বিজ্ঞানী টিমটিম
আজ রাতের আকাশঢাকার আকাশে আজ রাতে কী দেখা যাবে?লাইভ ম্যাপ

এসএসসি পদার্থবিজ্ঞান · অধ্যায় ৭

তরঙ্গ ও শব্দ

এক কথায়

তরঙ্গ হলো এমন এক পর্যায়বৃত্ত আন্দোলন যা মাধ্যমের কণাগুলোকে স্থায়ীভাবে না সরিয়ে শক্তি এক স্থান থেকে আরেক স্থানে নিয়ে যায়। তরঙ্গবেগ v = fλ। শব্দ একটি অনুদৈর্ঘ্য যান্ত্রিক তরঙ্গ, শূন্যস্থানে চলে না। মানুষ 20 Hz থেকে 20000 Hz কম্পাঙ্কের শব্দ শুনতে পায়, আর স্পষ্ট প্রতিধ্বনির জন্য প্রতিফলককে অন্তত প্রায় 17 m দূরে থাকতে হয়।

স্পন্দন ও তরঙ্গ: শক্তি যায়, কণা থাকে

পুকুরে একটা ঢিল ফেললে চারদিকে গোল গোল ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু পানিতে ভাসা একটা পাতা লক্ষ করো: সে ওঠানামা করে, অথচ ঢেউয়ের সাথে পাড়ে ভেসে যায় না। অর্থাৎ পানি নিজে এগোয় না, এগোয় শুধু আন্দোলন আর শক্তি।

যে পর্যায়বৃত্ত আন্দোলন মাধ্যমের কণাগুলোর স্পন্দনের মাধ্যমে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে শক্তি সঞ্চালন করে, কিন্তু কণাগুলোকে স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত করে না, তাকে তরঙ্গ বলে। প্রতিটি কণা নিজের সাম্যাবস্থানের দুই পাশে স্পন্দিত হয় এবং পরের কণাকে একটু দেরিতে সেই স্পন্দন দিয়ে দেয়।

  • যান্ত্রিক তরঙ্গ: চলতে মাধ্যম লাগে, যেমন শব্দ, পানির ঢেউ, দড়ির ঢেউ।
  • তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ: মাধ্যম লাগে না, শূন্যস্থানেও চলে, যেমন আলো, রেডিও তরঙ্গ।

অনুপ্রস্থ ও অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ

মাধ্যমের কণাগুলো তরঙ্গ চলার দিকের লম্ব বরাবর স্পন্দিত হলে তাকে অনুপ্রস্থ তরঙ্গ বলে। এতে তৈরি হয় তরঙ্গশীর্ষ (চূড়া) ও তরঙ্গপাদ (খাঁজ)। টানটান দড়ির এক প্রান্ত উপর-নিচ নাড়ালে এমন তরঙ্গ দেখা যায়।

কণাগুলো তরঙ্গ চলার দিকের সমান্তরালে স্পন্দিত হলে তাকে অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ বলে। এতে তৈরি হয় সংকোচন (কণা ঘন) ও প্রসারণ (কণা পাতলা)। একটা লম্বা স্প্রিং টেবিলে রেখে এক প্রান্ত সামনে-পিছনে ঠেললে এটা স্পষ্ট দেখা যায়। বাতাসে শব্দ এভাবেই চলে।

  • অনুপ্রস্থ: শীর্ষ ও পাদ; যেমন দড়ির ঢেউ, পানির পৃষ্ঠের ঢেউ (মূলত), আলো।
  • অনুদৈর্ঘ্য: সংকোচন ও প্রসারণ; যেমন বাতাসে শব্দ, স্প্রিংয়ের ঠেলা-টানা ঢেউ।

তরঙ্গের বৈশিষ্ট্য রাশিগুলো

তরঙ্গের অঙ্ক করতে হলে এই রাশিগুলো একদম পরিষ্কার জানা দরকার।

  • বিস্তার (A): সাম্যাবস্থান থেকে কণার সর্বোচ্চ সরণ; একক m। বিস্তার বেশি মানে শক্তি বেশি।
  • তরঙ্গদৈর্ঘ্য (λ): একটি পূর্ণ স্পন্দনে তরঙ্গ যতটুকু দূরত্ব এগোয়; পরপর দুটি শীর্ষ বা দুটি সংকোচনের মধ্যবর্তী দূরত্ব; একক m।
  • পর্যায়কাল (T): একটি পূর্ণ স্পন্দনে যে সময় লাগে; একক s।
  • কম্পাঙ্ক (f): প্রতি সেকেন্ডে পূর্ণ স্পন্দনের সংখ্যা; একক হার্জ (Hz) বা s⁻¹।
  • দশা: কোনো মুহূর্তে কণার অবস্থান ও গতির দিক; একই দশার দুটি নিকটতম কণার দূরত্বই λ।
  • তরঙ্গবেগ (v): প্রতি সেকেন্ডে তরঙ্গ যতটুকু দূরত্ব অতিক্রম করে; একক m/s।

f = 1 / T

v = f × λ

v = λ / T

v = fλ সম্পর্কটা কোথা থেকে এলো

একটি পর্যায়কাল T সময়ে তরঙ্গ ঠিক একটি তরঙ্গদৈর্ঘ্য λ পথ এগোয়। তাই বেগ = দূরত্ব ÷ সময় = λ / T। আর যেহেতু 1/T = f, তাই v = fλ। এটাই পুরো অধ্যায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র।

একটা জিনিস মনে রাখো: একই মাধ্যমে তরঙ্গবেগ মোটামুটি স্থির থাকে। তাই কম্পাঙ্ক বাড়ালে তরঙ্গদৈর্ঘ্য কমে যায়। আবার তরঙ্গ এক মাধ্যম থেকে আরেক মাধ্যমে গেলে কম্পাঙ্ক বদলায় না (উৎস ঠিক করে), বদলায় বেগ ও তরঙ্গদৈর্ঘ্য।

শব্দ: কম্পন থেকে কান পর্যন্ত

প্রতিটি শব্দের পেছনে আছে কোনো কম্পমান বস্তু: গিটারের তার, ঢোলের চামড়া, আমাদের স্বরতন্ত্রী। কম্পমান বস্তু বাতাসে পরপর সংকোচন ও প্রসারণ তৈরি করে, সেটি অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ হয়ে কানে পৌঁছায়, কানের পর্দা কাঁপে, মস্তিষ্ক সেটাকে শব্দ হিসেবে বোঝে।

শব্দ যান্ত্রিক তরঙ্গ, তাই মাধ্যম ছাড়া চলতে পারে না। বেল জার পরীক্ষায় কাচের পাত্রে বৈদ্যুতিক ঘণ্টা বাজিয়ে ভেতরের বাতাস পাম্প দিয়ে বের করতে থাকলে শব্দ ক্রমে ক্ষীণ হয়ে যায়, যদিও ঘণ্টার হাতুড়ি তখনও চলতে দেখা যায়। মহাশূন্যে তাই বিস্ফোরণও নিঃশব্দ।

বিভিন্ন মাধ্যমে শব্দের বেগ

শব্দের বেগ মাধ্যমের স্থিতিস্থাপকতা ও ঘনত্বের উপর নির্ভর করে। সাধারণভাবে কঠিনে সবচেয়ে বেশি, তরলে মাঝামাঝি, গ্যাসে সবচেয়ে কম। রেললাইনে কান পাতলে দূরের ট্রেনের শব্দ বাতাসের আগেই শোনা যায় এই কারণে।

তাপমাত্রা বাড়লে বাতাসে শব্দের বেগ বাড়ে, প্রতি 1 °C বৃদ্ধিতে প্রায় 0.6 m/s। বাতাসে আর্দ্রতা বাড়লেও বেগ সামান্য বাড়ে। তবে তাপমাত্রা স্থির থাকলে শুধু চাপ বদলালে বাতাসে শব্দের বেগ বদলায় না।

  • শুষ্ক বাতাস, 0 °C: প্রায় 332 m/s
  • বাতাস, 20 °C: প্রায় 343 m/s
  • পানি: প্রায় 1480 m/s
  • লোহা/ইস্পাত: প্রায় 5000 m/s বা তার বেশি

প্রতিধ্বনি ও শব্দের প্রতিফলন

শব্দ কোনো দূরের শক্ত বাধা, যেমন পাহাড়, উঁচু দেয়াল বা কুয়ার পানিতে প্রতিফলিত হয়ে ফিরে এলে মূল শব্দ থেকে আলাদা করে শোনা গেলে তাকে প্রতিধ্বনি বলে।

আমাদের কানে কোনো শব্দের রেশ প্রায় 0.1 s থাকে। তাই মূল শব্দ আর প্রতিধ্বনি আলাদা শুনতে হলে অন্তত 0.1 s ব্যবধান দরকার। এই সময়ে শব্দ যেতে-আসতে 2d পথ চলে। 2d = v × t থেকে বাতাসে 332 m/s বেগে d = 332 × 0.1 ÷ 2 = 16.6 m, অর্থাৎ প্রায় 17 m। প্রতিফলক এর চেয়ে কাছে থাকলে প্রতিধ্বনি মূল শব্দের সাথে মিশে যায়, একে অনুরণন বলে।

প্রতিধ্বনির কাজে লাগানো হয় সমুদ্রের গভীরতা মাপতে (SONAR), বাদুড়ের পথ চলায়, এবং আল্ট্রাসনোগ্রাফিতে।

2d = v × t

d = v × t / 2

ন্যূনতম দূরত্ব ≈ 332 × 0.1 / 2 ≈ 16.6 m

শ্রাব্যতার সীমা, শব্দোত্তর ও শব্দেতর

মানুষ সাধারণত 20 Hz থেকে 20000 Hz কম্পাঙ্কের শব্দ শুনতে পায়, একে শ্রাব্যতার সীমা বলে। বয়স বাড়লে উপরের সীমা কমে আসে।

20 Hz এর কম কম্পাঙ্কের শব্দকে শব্দেতর বা infrasonic বলে; হাতি ও তিমি এ ধরনের শব্দে যোগাযোগ করে, ভূমিকম্পও এমন তরঙ্গ তৈরি করে। 20000 Hz এর বেশি কম্পাঙ্কের শব্দকে শব্দোত্তর বা ultrasonic বলে; বাদুড়, ডলফিন ও কুকুর এগুলো শুনতে পারে।

  • শব্দোত্তর তরঙ্গের ব্যবহার: আল্ট্রাসনোগ্রাফি, SONAR দিয়ে সমুদ্রের তলদেশ ও মাছের ঝাঁক খোঁজা, ধাতুর ফাটল শনাক্ত করা, সূক্ষ্ম যন্ত্রাংশ পরিষ্কার করা।
  • তীক্ষ্ণতা (pitch) নির্ভর করে কম্পাঙ্কের উপর: কম্পাঙ্ক বেশি হলে শব্দ তীক্ষ্ণ বা চিকন।
  • প্রাবল্য (loudness) নির্ভর করে বিস্তারের উপর: বিস্তার বেশি হলে শব্দ জোরালো; প্রাবল্যের লেভেল মাপা হয় ডেসিবেল (dB) এককে।
  • গুণ বা জাতি (timbre): একই কম্পাঙ্কের সুর গিটার আর বাঁশিতে আলাদা শোনায় উপসুরের মিশ্রণের কারণে।

শব্দদূষণ

অবাঞ্ছিত ও মাত্রাতিরিক্ত জোরালো শব্দই শব্দদূষণ। দীর্ঘ সময় প্রায় 85 dB বা তার বেশি শব্দের মধ্যে থাকলে শ্রবণশক্তি স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এছাড়া মাথাব্যথা, অনিদ্রা, উচ্চ রক্তচাপ ও মনোযোগের অভাব দেখা দেয়।

প্রতিকার: অপ্রয়োজনে হর্ন না বাজানো, হাসপাতাল ও স্কুলের পাশে নীরব এলাকা মানা, কলকারখানায় শব্দনিরোধক ব্যবস্থা ও কানের সুরক্ষা ব্যবহার, রাস্তার পাশে গাছ লাগানো, আর হেডফোনের ভলিউম কমিয়ে রাখা।

সমাধান করা অংক

উদাহরণ ১: একটি সুরশলাকার কম্পাঙ্ক 512 Hz। বাতাসে শব্দের বেগ 332 m/s হলে উৎপন্ন শব্দের তরঙ্গদৈর্ঘ্য কত?

  1. দেওয়া আছে: f = 512 Hz, v = 332 m/s
  2. v = fλ থেকে λ = v / f
  3. λ = 332 / 512 ≈ 0.648 m

উত্তর: প্রায় 0.648 m

উদাহরণ ২: একটি তরঙ্গের পর্যায়কাল 0.02 s এবং তরঙ্গদৈর্ঘ্য 1.5 m। তরঙ্গের কম্পাঙ্ক ও বেগ নির্ণয় করো।

  1. f = 1 / T = 1 / 0.02 = 50 Hz
  2. v = fλ = 50 × 1.5 = 75 m/s

উত্তর: কম্পাঙ্ক 50 Hz, বেগ 75 m/s

উদাহরণ ৩: এক ব্যক্তি একটি পাহাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে হাততালি দেওয়ার 2 s পর প্রতিধ্বনি শুনলেন। বাতাসে শব্দের বেগ 340 m/s হলে পাহাড়টি কত দূরে?

  1. শব্দ পাহাড়ে গিয়ে ফিরে আসে, তাই মোট পথ 2d
  2. 2d = v × t = 340 × 2 = 680 m
  3. d = 680 / 2 = 340 m

উত্তর: 340 m

উদাহরণ ৪: একটি জাহাজ থেকে পাঠানো শব্দোত্তর তরঙ্গ সমুদ্রের তলদেশে প্রতিফলিত হয়ে 4 s পর ফিরে এলো। পানিতে শব্দের বেগ 1500 m/s হলে সমুদ্রের গভীরতা কত?

  1. d = v × t / 2
  2. d = 1500 × 4 / 2 = 3000 m

উত্তর: 3000 m (3 km)

উদাহরণ ৫: একটি দড়িতে 10 s এ 40টি পূর্ণ তরঙ্গ তৈরি হয় এবং পরপর দুটি তরঙ্গশীর্ষের দূরত্ব 0.5 m। তরঙ্গবেগ কত?

  1. f = 40 / 10 = 4 Hz
  2. λ = 0.5 m (পরপর দুটি শীর্ষের দূরত্ব)
  3. v = fλ = 4 × 0.5 = 2 m/s

উত্তর: 2 m/s

বহুনির্বাচনী প্রশ্ন (MCQ)

  1. ১. শব্দ কোন ধরনের তরঙ্গ?

    • ক) অনুপ্রস্থ যান্ত্রিক
    • খ) অনুদৈর্ঘ্য যান্ত্রিক
    • গ) তড়িৎচৌম্বক
    • ঘ) অনুপ্রস্থ তড়িৎচৌম্বক
    উত্তর দেখো

    উত্তর: খ) অনুদৈর্ঘ্য যান্ত্রিক — বাতাসে শব্দ সংকোচন-প্রসারণ আকারে চলে এবং মাধ্যম লাগে, তাই অনুদৈর্ঘ্য যান্ত্রিক তরঙ্গ।

  2. ২. কম্পাঙ্কের SI একক কোনটি?

    • ক) সেকেন্ড
    • খ) মিটার
    • গ) হার্জ
    • ঘ) ডেসিবেল
    উত্তর দেখো

    উত্তর: গ) হার্জ — প্রতি সেকেন্ডে স্পন্দন সংখ্যা, একক Hz বা s⁻¹।

  3. ৩. তরঙ্গবেগ, কম্পাঙ্ক ও তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সম্পর্ক কোনটি?

    • ক) v = f / λ
    • খ) v = λ / f
    • গ) v = fλ
    • ঘ) v = f + λ
    উত্তর দেখো

    উত্তর: গ) v = fλ — এক পর্যায়কালে তরঙ্গ λ পথ যায়, তাই v = λ / T = fλ।

  4. ৪. মানুষের শ্রাব্যতার সীমা কোনটি?

    • ক) 2 Hz – 2000 Hz
    • খ) 20 Hz – 20000 Hz
    • গ) 200 Hz – 200000 Hz
    • ঘ) 20 Hz – 2000 Hz
    উত্তর দেখো

    উত্তর: খ) 20 Hz – 20000 Hz — মানুষ সাধারণত 20 Hz থেকে 20 kHz পর্যন্ত শুনতে পায়।

  5. ৫. শব্দের বেগ সবচেয়ে বেশি কোন মাধ্যমে?

    • ক) বাতাস
    • খ) পানি
    • গ) ইস্পাত
    • ঘ) শূন্যস্থান
    উত্তর দেখো

    উত্তর: গ) ইস্পাত — কঠিনে শব্দের বেগ সবচেয়ে বেশি; শূন্যস্থানে শব্দ চলেই না।

  6. ৬. শব্দের তীক্ষ্ণতা নির্ভর করে —

    • ক) বিস্তারের উপর
    • খ) কম্পাঙ্কের উপর
    • গ) মাধ্যমের ঘনত্বের উপর
    • ঘ) তরঙ্গবেগের উপর
    উত্তর দেখো

    উত্তর: খ) কম্পাঙ্কের উপর — কম্পাঙ্ক বেশি হলে শব্দ তীক্ষ্ণ শোনায়; বিস্তার ঠিক করে প্রাবল্য।

  7. ৭. বাতাসে শব্দের বেগ 332 m/s হলে স্পষ্ট প্রতিধ্বনি শোনার জন্য প্রতিফলকের ন্যূনতম দূরত্ব প্রায় —

    • ক) 8.3 m
    • খ) 16.6 m
    • গ) 33.2 m
    • ঘ) 332 m
    উত্তর দেখো

    উত্তর: খ) 16.6 m — d = v × 0.1 / 2 = 332 × 0.1 / 2 = 16.6 m।

  8. ৮. একটি তরঙ্গের কম্পাঙ্ক 200 Hz হলে পর্যায়কাল কত?

    • ক) 0.5 s
    • খ) 0.05 s
    • গ) 0.005 s
    • ঘ) 200 s
    উত্তর দেখো

    উত্তর: গ) 0.005 s — T = 1 / f = 1 / 200 = 0.005 s।

সৃজনশীল প্রশ্ন

উদ্দীপক: নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে মিতু লক্ষ করল, একটি নৌকা চলে যাওয়ার পর পানিতে ঢেউ তৈরি হলো। সে গুনে দেখল 5 s এ 10টি ঢেউ পাড়ে এসে লাগল, আর পরপর দুটি ঢেউচূড়ার দূরত্ব প্রায় 0.8 m। পানিতে ভাসা একটি শুকনো পাতা শুধু ওঠানামা করছিল।

  • ক) তরঙ্গদৈর্ঘ্য কাকে বলে?
  • খ) পাতাটি ঢেউয়ের সাথে পাড়ে চলে আসেনি কেন? ব্যাখ্যা করো।
  • গ) ঢেউয়ের বেগ নির্ণয় করো।
  • ঘ) একই পানিতে নৌকাটি যদি প্রতি সেকেন্ডে 4টি ঢেউ তৈরি করত, তবে তরঙ্গদৈর্ঘ্যের কী পরিবর্তন হতো? গাণিতিকভাবে বিশ্লেষণ করো।
উত্তর দেখো
  1. একটি পূর্ণ স্পন্দনে তরঙ্গ যে দূরত্ব অতিক্রম করে, অথবা পরপর দুটি একই দশার কণার মধ্যবর্তী দূরত্বকে তরঙ্গদৈর্ঘ্য বলে; একক m।
  2. তরঙ্গ শক্তি বহন করে, মাধ্যমের কণাকে স্থায়ীভাবে সরায় না। পানির কণাগুলো নিজের সাম্যাবস্থানের চারপাশে স্পন্দিত হয়, তাই পাতাটি শুধু ওঠানামা করেছে, পাড়ে আসেনি।
  3. f = 10 / 5 = 2 Hz, λ = 0.8 m; v = fλ = 2 × 0.8 = 1.6 m/s।
  4. একই মাধ্যমে বেগ একই থাকে, v = 1.6 m/s। নতুন f = 4 Hz হলে λ = v / f = 1.6 / 4 = 0.4 m। অর্থাৎ কম্পাঙ্ক দ্বিগুণ হলে তরঙ্গদৈর্ঘ্য অর্ধেক হয়ে 0.8 m থেকে 0.4 m হতো; λ ও f ব্যস্তানুপাতিক।

উদ্দীপক: রাকিব একটি বড় দেয়াল থেকে 85 m দূরে দাঁড়িয়ে জোরে চিৎকার করল এবং 0.5 s পর প্রতিধ্বনি শুনল। তার বন্ধু সাদিয়া একই দেয়াল থেকে মাত্র 10 m দূরে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে কোনো আলাদা প্রতিধ্বনি শুনতে পেল না।

  • ক) প্রতিধ্বনি কাকে বলে?
  • খ) শব্দ শূন্যস্থানে চলতে পারে না কেন?
  • গ) উদ্দীপকের তথ্য থেকে বাতাসে শব্দের বেগ নির্ণয় করো।
  • ঘ) সাদিয়া প্রতিধ্বনি শুনতে পেল না কেন? গাণিতিক যুক্তি দিয়ে বিশ্লেষণ করো।
উত্তর দেখো
  1. শব্দ দূরের কোনো বাধায় প্রতিফলিত হয়ে ফিরে এসে মূল শব্দ থেকে আলাদাভাবে শোনা গেলে তাকে প্রতিধ্বনি বলে।
  2. শব্দ যান্ত্রিক তরঙ্গ; এটি মাধ্যমের কণার পরপর সংকোচন-প্রসারণের মাধ্যমে চলে। শূন্যস্থানে কোনো কণা নেই, তাই কম্পন সঞ্চালিত হতে পারে না।
  3. মোট পথ 2d = 2 × 85 = 170 m, t = 0.5 s; v = 2d / t = 170 / 0.5 = 340 m/s।
  4. সাদিয়ার ক্ষেত্রে প্রতিধ্বনি ফেরার সময় t = 2d / v = 2 × 10 / 340 ≈ 0.059 s। কানে শব্দের রেশ প্রায় 0.1 s থাকে, তাই 0.1 s এর কম ব্যবধানে ফেরা শব্দ মূল শব্দের সাথে মিশে যায়। 340 m/s বেগে ন্যূনতম দূরত্ব = 340 × 0.1 / 2 = 17 m; সাদিয়া 10 m দূরে থাকায় আলাদা প্রতিধ্বনি শোনেনি, শুধু শব্দ একটু দীর্ঘ (অনুরণন) মনে হয়েছে।

বাস্তব জীবনে মজার যোগসূত্র

বজ্রপাতের আলো আর গর্জন একসাথেই তৈরি হয়, কিন্তু আলো প্রায় সাথে সাথে পৌঁছায় আর শব্দ বাতাসে চলে মাত্র প্রায় 340 m/s বেগে। তাই বিদ্যুৎ চমকানোর পর কয় সেকেন্ড পর গর্জন শুনলে সেটাকে 3 দিয়ে ভাগ করো, মোটামুটি কত কিলোমিটার দূরে বাজ পড়ল জেনে যাবে! আর বাদুড় অন্ধকারে শব্দোত্তর চিৎকার দিয়ে প্রতিধ্বনি শুনে মশা ধরে, পুরো একটা জীবন্ত SONAR।

প্রশ্ন ও উত্তর

অনুপ্রস্থ আর অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গের মূল পার্থক্য কী?

অনুপ্রস্থে কণা তরঙ্গের দিকের লম্বভাবে কাঁপে, শীর্ষ-পাদ হয়। অনুদৈর্ঘ্যে কণা তরঙ্গের দিকের সমান্তরালে কাঁপে, সংকোচন-প্রসারণ হয়।

তরঙ্গ এক মাধ্যম থেকে আরেক মাধ্যমে গেলে কী বদলায়?

কম্পাঙ্ক উৎসের উপর নির্ভর করে, তাই বদলায় না। বদলায় তরঙ্গবেগ এবং সেই অনুযায়ী তরঙ্গদৈর্ঘ্য।

চাঁদে কেন কথা শোনা যায় না?

চাঁদে বায়ুমণ্ডল প্রায় নেই, আর শব্দ চলতে মাধ্যম লাগে। তাই নভোচারীরা রেডিও তরঙ্গ দিয়ে কথা বলেন, যা তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ।

প্রতিধ্বনির জন্য 17 m দূরত্ব কোথা থেকে আসে?

কানে শব্দের রেশ প্রায় 0.1 s। এই সময়ে শব্দ যেতে-আসতে 2d পথ যায়: d = 340 × 0.1 / 2 = 17 m (332 m/s ধরলে 16.6 m)।

প্রাবল্য আর তীক্ষ্ণতা কি একই জিনিস?

না। প্রাবল্য মানে শব্দ কত জোরালো, নির্ভর করে বিস্তারের উপর। তীক্ষ্ণতা মানে শব্দ কত চিকন, নির্ভর করে কম্পাঙ্কের উপর।

আরও পড়ো

সূত্র: NCTB নবম-দশম শ্রেণি পদার্থবিজ্ঞান পাঠ্যবই, অধ্যায় ৭: তরঙ্গ ও শব্দ · OpenStax College Physics 2e, Chapter 17: Physics of Hearing · Khan Academy: Mechanical waves and sound