মহাবিশ্ব কত বড়? মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া হিসাব
· পড়তে ৮ মিনিট · ✓ তথ্য যাচাই করা
ছোট উত্তর · ১০ সেকেন্ডে
আমরা যতটুকু দেখতে পাই, সেই পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বের ব্যাস প্রায় ৯৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষ। মহাবিশ্বের বয়স ১৩.৮ বিলিয়ন বছর হলেও মহাকাশ প্রসারিত হওয়ায় দৃশ্যমান সীমা এত দূরে। এর মধ্যে আছে কয়েকশো বিলিয়ন থেকে দুই ট্রিলিয়ন ছায়াপথ। পুরো মহাবিশ্ব এর চেয়েও বড়, এমনকি অসীমও হতে পারে।
রাতে ছাদে উঠে আকাশের দিকে তাকালে মনে হয় তারাগুলো যেন খুব কাছে, হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। অথচ সবচেয়ে কাছের তারাটার আলোও আমাদের চোখে পৌঁছাতে চার বছরের বেশি সময় নেয়। তাহলে পুরো মহাবিশ্ব কত বড়? প্রশ্নটা সহজ শোনালেও উত্তরটা এমন সব সংখ্যায় গিয়ে ঠেকে, যা মাথায় ধরানোই কঠিন। চলো ধাপে ধাপে, পরিচিত জিনিস দিয়ে হিসাবটা বোঝার চেষ্টা করি।
সংক্ষেপে: মহাবিশ্ব কত বড়?
বিজ্ঞানীরা যতটুকু দেখতে পান, তাকে বলে পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্ব। এর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত দূরত্ব প্রায় ৯৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষ। মানে আলো, যা এক সেকেন্ডে প্রায় তিন লাখ কিলোমিটার যায়, তারও এই দূরত্ব পার হতে লাগবে ৯৩ বিলিয়ন বছর। আর এই দৃশ্যমান অংশের বাইরে আরও কত বড় মহাবিশ্ব আছে, কিংবা আদৌ এর কোনো শেষ আছে কি না, তা এখনো কেউ নিশ্চিত জানে না।
এখানে একটা ধাঁধা আছে। মহাবিশ্বের বয়স প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর। তাহলে আমরা ১৩.৮ বিলিয়ন আলোকবর্ষের বেশি দূরে দেখি কীভাবে? উত্তর হলো, মহাবিশ্ব নিজেই প্রসারিত হচ্ছে। বহু আগে যে আলো রওনা দিয়েছিল, তার পথ চলার সময়েই মাঝের জায়গাটা টেনে লম্বা হয়ে গেছে। ফলে সেই আলোর উৎস এখন আমাদের থেকে প্রায় ৪৬ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে। দুই দিক মিলিয়ে ব্যাস দাঁড়ায় প্রায় ৯৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষ।
আলোকবর্ষ জিনিসটা আসলে কী?
আলোকবর্ষ কোনো সময়ের মাপ নয়, এটা দূরত্বের মাপ। আলো এক বছরে যতটা পথ পাড়ি দেয়, সেটাই এক আলোকবর্ষ, প্রায় ৯.৫ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার। কিলোমিটারে মহাকাশ মাপতে গেলে এত শূন্য বসাতে হয় যে সংখ্যাগুলো অর্থহীন হয়ে পড়ে। তাই জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আলোর গতিকেই মাপকাঠি বানিয়েছেন।
একটা তুলনা দিই। আলো এক সেকেন্ডে পৃথিবীকে প্রায় সাড়ে সাতবার ঘুরে আসতে পারে। চাঁদ থেকে আলো আসে মাত্র এক সেকেন্ডের একটু বেশি সময়ে। সূর্য থেকে আসে প্রায় ৮ মিনিট ২০ সেকেন্ডে। অর্থাৎ এখন যে সূর্য তুমি দেখছ, সেটা আসলে প্রায় সোয়া আট মিনিট আগের সূর্য। মহাকাশের দিকে তাকানো মানেই অতীতের দিকে তাকানো।
সিঁড়ি বেয়ে বড় হওয়া: একের পর এক ধাপ
মহাবিশ্বের আকার বোঝার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো ছোট থেকে বড়র দিকে ধাপে ধাপে ওঠা। প্রতিটা ধাপ আগেরটার চেয়ে এত বড় যে আগের ধাপটা প্রায় বিন্দু হয়ে যায়।
- পৃথিবী: ব্যাস প্রায় ১২,৭০০ কিলোমিটার। একটা যাত্রীবাহী বিমানে টানা উড়লে চারপাশ একবার ঘুরতে লাগবে প্রায় দুই দিন।
- সূর্য: এর ভেতরে প্রায় তেরো লাখ পৃথিবী ঢুকে যাবে। আর সূর্য পৃথিবী থেকে প্রায় ১৫ কোটি কিলোমিটার দূরে।
- সৌরজগৎ: নেপচুন পর্যন্ত আলো যেতে লাগে প্রায় চার ঘণ্টা। সৌরজগতের বাইরের বরফের মেঘ পর্যন্ত ধরলে আলোর লাগবে এক বছরেরও বেশি।
- নিকটতম তারা: প্রক্সিমা সেন্টরি, প্রায় ৪.২৪ আলোকবর্ষ দূরে। মানে প্রায় ৪০ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার।
- আমাদের ছায়াপথ আকাশগঙ্গা: এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত প্রায় এক লাখ আলোকবর্ষ। এতে আছে প্রায় ১০০ থেকে ৪০০ বিলিয়ন তারা।
- প্রতিবেশী ছায়াপথ অ্যান্ড্রোমিডা: প্রায় ২৫ লাখ আলোকবর্ষ দূরে। অন্ধকার আকাশে খালি চোখে সহজে দেখা যায় এমন সবচেয়ে দূরের জিনিস এটাই।
- পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্ব: ব্যাস প্রায় ৯৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষ, যেখানে ছায়াপথের সংখ্যা কয়েকশো বিলিয়ন থেকে হয়তো দুই ট্রিলিয়ন পর্যন্ত।
জানেন কি?ট্যাপ করে দেখুন
মজার তথ্য: অ্যান্ড্রোমিডা ছায়াপথের যে আলো আজ রাতে তোমার চোখে পড়বে, সেটা রওনা দিয়েছিল প্রায় ২৫ লাখ বছর আগে, যখন পৃথিবীতে আধুনিক মানুষের জন্মই হয়নি।
যদি সূর্য হতো একটা কমলালেবু
সংখ্যাগুলো এত বড় যে মাথা আর কাজ করে না। তাই চলো সবকিছু ছোট করে আনি। ধরো, সূর্যকে আমরা ছোট করে একটা কমলালেবুর মাপে আনলাম, ব্যাস দশ সেন্টিমিটারের মতো। তাহলে পৃথিবী হবে মাত্র এক মিলিমিটারের একটা দানা, যেটা কমলা থেকে প্রায় এগারো মিটার দূরে ঘুরছে। মানে একটা মাঝারি ঘরের এক মাথায় কমলা, অন্য মাথায় বালুকণা।
এই মাপে নেপচুন থাকবে প্রায় সাড়ে তিনশো মিটার দূরে, মোটামুটি একটা বড় মাঠের ওপারে। আর সবচেয়ে কাছের তারা প্রক্সিমা সেন্টরি? সেটা পড়বে প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার দূরে। ঢাকায় কমলা রাখলে পরের তারাটা হবে অন্য কোনো দেশে। মাঝের পুরো জায়গাটা প্রায় পুরোপুরি ফাঁকা। মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় উপাদান আসলে শূন্যতা।
আর এই কমলা মাপেও আকাশগঙ্গা ছায়াপথ হবে পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্বের চেয়ে বহুগুণ বড়। পুরো পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্ব এই মাপেও কল্পনার বাইরে থেকে যায়।
দ্রুততম মহাকাশযানে চড়লে কত সময় লাগবে?
মানুষের পাঠানো সবচেয়ে দূরের যান ভয়েজার ১। এটা ১৯৭৭ সালে রওনা দিয়ে সেকেন্ডে প্রায় ১৭ কিলোমিটার বেগে ছুটছে, ঘণ্টায় ষাট হাজার কিলোমিটারের বেশি। এই গতিতে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে লাগবে পনেরো সেকেন্ডের মতো।
কিন্তু এই গতিতেও সবচেয়ে কাছের তারা প্রক্সিমা সেন্টরির সমান দূরত্ব পার হতে লাগবে প্রায় ৭৫ হাজার বছর। মানব সভ্যতার পুরো লিখিত ইতিহাস মাত্র পাঁচ হাজার বছরের মতো। আর আকাশগঙ্গার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত যেতে লাগবে প্রায় দুই বিলিয়ন বছর। পৃথিবীর বয়সের প্রায় অর্ধেক।
জানেন কি?ট্যাপ করে দেখুন
ভাবো তো: আলোর গতিতে চললেও আকাশগঙ্গা পার হতে এক লাখ বছর লাগবে। আর পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বের সবচেয়ে দূরের ছায়াপথগুলো এত দ্রুত সরে যাচ্ছে যে আজ রওনা দিলে আলোও কোনোদিন সেখানে পৌঁছাবে না।
কত তারা, কত ছায়াপথ?
হাবল আর জেমস ওয়েব দুরবিন আকাশের ছোট ছোট অন্ধকার টুকরোর দিকে দীর্ঘ সময় তাকিয়ে থেকেছে। দেখা গেছে, একদম ফাঁকা মনে হওয়া একটা ছোট বিন্দুতেও লুকিয়ে আছে হাজার হাজার ছায়াপথ। এখান থেকে হিসাব কষে বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন, পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বে ছায়াপথ আছে কয়েকশো বিলিয়ন থেকে দুই ট্রিলিয়ন পর্যন্ত। সংখ্যাটা পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে বদলায়।
প্রতিটা ছায়াপথে গড়ে কোটি কোটি তারা। সব মিলিয়ে তারার সংখ্যা দাঁড়ায় এক-এর পর বাইশ থেকে চব্বিশটা শূন্য বসালে যত হয়, ততটা। প্রায়ই বলা হয়, পৃথিবীর সব সৈকতের সব বালুকণার চেয়ে আকাশে তারার সংখ্যা বেশি। এটা মোটা দাগের তুলনা, তবে মাত্রা বোঝাতে বেশ কাজের।
দূরে তাকানো মানে অতীতে তাকানো
আলোর একটা গতি আছে বলে আমরা কোনো কিছুই ঠিক এই মুহূর্তের অবস্থায় দেখি না। পাশের মানুষটাকেও দেখি এক সেকেন্ডের কোটি ভাগের এক ভাগ আগের অবস্থায়। দূরত্ব যত বাড়ে, এই দেরিও তত বাড়ে। রাতের আকাশের কোনো কোনো তারার আলো রওনা দিয়েছিল শত শত বা হাজার হাজার বছর আগে। এর মধ্যে কোনো তারা হয়তো নিভেও গেছে, আমরা কেবল তার পুরোনো আলো দেখছি।
এই কারণেই বড় দুরবিনগুলো আসলে একেকটা সময়যন্ত্র। জেমস ওয়েব দুরবিন এমন ছায়াপথের আলো ধরেছে, যেগুলো মহাবিশ্বের জন্মের মাত্র কয়েকশো মিলিয়ন বছর পরের। তারও পেছনে আছে মহাবিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো আলো, যাকে বলে মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ। বিগ ব্যাংয়ের প্রায় তিন লাখ আশি হাজার বছর পর মহাবিশ্ব যখন প্রথম স্বচ্ছ হলো, তখন এই আলো ছাড়া পেয়েছিল। আজ সেটা চারদিক থেকে মৃদু মাইক্রোওয়েভ তরঙ্গ হয়ে আমাদের কাছে আসে। পুরোনো দিনের অ্যানালগ টিভির ঝিরঝির পর্দার খুব ছোট একটা অংশ ছিল এই আদি আলো। এর চেয়ে পেছনে আলো দিয়ে আর দেখা সম্ভব নয়, তাই এটাই আমাদের দেখার শেষ দেয়াল।
মানে মহাবিশ্বের মানচিত্র আসলে একসাথে একটা ইতিহাস বইও। যত দূরে তাকাই, তত পুরোনো পাতা পড়ি। কাছের ছায়াপথগুলো দেখায় পরিণত চেহারা, আর সবচেয়ে দূরেরগুলো দেখায় শিশু অবস্থা, ছোট, এলোমেলো আর তারা জন্মের উৎসবে ভরা।
মহাবিশ্বের কি কোনো শেষ আছে?
এখানে এসে বিজ্ঞান সবচেয়ে সৎ উত্তরটা দেয়: আমরা জানি না। পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বের একটা সীমা আছে, কারণ তার বাইরে থেকে আলো এখনো আমাদের কাছে পৌঁছানোর সময় পায়নি। কিন্তু সেই সীমা মহাবিশ্বের দেয়াল নয়, এটা শুধু আমাদের দেখার দিগন্ত। সমুদ্রে জাহাজ থেকে দিগন্ত দেখা গেলেও সমুদ্র সেখানে শেষ হয় না।
বিভিন্ন পরিমাপ দেখায়, বড় মাপে মহাকাশ প্রায় সমতল। এর মানে হতে পারে মহাবিশ্ব অসীম, আবার হতে পারে এটা এত বিশাল যে আমাদের দেখা অংশটা তার তুলনায় নগণ্য। কিছু হিসাব বলে, পুরো মহাবিশ্ব দৃশ্যমান অংশের চেয়ে অন্তত কয়েকশো গুণ বড় হতে পারে।
আরেকটা প্রচলিত ভুল ধারণা হলো, বিগ ব্যাং একটা বিন্দুতে বিস্ফোরণ, আর মহাবিশ্ব কোনো ফাঁকা জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছে। আসলে মহাবিশ্বের কোনো কেন্দ্র নেই, বাইরেও কিছু নেই যার ভেতরে এটা বাড়ছে। মহাকাশ নিজেই সব জায়গায় একসাথে প্রসারিত হচ্ছে, ঠিক যেমন ফোলানো বেলুনের গায়ে আঁকা প্রতিটা বিন্দু একে অন্যের থেকে দূরে সরে যায়।
এত বিশালতার সামনে আমরা
এসব হিসাব শুনে নিজেকে খুব ছোট মনে হতেই পারে। কিন্তু উল্টো দিকটাও ভাবো। এই অকল্পনীয় বিশাল মহাবিশ্বের এক কোণে, একটা মাঝারি তারার চারপাশে ঘোরা ছোট্ট এক গ্রহে বসে মানুষ মেপে ফেলেছে মহাবিশ্বের বয়স, আকার আর গঠন। আমাদের শরীরের ক্যালসিয়াম, রক্তের লোহা তৈরি হয়েছিল বহু আগে মরে যাওয়া তারার ভেতরে। মহাবিশ্ব বিশাল, আর আমরা সেই মহাবিশ্বেরই একটা অংশ, যে নিজেকে বুঝতে শিখেছে।
নিজে দেখুন
নিজে দেখো: শহরের আলো থেকে দূরে, চাঁদহীন কোনো রাতে আকাশের দিকে তাকাও। শরৎ-হেমন্তের রাতে উত্তর-পূর্ব আকাশে একটা ঝাপসা আলোর দাগ খুঁজে দেখো, সেটাই হতে পারে অ্যান্ড্রোমিডা ছায়াপথ। মনে রেখো, তুমি দেখছ ২৫ লাখ বছর আগের আলো!
ছোট্ট যাচাই
কতটা মনে আছে, দেখে নিন
১. সূর্যের আলো আমাদের কাছে পৌঁছাতে প্রায় কত সময় লাগে?
২. আলোকবর্ষ কীসের একক?
তথ্যসূত্র
কৃতজ্ঞতা
- তথ্য যাচাই: ১ নভেম্বর, ২০২৬