এসএসসি জীববিজ্ঞান · অধ্যায় ৮
রেচন প্রক্রিয়া
এক কথায়
রেচন হলো দেহে বিপাকের ফলে তৈরি ক্ষতিকর নাইট্রোজেনঘটিত বর্জ্য, যেমন ইউরিয়া, দেহ থেকে বের করে দেওয়ার প্রক্রিয়া। মানুষের প্রধান রেচন অঙ্গ বৃক্ক। বৃক্কের কাজের একক নেফ্রন রক্ত ছেঁকে, দরকারি পদার্থ ফেরত নিয়ে মূত্র তৈরি করে। উদ্ভিদ বর্জ্য জমা রাখে পাতা, বাকল বা কাণ্ডে, যেমন রজন, তরুক্ষীর ও ট্যানিন।
রেচন কী এবং কেন দরকার
আমাদের দেহের প্রতিটি কোষে প্রতিনিয়ত হাজারো রাসায়নিক বিক্রিয়া চলছে, একে বলে বিপাক। খাবার ভেঙে শক্তি তৈরির সময় কিছু অপ্রয়োজনীয় এবং ক্ষতিকর পদার্থও তৈরি হয়। বিশেষ করে প্রোটিন ভাঙলে তৈরি হয় অ্যামোনিয়া, যা খুবই বিষাক্ত। এসব বর্জ্য জমে থাকলে কোষ ও কলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
দেহে বিপাকের ফলে তৈরি ক্ষতিকর বর্জ্য, বিশেষ করে নাইট্রোজেনঘটিত বর্জ্য, দেহ থেকে বের করে দেওয়ার প্রক্রিয়াকে রেচন বলে। খেয়াল রাখো, মল ত্যাগ রেচন নয়। মলের বেশিরভাগই অপাচ্য খাদ্যাংশ, যা কখনো কোষের বিপাকে অংশই নেয়নি। তাই একে বলা হয় নিষ্কাশন বা বহিষ্করণ, রেচন নয়।
- প্রধান রেচন পদার্থ: ইউরিয়া, ইউরিক অ্যাসিড, অ্যামোনিয়া, ক্রিয়েটিনিন।
- অন্যান্য বর্জ্য: অতিরিক্ত পানি, লবণ ও কার্বন ডাইঅক্সাইড।
- রেচনের ফলে দেহে পানি ও লবণের ভারসাম্য এবং রক্তের অম্ল-ক্ষার মাত্রা ঠিক থাকে।
উদ্ভিদের রেচন
উদ্ভিদের আলাদা কোনো রেচন অঙ্গ নেই। উদ্ভিদের বিপাক প্রাণীর তুলনায় ধীর, আর নাইট্রোজেনঘটিত বর্জ্যও কম তৈরি হয়, কারণ উদ্ভিদ অনেক নাইট্রোজেন যৌগ আবার ব্যবহার করে ফেলে। তবু কিছু বর্জ্য তৈরি হয়, যা উদ্ভিদ নানা কৌশলে সামলায়।
অনেক বর্জ্য উদ্ভিদ কোষের কোষগহ্বরে বা পুরোনো কলায় জমা রাখে। পরে পাতা ঝরে পড়লে বা বাকল খসে পড়লে সেই বর্জ্যও দেহ থেকে বিদায় নেয়। গ্যাসীয় বর্জ্য যেমন অক্সিজেন ও কার্বন ডাইঅক্সাইড পত্ররন্ধ্র ও লেন্টিসেল দিয়ে ব্যাপন প্রক্রিয়ায় বের হয়ে যায়।
- রজন (resin): পাইন জাতীয় উদ্ভিদে তৈরি হয়।
- গঁদ বা আঠা (gum): বাবলা, সজনে গাছে দেখা যায়।
- তরুক্ষীর (latex): রাবার, আকন্দ, পেঁপে গাছের সাদা দুধের মতো রস।
- ট্যানিন: চা পাতা, পেয়ারা, বিভিন্ন গাছের বাকলে থাকে।
- উপক্ষার (alkaloid): যেমন কুইনাইন (সিনকোনা), নিকোটিন (তামাক), ক্যাফেইন (চা, কফি)।
- কেলাস: ক্যালসিয়াম অক্সালেটের সূঁচের মতো কেলাস (র্যাফাইড), যেমন কচুতে; এজন্যই কচু খেলে গলা চুলকায়।
মানুষের রেচনতন্ত্রের অঙ্গসমূহ
মানুষের রেচনতন্ত্র গঠিত হয় একজোড়া বৃক্ক, একজোড়া মূত্রনালি (ureter), একটি মূত্রথলি এবং একটি মূত্রপথ (urethra) দিয়ে। বৃক্ক রক্ত ছেঁকে মূত্র তৈরি করে, মূত্রনালি সেই মূত্র মূত্রথলিতে নিয়ে যায়, মূত্রথলি তা সাময়িক জমা রাখে, আর মূত্রপথ দিয়ে তা দেহের বাইরে বের হয়।
বৃক্ক ছাড়াও আরও কিছু অঙ্গ রেচনে সাহায্য করে। ত্বক ঘামের মাধ্যমে পানি, লবণ ও সামান্য ইউরিয়া বের করে। ফুসফুস কার্বন ডাইঅক্সাইড ও জলীয় বাষ্প বের করে। যকৃৎ অ্যামোনিয়াকে কম বিষাক্ত ইউরিয়ায় রূপান্তর করে এবং পিত্তরসের মাধ্যমে বিলিরুবিনের মতো রঞ্জক বের করে দেয়।
বৃক্কের গঠন
বৃক্ক দেখতে শিমবীজের মতো, রং লালচে বাদামি। উদরগহ্বরের পেছনের দিকে মেরুদণ্ডের দুই পাশে একটি করে বৃক্ক থাকে। ডান বৃক্কটি বাম বৃক্কের চেয়ে একটু নিচে থাকে, কারণ তার ঠিক উপরে বড় অঙ্গ যকৃৎ। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিটি বৃক্ক প্রায় ১০ থেকে ১২ সেন্টিমিটার লম্বা।
বৃক্কের ভেতরের দিকের খাঁজকে বলে হাইলাম। এখান দিয়ে বৃক্ক ধমনি প্রবেশ করে এবং বৃক্ক শিরা ও মূত্রনালি বের হয়। বৃক্ককে লম্বালম্বি কাটলে বাইরের গাঢ় অংশ কর্টেক্স এবং ভেতরের হালকা অংশ মেডালা দেখা যায়। মেডালায় কয়েকটি পিরামিড আকৃতির অংশ থাকে, যেগুলো পেলভিস নামের ফাঁপা অংশে খোলে। পেলভিস থেকেই মূত্রনালি শুরু হয়।
নেফ্রন: বৃক্কের গঠন ও কাজের একক
প্রতিটি বৃক্কে প্রায় ১০ লক্ষ নেফ্রন থাকে। নেফ্রন হলো অতি সূক্ষ্ম, প্যাঁচানো নালিকা, যা রক্ত থেকে বর্জ্য ছেঁকে মূত্র তৈরি করে। তাই নেফ্রনকে বৃক্কের গঠনগত ও কার্যগত একক বলা হয়।
নেফ্রনের শুরুতে থাকে পেয়ালার মতো বোম্যানস ক্যাপসুল। এর ভেতরে থাকে সূক্ষ্ম রক্তজালিকার গুচ্ছ, যার নাম গ্লোমেরুলাস। গ্লোমেরুলাস ও বোম্যানস ক্যাপসুল মিলে তৈরি হয় মালপিজিয়ান অঙ্গাণু বা রেনাল করপাসল। এরপর নালিকা ধাপে ধাপে চলে।
- বোম্যানস ক্যাপসুল ও গ্লোমেরুলাস: রক্ত ছাঁকার জায়গা (কর্টেক্সে)।
- নিকটবর্তী প্যাঁচানো নালিকা (PCT): দরকারি পদার্থের বেশিরভাগ ফেরত নেয়।
- হেনলির লুপ: U আকৃতির অংশ, মেডালায় নেমে যায়; পানি ও লবণ শোষণে মূত্র ঘন করতে সাহায্য করে।
- দূরবর্তী প্যাঁচানো নালিকা (DCT): লবণ ও অম্ল-ক্ষার ভারসাম্য ঠিক রাখে।
- সংগ্রাহী নালিকা: কয়েকটি নেফ্রনের মূত্র জমা করে পেলভিসে পাঠায়।
- অন্তর্মুখী ধমনিকা গ্লোমেরুলাসে রক্ত আনে, বহির্মুখী ধমনিকা তা বের করে নেয়; অন্তর্মুখীটি বেশি চওড়া বলে গ্লোমেরুলাসে চাপ বেশি থাকে।
মূত্র তৈরির তিন ধাপ
প্রথম ধাপ আলট্রাফিলট্রেশন বা পরিস্রাবণ। গ্লোমেরুলাসে রক্তের উচ্চ চাপের কারণে রক্তরস থেকে পানি, গ্লুকোজ, অ্যামাইনো অ্যাসিড, লবণ ও ইউরিয়া ছেঁকে বোম্যানস ক্যাপসুলে চলে আসে। রক্তকণিকা ও বড় প্রোটিন অণু ছাঁকনি পার হতে পারে না। এই ছাঁকা তরলকে বলে গ্লোমেরুলার ফিলট্রেট। একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কের বৃক্ক দিনে প্রায় ১৮০ লিটার ফিলট্রেট তৈরি করে।
দ্বিতীয় ধাপ নির্বাচিত পুনঃশোষণ। ১৮০ লিটারের সবটা মূত্র হলে আমরা কয়েক ঘণ্টায় পানিশূন্য হয়ে যেতাম। তাই নালিকা দিয়ে চলার সময় সব গ্লুকোজ, অ্যামাইনো অ্যাসিড, বেশিরভাগ পানি ও প্রয়োজনীয় লবণ আবার রক্তে ফেরত যায়। ফলে দিনে মূত্র তৈরি হয় মাত্র প্রায় ১.৫ লিটার, অর্থাৎ ফিলট্রেটের প্রায় ৯৯ শতাংশ পানি ফেরত যায়।
তৃতীয় ধাপ নালিকা ক্ষরণ। রক্তে থেকে যাওয়া কিছু বাড়তি পদার্থ, যেমন হাইড্রোজেন আয়ন, পটাশিয়াম আয়ন, ক্রিয়েটিনিন ও কিছু ওষুধ, নালিকার কোষ সরাসরি নালিকার ভেতরে ক্ষরণ করে। এতে রক্তের pH ঠিক থাকে।
- স্বাভাবিক মূত্রের প্রায় ৯৫ শতাংশ পানি, বাকিটা ইউরিয়া, লবণ, ক্রিয়েটিনিন, ইউরিক অ্যাসিড ইত্যাদি।
- মূত্রের হালকা হলুদ রং আসে ইউরোক্রোম রঞ্জক থেকে।
- সুস্থ মানুষের মূত্রে গ্লুকোজ থাকে না; থাকলে ডায়াবেটিসের সন্দেহ করা হয়।
পানির ভারসাম্য রক্ষা: অসমোরেগুলেশন ও ADH
দেহে পানি ও লবণের সঠিক মাত্রা বজায় রাখার প্রক্রিয়াকে অসমোরেগুলেশন বলে। এর চাবিকাঠি একটি হরমোন, ADH বা অ্যান্টিডাইইউরেটিক হরমোন, যা পিটুইটারি গ্রন্থির পশ্চাৎ খণ্ড থেকে নিঃসৃত হয়।
গরমে ঘাম বেশি হলে বা কম পানি খেলে রক্ত ঘন হয়ে যায়। তখন ADH বেশি নিঃসৃত হয়, দূরবর্তী নালিকা ও সংগ্রাহী নালিকা বেশি পানি শোষণ করে, ফলে মূত্র কম ও গাঢ় হয়। আবার বেশি পানি খেলে ADH কমে যায়, মূত্র বেশি ও পাতলা হয়। শীতকালে ঘাম কম হয় বলে প্রস্রাব বেশি হয়, এটাও এই কারণেই।
বৃক্কের রোগ, প্রতিকার ও ডায়ালাইসিস
বৃক্কে পাথর হলো খনিজ লবণ, প্রধানত ক্যালসিয়াম অক্সালেট, জমে তৈরি শক্ত কণা। কম পানি পান করা এর একটি বড় কারণ। এতে কোমরের পাশে তীব্র ব্যথা, প্রস্রাবে রক্ত দেখা দিতে পারে। নেফ্রাইটিস হলো নেফ্রনের, বিশেষ করে গ্লোমেরুলাসের প্রদাহ, যাতে প্রস্রাবে প্রোটিন আসে ও দেহে পানি জমে মুখ-পা ফুলে যায়।
দুই বৃক্কই দীর্ঘদিন কাজ না করলে রক্তে ইউরিয়া জমতে থাকে, একে বৃক্ক বিকল বলে। তখন ডায়ালাইসিস যন্ত্র দিয়ে কৃত্রিমভাবে রক্ত পরিশোধন করা হয়। যন্ত্রে রক্ত একটি অর্ধভেদ্য পর্দার এক পাশ দিয়ে এবং ডায়ালাইসিস তরল অন্য পাশ দিয়ে চলে; ব্যাপনের মাধ্যমে ইউরিয়া ও বাড়তি লবণ রক্ত থেকে তরলে চলে যায়। স্থায়ী সমাধান হলো বৃক্ক প্রতিস্থাপন। মানুষ একটি সুস্থ বৃক্ক নিয়েও স্বাভাবিক জীবন কাটাতে পারে, তাই জীবিত দাতাও একটি বৃক্ক দান করতে পারেন।
- দিনে পর্যাপ্ত পানি পান করা, বিশেষ করে গরমে।
- প্রস্রাব দীর্ঘক্ষণ আটকে না রাখা।
- অতিরিক্ত লবণ ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কমানো।
- উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা, কারণ এ দুটিই বৃক্ক বিকলের প্রধান কারণ।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যথানাশক ওষুধ নিয়মিত না খাওয়া।
বহুনির্বাচনী প্রশ্ন (MCQ)
১. মানুষের বৃক্কের গঠন ও কাজের একক কোনটি?
- ক) নিউরন
- খ) নেফ্রন
- গ) অ্যালভিওলাস
- ঘ) হেপাটোসাইট
উত্তর দেখো
উত্তর: খ) নেফ্রন — নেফ্রন রক্ত ছেঁকে মূত্র তৈরি করে; প্রতিটি বৃক্কে প্রায় ১০ লক্ষ নেফ্রন থাকে।
২. মানুষের প্রধান নাইট্রোজেনঘটিত রেচন পদার্থ কোনটি?
- ক) অ্যামোনিয়া
- খ) ইউরিক অ্যাসিড
- গ) ইউরিয়া
- ঘ) গ্লুকোজ
উত্তর দেখো
উত্তর: গ) ইউরিয়া — যকৃৎ বিষাক্ত অ্যামোনিয়াকে ইউরিয়ায় রূপান্তর করে, যা মূত্রের সাথে বের হয়।
৩. গ্লোমেরুলাস কোথায় অবস্থিত?
- ক) হেনলির লুপে
- খ) বোম্যানস ক্যাপসুলে
- গ) সংগ্রাহী নালিকায়
- ঘ) মূত্রথলিতে
উত্তর দেখো
উত্তর: খ) বোম্যানস ক্যাপসুলে — পেয়ালার মতো বোম্যানস ক্যাপসুলের ভেতরে রক্তজালিকার গুচ্ছই গ্লোমেরুলাস।
৪. কোনটি সাধারণত গ্লোমেরুলাসের ছাঁকনি পার হতে পারে না?
- ক) গ্লুকোজ
- খ) ইউরিয়া
- গ) লোহিত রক্তকণিকা
- ঘ) সোডিয়াম আয়ন
উত্তর দেখো
উত্তর: গ) লোহিত রক্তকণিকা — রক্তকণিকা ও বড় প্রোটিন অণু আকারে বড় বলে ফিলট্রেটে আসে না।
৫. ADH হরমোন কোন গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হয়?
- ক) থাইরয়েড
- খ) অগ্ন্যাশয়
- গ) পিটুইটারি
- ঘ) অ্যাড্রেনাল
উত্তর দেখো
উত্তর: গ) পিটুইটারি — ADH পিটুইটারির পশ্চাৎ খণ্ড থেকে নিঃসৃত হয় এবং নালিকায় পানি শোষণ বাড়ায়।
৬. কচু খেলে গলা চুলকানোর কারণ কোনটি?
- ক) ট্যানিন
- খ) ক্যালসিয়াম অক্সালেটের কেলাস
- গ) রজন
- ঘ) নিকোটিন
উত্তর দেখো
উত্তর: খ) ক্যালসিয়াম অক্সালেটের কেলাস — কচুতে ক্যালসিয়াম অক্সালেটের সূঁচের মতো কেলাস (র্যাফাইড) উদ্ভিদের রেচন পদার্থ হিসেবে জমা থাকে।
৭. একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কের বৃক্কে দিনে প্রায় কত লিটার ফিলট্রেট তৈরি হয়?
- ক) ১.৫ লিটার
- খ) ১৮ লিটার
- গ) ৫০ লিটার
- ঘ) ১৮০ লিটার
উত্তর দেখো
উত্তর: ঘ) ১৮০ লিটার — প্রায় ১৮০ লিটার ফিলট্রেট তৈরি হয়, কিন্তু পুনঃশোষণের পর মূত্র হয় মাত্র প্রায় ১.৫ লিটার।
৮. নিচের কোনটি রেচন নয়?
- ক) ঘাম ত্যাগ
- খ) মূত্র ত্যাগ
- গ) মল ত্যাগ
- ঘ) নিঃশ্বাসে CO2 ত্যাগ
উত্তর দেখো
উত্তর: গ) মল ত্যাগ — মলের বেশিরভাগই অপাচ্য খাদ্যাংশ, যা বিপাকে অংশ নেয়নি; তাই এটি নিষ্কাশন, রেচন নয়।
সৃজনশীল প্রশ্ন
উদ্দীপক: ৪৫ বছর বয়সী রহিম সাহেব বহু বছর ধরে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসে ভুগছেন, নিয়মিত ওষুধ খান না। সম্প্রতি তাঁর মুখ ও পা ফুলে গেছে, প্রস্রাব কমে গেছে। পরীক্ষায় রক্তে ইউরিয়া ও ক্রিয়েটিনিন অনেক বেশি পাওয়া গেল। চিকিৎসক তাঁকে সপ্তাহে তিনবার একটি যন্ত্রের সাহায্যে রক্ত পরিশোধনের পরামর্শ দিলেন।
- ক) নেফ্রন কাকে বলে?
- খ) ডান বৃক্ক বাম বৃক্কের চেয়ে নিচে থাকে কেন? ব্যাখ্যা করো।
- গ) রহিম সাহেবকে যে পদ্ধতির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে তার কার্যপ্রণালি ব্যাখ্যা করো।
- ঘ) রহিম সাহেবের অবস্থার জন্য তাঁর জীবনযাপনই দায়ী, বিশ্লেষণ করো।
উত্তর দেখো
- বৃক্কের গঠন ও কাজের একককে নেফ্রন বলে; এটি রক্ত ছেঁকে মূত্র তৈরি করে।
- ডান বৃক্কের ঠিক উপরে দেহের সবচেয়ে বড় গ্রন্থি যকৃৎ অবস্থিত। যকৃৎ অনেক জায়গা নেয় বলে ডান বৃক্কটি বাম বৃক্কের তুলনায় কিছুটা নিচে অবস্থান করে।
- পদ্ধতিটি হলো ডায়ালাইসিস। রোগীর ধমনি থেকে রক্ত টিউবে করে যন্ত্রে নেওয়া হয়। যন্ত্রে অর্ধভেদ্য পর্দার এক পাশে রক্ত ও অন্য পাশে ডায়ালাইসিস তরল উল্টো দিকে চলে। তরলে ইউরিয়া থাকে না, তাই ব্যাপনের মাধ্যমে রক্তের ইউরিয়া, ক্রিয়েটিনিন ও বাড়তি লবণ তরলে চলে যায়, কিন্তু রক্তকণিকা ও প্রোটিন থেকে যায়। দরকারি গ্লুকোজ ও লবণ তরলে রক্তের সমান ঘনত্বে রাখা হয় বলে তা হারায় না। পরিশোধিত রক্ত শিরা দিয়ে আবার দেহে ফেরত দেওয়া হয়।
- রহিম সাহেবের বৃক্ক বিকল হয়েছে। দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপে গ্লোমেরুলাসের সূক্ষ্ম রক্তজালিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আর রক্তে বাড়তি গ্লুকোজও নেফ্রনের ছাঁকনিকে ধীরে ধীরে নষ্ট করে। ফলে রক্ত ঠিকমতো ছাঁকা যায় না, ইউরিয়া ও ক্রিয়েটিনিন জমে, পানি বের না হওয়ায় দেহ ফুলে যায়। নিয়মিত ওষুধ খেয়ে রক্তচাপ ও শর্করা নিয়ন্ত্রণ, কম লবণ খাওয়া ও নিয়মিত পরীক্ষা করালে এই ক্ষতি অনেকটাই ঠেকানো যেত। তাই বলা যায়, তাঁর অসচেতন জীবনযাপনই অবস্থার জন্য মূলত দায়ী।
উদ্দীপক: জুন মাসের তীব্র গরমে মাঠে খেলার পর তানিয়া লক্ষ করল তার প্রস্রাব পরিমাণে কম এবং গাঢ় হলুদ। আবার ডিসেম্বরের শীতে সে দেখল একই পরিমাণ পানি খেয়েও তার বারবার প্রস্রাব হচ্ছে এবং প্রস্রাব প্রায় স্বচ্ছ।
- ক) অসমোরেগুলেশন কী?
- খ) মল ত্যাগকে রেচন বলা যায় না কেন?
- গ) গরমে তানিয়ার প্রস্রাব কম ও গাঢ় হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করো।
- ঘ) মূত্র তৈরির ধাপগুলোর মধ্যে কোনটি তানিয়ার দুই ঋতুর পার্থক্যের জন্য প্রধানত দায়ী? যুক্তিসহ বিশ্লেষণ করো।
উত্তর দেখো
- দেহে পানি ও লবণের সঠিক মাত্রা বজায় রাখার প্রক্রিয়াকে অসমোরেগুলেশন বলে।
- রেচন হলো কোষের বিপাকে তৈরি বর্জ্য বের করা। মলের বেশিরভাগ অংশ অপাচ্য খাদ্য, যা কখনো রক্তে শোষিত হয়ে বিপাকে অংশ নেয়নি। তাই মল ত্যাগ নিষ্কাশন, রেচন নয়।
- গরমে খেলার সময় ঘামের মাধ্যমে অনেক পানি বেরিয়ে যায়, ফলে রক্ত ঘন হয়। মস্তিষ্ক তা টের পেয়ে পিটুইটারি থেকে বেশি ADH নিঃসরণ ঘটায়। ADH দূরবর্তী ও সংগ্রাহী নালিকার পানি শোষণ বাড়ায়, তাই বেশি পানি রক্তে ফেরত যায়। ফলে মূত্র কম হয় এবং রঞ্জক ইউরোক্রোম ঘন হওয়ায় রং গাঢ় হলুদ দেখায়।
- পার্থক্যের জন্য প্রধানত দায়ী নির্বাচিত পুনঃশোষণ ধাপ। দুই ঋতুতেই গ্লোমেরুলাসে পরিস্রাবণ মোটামুটি একই হারে চলে। কিন্তু গরমে ADH বেশি থাকায় নালিকা ফিলট্রেট থেকে বেশি পানি ফেরত নেয়, মূত্র কম ও গাঢ়। শীতে ঘাম কম হয়, রক্তে পানি বেশি থাকে, ADH কমে যায়, তাই পুনঃশোষণ কমে এবং বেশি পানি মূত্র হয়ে বের হয়, মূত্র পাতলা ও বেশি। তাই ADH-নিয়ন্ত্রিত পানির পুনঃশোষণই তানিয়ার অভিজ্ঞতার মূল কারণ।
বাস্তব জীবনে মজার যোগসূত্র
তোমার দুই বৃক্ক দিনে প্রায় ১৮০ লিটার তরল ছাঁকে, মানে প্রায় নয়টি ২০ লিটারের পানির জারের সমান! অথচ এর প্রায় ৯৯ শতাংশ আবার রক্তে ফেরত পাঠায়। মানে পুরো দেহের রক্তরস দিনে প্রায় ৬০ বার বৃক্কের ছাঁকনি দিয়ে যায়। আর হ্যাঁ, কচু খেয়ে গলা চুলকানো আসলে কচু গাছের নিজের 'বর্জ্য ডাস্টবিন' থেকে আসা সূঁচের মতো কেলাসের খোঁচা।
প্রশ্ন ও উত্তর
রেচন আর নিষ্কাশনের পার্থক্য কী?
রেচন হলো কোষের বিপাকে তৈরি বর্জ্য, যেমন ইউরিয়া, দেহ থেকে বের করা। নিষ্কাশন হলো অপাচ্য খাদ্য মল হিসেবে বের করা, যা বিপাকে অংশ নেয়নি।
ইউরিয়া কোথায় তৈরি হয়?
যকৃতে। প্রোটিন ভাঙার ফলে তৈরি বিষাক্ত অ্যামোনিয়াকে যকৃৎ অরনিথিন চক্রের মাধ্যমে কম বিষাক্ত ইউরিয়ায় রূপান্তর করে। বৃক্ক শুধু তা রক্ত থেকে ছেঁকে বের করে।
একটি বৃক্ক নিয়ে কি বেঁচে থাকা যায়?
হ্যাঁ। একটি সুস্থ বৃক্ক দেহের প্রয়োজন মেটাতে যথেষ্ট, তাই জীবিত মানুষ একটি বৃক্ক দান করেও স্বাভাবিক জীবন কাটাতে পারেন।
উদ্ভিদের রেচন অঙ্গ নেই কেন?
উদ্ভিদের বিপাক ধীর, নাইট্রোজেনঘটিত বর্জ্য কম তৈরি হয় এবং অনেক যৌগ পুনরায় ব্যবহৃত হয়। বাকি বর্জ্য তারা পাতা, বাকল বা কোষগহ্বরে জমিয়ে রাখে।
প্রস্রাবের রং হলুদ কেন?
ইউরোক্রোম নামের রঞ্জকের কারণে। পানি কম খেলে মূত্র ঘন হয়, তাই রং গাঢ় হয়; বেশি পানি খেলে প্রায় স্বচ্ছ হয়।
আরও পড়ো
সূত্র: NCTB মাধ্যমিক জীববিজ্ঞান (নবম-দশম শ্রেণি), অষ্টম অধ্যায়: রেচন প্রক্রিয়া · NIDDK — Your Kidneys & How They Work · National Kidney Foundation — Dialysis