: গ) উত্তল দর্পণ — উত্তল দর্পণ সব সময় সোজা ও খর্বিত বিম্ব দেয় এবং পেছনের বড় এলাকা দেখায়।
৪. সমতল দর্পণে গঠিত প্রতিবিম্বের বৈশিষ্ট্য কোনটি নয়?
- ক) অসদ
- খ) সোজা
- গ) সমান আকার
- ঘ) পর্দায় ফেলা যায়
উত্তর দেখো
উত্তর: ঘ) পর্দায় ফেলা যায় — সমতল দর্পণের বিম্ব অসদ, তাই একে পর্দায় ফেলা যায় না।
৫. অবতল দর্পণের বক্রতার কেন্দ্রে বস্তু রাখলে বিম্ব কোথায় হবে?
- ক) ফোকাসে
- খ) বক্রতার কেন্দ্রে
- গ) অসীমে
- ঘ) দর্পণের পেছনে
উত্তর দেখো
উত্তর: খ) বক্রতার কেন্দ্রে — বস্তু C-তে থাকলে বিম্বও C-তে হয়: সদ, উল্টো ও বস্তুর সমান।
৬. টর্চলাইটে সমান্তরাল আলো পেতে বাল্বটি অবতল প্রতিফলকের কোথায় রাখা হয়?
- ক) মেরুতে
- খ) প্রধান ফোকাসে
- গ) বক্রতার কেন্দ্রে
- ঘ) কেন্দ্রের বাইরে
উত্তর দেখো
উত্তর: খ) প্রধান ফোকাসে — ফোকাস থেকে আসা রশ্মি প্রতিফলনের পর প্রধান অক্ষের সমান্তরাল হয়ে যায়।
৭. দেয়ালের সব দিক থেকে ছবি দেখা যায় কোন কারণে?
- ক) নিয়মিত প্রতিফলন
- খ) ব্যাপ্ত প্রতিফলন
- গ) প্রতিসরণ
- ঘ) পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন
উত্তর দেখো
উত্তর: খ) ব্যাপ্ত প্রতিফলন — অমসৃণ তলে আলো চারদিকে ছড়িয়ে প্রতিফলিত হয়, ফলে সব দিক থেকে দেখা যায়।
৮. 10 cm ফোকাস দূরত্বের অবতল দর্পণ থেকে 20 cm দূরে বস্তু রাখলে বিবর্ধন কত?
- ক) 0.5
- খ) 1
- গ) 2
- ঘ) 4
উত্তর দেখো
উত্তর: খ) 1 — 1/v = 1/10 − 1/20 = 1/20, v = 20 cm; m = 20/20 = 1। বস্তু এখানে বক্রতার কেন্দ্রে (r = 20 cm)।
সৃজনশীল প্রশ্ন
উদ্দীপক: রাফি দাড়ি কামানোর জন্য একটি অবতল দর্পণ কিনল, যার বক্রতার ব্যাসার্ধ 50 cm। সে মুখটি দর্পণ থেকে 15 cm দূরে রাখল। পরে কৌতূহলবশত সে মুখ সরিয়ে দর্পণ থেকে 40 cm দূরে নিল।
- ক) প্রতিফলনের দ্বিতীয় সূত্রটি লেখো।
- খ) উত্তল দর্পণকে অপসারী দর্পণ বলা হয় কেন? ব্যাখ্যা করো।
- গ) প্রথম অবস্থায় রাফির মুখের বিম্বের অবস্থান ও বিবর্ধন নির্ণয় করো।
- ঘ) দুই অবস্থায় বিম্বের প্রকৃতির পার্থক্য বিশ্লেষণ করে দেখাও, দাড়ি কামানোর জন্য কোন অবস্থানটি উপযুক্ত।
উত্তর দেখো
- আপতন কোণ ও প্রতিফলন কোণ পরস্পর সমান।
- উত্তল দর্পণে প্রধান অক্ষের সমান্তরাল রশ্মিগুচ্ছ পড়লে প্রতিফলনের পর রশ্মিগুলো ছড়িয়ে যায় এবং দর্পণের পেছনের ফোকাস থেকে আসছে বলে মনে হয়। রশ্মিকে অপসারিত করে বলে একে অপসারী দর্পণ বলে।
- f = r/2 = 25 cm, u = 15 cm। 1/v = 1/25 − 1/15 = (3 − 5)/75 = −2/75, তাই v = −37.5 cm। বিম্ব দর্পণের পেছনে 37.5 cm দূরে, অসদ। m = 37.5/15 = 2.5।
- প্রথম অবস্থায় মুখ ফোকাস (25 cm) ও মেরুর মাঝে, তাই বিম্ব অসদ, সোজা ও 2.5 গুণ বিবর্ধিত। দ্বিতীয় অবস্থায় u = 40 cm, যা F ও C (50 cm)-এর মাঝে; 1/v = 1/25 − 1/40 = 3/200, v ≈ 66.7 cm, বিম্ব সদ, উল্টো ও প্রায় 1.67 গুণ বিবর্ধিত এবং দর্পণের সামনে তৈরি হয়, ফলে আয়নায় তাকিয়ে সোজা মুখ দেখা যায় না। তাই দাড়ি কামানোর জন্য প্রথম অবস্থান (ফোকাসের ভেতরে) উপযুক্ত, কারণ এতে মুখের সোজা ও বড় বিম্ব পাওয়া যায়।
উদ্দীপক: পাহাড়ি রাস্তার একটি তীক্ষ্ণ বাঁকে কর্তৃপক্ষ একটি দর্পণ বসাল, যার ফোকাস দূরত্ব 1 m। একটি গাড়ি দর্পণ থেকে 4 m দূরে আছে। পাশেই একটি দোকানের দেয়ালে একটি বড় সমতল দর্পণ লাগানো আছে।
- ক) বক্রতার কেন্দ্র কাকে বলে?
- খ) সমতল দর্পণে পার্শ্বীয় পরিবর্তন কেন ঘটে? ব্যাখ্যা করো।
- গ) রাস্তার দর্পণটি উত্তল হলে গাড়ির বিম্বের অবস্থান ও বিবর্ধন নির্ণয় করো।
- ঘ) রাস্তার বাঁকে সমতল দর্পণের বদলে উত্তল দর্পণ ব্যবহার কেন বেশি নিরাপদ? যুক্তিসহ মূল্যায়ন করো।
উত্তর দেখো
- যে গোলকের অংশ দিয়ে গোলীয় দর্পণ তৈরি, সেই গোলকের কেন্দ্রকে দর্পণের বক্রতার কেন্দ্র বলে।
- সমতল দর্পণে বস্তুর প্রতিটি বিন্দুর বিম্ব দর্পণের পেছনে ঠিক সামনাসামনি সমান দূরত্বে তৈরি হয়। ফলে বস্তুর ডান পাশ বিম্বের যে পাশে থাকে, বিম্বের দিকে মুখ করে তাকালে সেটি আমাদের বাম পাশ বলে মনে হয়। তাই ডান-বাম উল্টে যায়।
- উত্তল দর্পণ, f = −1 m, u = 4 m। 1/v = −1/1 − 1/4 = −5/4, তাই v = −0.8 m। বিম্ব দর্পণের পেছনে 0.8 m দূরে, অসদ ও সোজা। m = 0.8/4 = 0.2।
- উত্তল দর্পণ সব সময় সোজা ও খর্বিত বিম্ব দেয়, তাই অল্প জায়গার আয়নায় বাঁকের ওপাশের অনেক বড় এলাকা দেখা যায় (দৃষ্টিক্ষেত্র বড়)। সমতল দর্পণ সমান আকারের বিম্ব দেয় বলে একই আকারের আয়নায় অনেক কম এলাকা দেখা যায়। ফলে উত্তল দর্পণে চালক আগেভাগে উল্টো দিকের গাড়ি দেখতে পান, দুর্ঘটনা কমে। তবে বিম্ব ছোট হওয়ায় গাড়িকে আসলের চেয়ে দূরে মনে হয়, তাই চালককে সাবধানে গতি কমাতে হয়। সব মিলিয়ে নিরাপত্তার জন্য উত্তল দর্পণই বেশি উপযোগী।
বাস্তব জীবনে মজার যোগসূত্র
চাঁদের নিজের কোনো আলো নেই, সে সূর্যের আলো প্রতিফলন করে ঝলমল করে। অথচ চাঁদের মাটি আসলে বেশ কালচে, এটি পড়া সূর্যালোকের মাত্র প্রায় ১২ শতাংশ ফেরত পাঠায়, অনেকটা পুরোনো পিচঢালা রাস্তার মতো! চারপাশের রাতের আকাশ এত অন্ধকার বলেই সেই সামান্য প্রতিফলিত আলোয় চাঁদকে এত উজ্জ্বল দেখায়। আর অ্যাপোলো নভোচারীদের রেখে আসা প্রতিফলকে পৃথিবী থেকে লেজার পাঠিয়ে বিজ্ঞানীরা আজও চাঁদের দূরত্ব সেন্টিমিটারের হিসাবে মাপেন, যেখানে লেজার রশ্মি একই পথে ফেরার মূলে আছে সেই প্রতিফলনের সূত্র।
প্রশ্ন ও উত্তর
প্রতিফলন কোণ আর আপতন কোণ মাপা হয় কোথা থেকে?
দুটি কোণই মাপা হয় অভিলম্ব থেকে, দর্পণের তল থেকে নয়। এটি পরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি ভুল হওয়া জায়গা।
সদ ও অসদ বিম্ব চেনার সহজ উপায় কী?
যে বিম্ব পর্দায় ফেলা যায় সেটি সদ, সাধারণত উল্টো। যে বিম্ব পর্দায় ফেলা যায় না সেটি অসদ, সাধারণত সোজা। দর্পণের সূত্রে v ঋণাত্মক এলে বিম্ব অসদ।
উত্তল দর্পণে কি কখনো সদ বিম্ব হয়?
না। সদ বস্তুর জন্য উত্তল দর্পণ সব সময় অসদ, সোজা ও খর্বিত বিম্ব দেয়, যা দর্পণের পেছনে মেরু ও ফোকাসের মাঝে থাকে।
অঙ্কে উত্তল দর্পণের ফোকাস দূরত্ব ঋণাত্মক কেন নিতে হয়?
পাঠ্যবইয়ের চিহ্ন প্রথায় সদ দূরত্ব ধনাত্মক আর অসদ দূরত্ব ঋণাত্মক। উত্তল দর্পণের ফোকাস দর্পণের পেছনে এবং অসদ, তাই f ঋণাত্মক।
পুরো শরীর দেখতে আয়না কত বড় লাগে?
সমতল দর্পণে নিজের পুরো দেহ দেখতে আয়নার দৈর্ঘ্য অন্তত নিজের উচ্চতার অর্ধেক হলেই চলে, যদি আয়নাটি ঠিক উচ্চতায় লাগানো থাকে। আয়না থেকে কত দূরে দাঁড়ালেন তাতে এটি বদলায় না।
আরও পড়ো
সূত্র: NCTB পদার্থবিজ্ঞান, নবম-দশম শ্রেণি, অধ্যায় ৮: আলোর প্রতিফলন · OpenStax College Physics: Image Formation by Mirrors · NASA: Lunar Laser Ranging