মাধ্যাকর্ষণ শক্তি কী? আপেল থেকে ব্ল্যাক হোল
· পড়তে ৭ মিনিট · ✓ তথ্য যাচাই করা
ছোট উত্তর · ১০ সেকেন্ডে
মাধ্যাকর্ষণ হলো ভরযুক্ত সব বস্তুর একে অপরকে টানার প্রবণতা। ভর যত বেশি, টান তত শক্তিশালী, আর দূরত্ব বাড়লে টান দ্রুত কমে। নিউটন একে বল হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, আর আইনস্টাইন দেখান ভর আসলে স্থান-কালকে বাঁকিয়ে দেয়। এই একই শক্তি আপেল নামায়, চাঁদ ঘোরায়, ব্ল্যাক হোল বানায়।
হাত থেকে চায়ের কাপ পড়ে গেলে সেটা সবসময় নিচেই যায়, কখনো ছাদের দিকে উড়ে যায় না। বৃষ্টির ফোঁটা মাটিতে নামে, নদীর পানি ঢাল বেয়ে সাগরে যায়, আর আমরা লাফ দিলে কয়েক মুহূর্ত পরেই আবার মাটিতে ফিরে আসি। এত পরিচিত ঘটনা যে আমরা ভাবিই না, এর পেছনে আছে মহাবিশ্বের সবচেয়ে বিস্তৃত একটা শক্তি। এই একই শক্তি চাঁদকে পৃথিবীর চারপাশে ঘোরায়, পৃথিবীকে সূর্যের চারপাশে রাখে, আর ব্ল্যাক হোলের ভেতর থেকে আলোকেও বের হতে দেয় না। চলো দেখি, মাধ্যাকর্ষণ আসলে কী।
সংক্ষেপে: মাধ্যাকর্ষণ কী?
যার ভর আছে, সে অন্য ভরকে নিজের দিকে টানে। এই টানই মাধ্যাকর্ষণ বা অভিকর্ষ। তুমি, আমি, একটা পাথর, একটা গ্রহ, সবাই সবাইকে টানছি। কিন্তু টানটা ভরের ওপর নির্ভর করে, তাই আমাদের মতো ছোট বস্তুর টান এত দুর্বল যে টেরই পাওয়া যায় না। পৃথিবীর ভর বিশাল, প্রায় ৬০০ কোটি কোটি কোটি কিলোগ্রাম (৬ এর পরে ২৪টি শূন্য), তাই তার টান আমরা প্রতি মুহূর্তে অনুভব করি। সেটাকেই আমরা বলি ওজন।
দূরত্বও বড় ব্যাপার। দুটো বস্তু যত দূরে যায়, টান তত দ্রুত কমে। দূরত্ব দ্বিগুণ হলে টান হয়ে যায় চার ভাগের এক ভাগ, তিনগুণ হলে নয় ভাগের এক ভাগ। এই নিয়মকে বলে ব্যস্তবর্গ সূত্র। এ কারণেই চাঁদের টান পৃথিবীতে আমাদের শরীরে প্রায় টের পাওয়া যায় না, কিন্তু সাগরের বিশাল পানিতে জোয়ার-ভাটা ঠিকই তৈরি করে।
আপেল আর নিউটনের প্রশ্ন
গল্পটা সবার জানা: সতেরো শতকে ইংল্যান্ডে আইজ্যাক নিউটন গাছ থেকে আপেল পড়তে দেখে মাধ্যাকর্ষণের কথা ভাবেন। আপেল মাথায় পড়েছিল কি না, তার কোনো প্রমাণ নেই, ওটা সম্ভবত পরে যোগ হওয়া রং। তবে নিউটন নিজেই বৃদ্ধ বয়সে বলেছিলেন, আপেল পড়া দেখে তাঁর মনে প্রশ্ন জেগেছিল। আসল চমক ছিল প্রশ্নটায়: যে টান আপেলকে মাটিতে নামায়, সেটাই কি অনেক দূরে চাঁদ পর্যন্ত পৌঁছায়?
নিউটনের উত্তর ছিল, হ্যাঁ। চাঁদও আসলে পড়ছে। শুধু সে পাশের দিকে এত দ্রুত ছুটছে যে পড়তে পড়তে পৃথিবীকে ঘিরে ঘুরে যায়, কখনো মাটিতে পৌঁছায় না। ভাবো, পাহাড়ের চূড়া থেকে একটা কামান দাগলে গোলা কিছুদূর গিয়ে পড়ে। আরো জোরে দাগলে আরো দূরে। যথেষ্ট জোরে দাগলে গোলা পৃথিবীর বাঁকের সাথে তাল মিলিয়ে পড়তেই থাকবে, কিন্তু মাটি ছোঁবে না। এটাই কক্ষপথ। ১৬৮৭ সালে প্রকাশিত বইয়ে নিউটন দেখালেন, একটাই সূত্র দিয়ে আপেলের পড়া, চাঁদের ঘোরা আর গ্রহদের পথ সব ব্যাখ্যা করা যায়। আকাশ আর মাটির নিয়ম যে একই, মানুষ সেটা প্রথম পরিষ্কারভাবে বুঝল।
জানেন কি?ট্যাপ করে দেখুন
মজার তথ্য: মহাকাশ স্টেশনে নভোচারীরা ভাসেন, কিন্তু সেখানে মাধ্যাকর্ষণ নেই এমন নয়। প্রায় ৪০০ কিলোমিটার উপরে পৃথিবীর টান মাটির টানের প্রায় ৯০ শতাংশ। তাঁরা ভাসেন কারণ পুরো স্টেশনসহ তাঁরা একসাথে অবিরাম পড়ছেন, ঠিক নিউটনের কামানের গোলার মতো।
ভারী জিনিস কি আগে পড়ে?
প্রায় দুই হাজার বছর মানুষ বিশ্বাস করত, ভারী জিনিস হালকা জিনিসের চেয়ে দ্রুত পড়ে। পালক আর পাথর একসাথে ফেললে পাথর আগে পড়ে, তাই কথাটা ঠিকই মনে হতো। কিন্তু ইতালির গ্যালিলিও গ্যালিলেই ষোল-সতেরো শতকে ঢালু তলে বল গড়িয়ে পরীক্ষা করে দেখালেন, বাতাসের বাধা না থাকলে সব বস্তু একই হারে গতি বাড়িয়ে পড়ে। পালক ধীরে পড়ে শুধু বাতাসের কারণে।
১৯৭১ সালে চাঁদে, যেখানে বাতাস নেই, অ্যাপোলো ১৫-এর নভোচারী ডেভিড স্কট এক হাতে একটা হাতুড়ি আর অন্য হাতে একটা পালক নিয়ে একসাথে ছেড়ে দেন। দুটোই একসাথে চাঁদের মাটিতে পড়ে। পৃথিবীতে বাতাস না থাকলে যেকোনো বস্তু প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৯.৮ মিটার প্রতি সেকেন্ড করে গতি বাড়ায়। চাঁদে এই হার প্রায় ছয় ভাগের এক ভাগ, তাই সেখানে তোমার ওজনও হতো ছয় ভাগের এক ভাগ।
আইনস্টাইন: টান নয়, বাঁকা স্থান-কাল
নিউটনের সূত্র দারুণ কাজ করে, আজও রকেট পাঠাতে তা ব্যবহার হয়। কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তর তাতে ছিল না: এত দূর থেকে সূর্য পৃথিবীকে টানে কীভাবে, মাঝে তো কোনো দড়ি নেই? ১৯১৫ সালে আলবার্ট আইনস্টাইন সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব দিয়ে নতুন ছবি আঁকলেন। তাঁর মতে, ভর তার চারপাশের স্থান আর সময়কে বাঁকিয়ে দেয়। বস্তুরা সেই বাঁকা পথ ধরে চলে, আর আমাদের কাছে মনে হয় যেন টান কাজ করছে।
একটা টানটান চাদরের মাঝখানে ভারী বল রাখলে চাদর দেবে যায়। এবার পাশ দিয়ে একটা মার্বেল গড়িয়ে দিলে সেটা ওই গর্তের দিকে বেঁকে যাবে, যেন বলটা তাকে টানছে। উপমাটা পুরো নিখুঁত নয়, কিন্তু মূল ভাবটা বোঝায়। আইনস্টাইনের তত্ত্বের অদ্ভুত একটা ভবিষ্যদ্বাণী ছিল, ভারী বস্তুর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আলোও বেঁকে যাবে। ১৯১৯ সালের সূর্যগ্রহণে বিজ্ঞানীরা দেখলেন, সূর্যের পাশের তারাগুলোর অবস্থান ঠিক ততটাই সরে গেছে যতটা তত্ত্ব বলেছিল।
আরো অবাক করা ব্যাপার, মাধ্যাকর্ষণ সময়কেও ধীর করে। শক্ত টানের জায়গায় ঘড়ি সামান্য ধীরে চলে। পার্থক্যটা এত ছোট যে দৈনন্দিন জীবনে টের পাই না, কিন্তু উপগ্রহে থাকা ঘড়িগুলো মাটির ঘড়ির চেয়ে প্রতিদিন কয়েক মাইক্রোসেকেন্ড আগে চলে। এই হিসাব সংশোধন না করলে মোবাইলের জিপিএস প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার ভুল দেখাত।
মাধ্যাকর্ষণ আমাদের চারপাশে কী করে
- জোয়ার-ভাটা: চাঁদ আর সূর্যের টান সাগরের পানিকে দুই দিকে ফুলিয়ে তোলে, তাই উপকূলে দিনে সাধারণত দুবার জোয়ার আসে।
- গোল গ্রহ ও তারা: যথেষ্ট বড় বস্তুকে তার নিজের মাধ্যাকর্ষণ সব দিক থেকে সমানভাবে টেনে প্রায় গোল বানিয়ে ফেলে।
- বায়ুমণ্ডল: পৃথিবীর টান না থাকলে আমাদের নিঃশ্বাসের বাতাস মহাশূন্যে ছড়িয়ে যেত।
- তারার জন্ম: মহাশূন্যের গ্যাস আর ধুলার মেঘ নিজের টানে গুটিয়ে ঘন ও গরম হয়, একসময় জ্বলে ওঠে নতুন তারা।
- শরীরের গঠন: আমাদের হাড়, পেশি আর রক্তসঞ্চালন পৃথিবীর টানের সাথে মানিয়ে তৈরি। দীর্ঘদিন মহাকাশে থাকলে নভোচারীদের হাড় ও পেশি দুর্বল হতে থাকে।
পৃথিবীর সব জায়গায় টান হুবহু এক নয়। পৃথিবী পুরো গোল নয়, বিষুবরেখার কাছে একটু ফোলা, আর নিজের অক্ষে ঘোরার কারণেও সেখানে টান সামান্য কম লাগে। তাই মেরু অঞ্চলে একজন মানুষের ওজন বিষুবরেখার চেয়ে প্রায় আধা শতাংশ বেশি মাপা যায়। উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় কেন্দ্র থেকে দূরত্ব বাড়ে বলে টানও একটু কমে। পার্থক্যগুলো ছোট, কিন্তু খুব সূক্ষ্ম যন্ত্রে ধরা পড়ে, আর বিজ্ঞানীরা এভাবে মাটির নিচের পাথর, বরফ আর পানির পরিমাণও মাপতে পারেন।
ব্ল্যাক হোল: যেখানে আলোও হার মানে
পৃথিবী থেকে মহাকাশে যেতে হলে রকেটকে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১১.২ কিলোমিটার বেগে ছুটতে হয়, একে বলে মুক্তিবেগ। বস্তু যত ভারী আর ঘন, মুক্তিবেগ তত বেশি। এখন ভাবো, সূর্যের চেয়ে অনেক গুণ ভারী একটা তারা জীবনের শেষে জ্বালানি ফুরিয়ে নিজের ভারে ভেঙে পড়ল, আর এত ছোট জায়গায় গুটিয়ে গেল যে মুক্তিবেগ আলোর বেগকেও ছাড়িয়ে গেল। আলো প্রতি সেকেন্ডে প্রায় তিন লাখ কিলোমিটার যায়, আর কিছুই এর চেয়ে দ্রুত যেতে পারে না। তাই সেখান থেকে কিছুই বের হতে পারে না। এটাই ব্ল্যাক হোল।
ব্ল্যাক হোলের চারপাশে একটা অদৃশ্য সীমা আছে, নাম ঘটনা দিগন্ত। এর ভেতরে একবার কিছু ঢুকলে আর ফেরার পথ নেই। ব্ল্যাক হোল নিজে আলো ছাড়ে না, তাহলে আমরা জানি কীভাবে? এর চারপাশে ঘুরতে থাকা গ্যাস প্রচণ্ড গরম হয়ে উজ্জ্বল আলো ছড়ায়, আর কাছের তারারা অদৃশ্য কিছুকে ঘিরে দ্রুত ঘোরে। আমাদের ছায়াপথের কেন্দ্রে এমন তারাদের ঘোরা দেখে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন, সেখানে সূর্যের প্রায় চল্লিশ লাখ গুণ ভারী একটা ব্ল্যাক হোল আছে। এই আবিষ্কারের জন্য ২০২০ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়।
জানেন কি?ট্যাপ করে দেখুন
মজার তথ্য: ২০১৫ সালে বিজ্ঞানীরা প্রথমবার মহাকর্ষ তরঙ্গ সরাসরি ধরতে পারেন। প্রায় ১৩০ কোটি বছর আগে দুটো ব্ল্যাক হোলের মিলনে স্থান-কালে যে কাঁপন উঠেছিল, তা পৃথিবীতে এসে যন্ত্রের চার কিলোমিটার লম্বা বাহুকে একটা প্রোটনের চেয়েও হাজার গুণ কম দূরত্ব বদলে দিয়েছিল। আইনস্টাইন এই তরঙ্গের কথা প্রায় একশো বছর আগেই বলে গিয়েছিলেন।
ব্ল্যাক হোল কি সবকিছু শুষে নেয়, ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের মতো? না, এটা একটা প্রচলিত ভুল ধারণা। দূর থেকে ব্ল্যাক হোলের টান একই ভরের যেকোনো তারার মতোই। সূর্যকে হঠাৎ একই ভরের ব্ল্যাক হোল দিয়ে বদলে দিলে পৃথিবী অন্ধকার আর ঠান্ডা হয়ে যেত, কিন্তু কক্ষপথ একই থাকত। বিপদ শুধু খুব কাছে গেলে।
এখনো যে রহস্য বাকি
প্রকৃতির চারটি মৌলিক বলের মধ্যে মাধ্যাকর্ষণ সবচেয়ে দুর্বল। একটা ছোট চুম্বক টেবিল থেকে আলপিন তুলে নিতে পারে, অথচ পুরো পৃথিবী নিচ থেকে সেটাকে টানছে। তবু বড় পরিসরে মাধ্যাকর্ষণই রাজা, কারণ এটা কখনো বাতিল হয় না, শুধু যোগ হতে থাকে। সমস্যা হলো, খুব ছোট কণার জগৎ ব্যাখ্যা করে কোয়ান্টাম বলবিদ্যা, আর বড় জগৎ ব্যাখ্যা করে আইনস্টাইনের তত্ত্ব, কিন্তু দুটোকে এক সূত্রে বাঁধা যায়নি। ব্ল্যাক হোলের কেন্দ্রে বা মহাবিশ্বের একেবারে শুরুতে ঠিক কী ঘটে, সেই প্রশ্নের পুরো উত্তর এখনো কারো জানা নেই। আপেল থেকে শুরু হওয়া প্রশ্নটা তাই আজও চলছে।
নিজে দেখুন
নিজে দেখো: একটা বই আর একটা কাগজ একসাথে একই উচ্চতা থেকে ছাড়ো, কাগজ পিছিয়ে পড়বে। এবার কাগজটা বইয়ের ঠিক ওপরে রেখে দুটো একসাথে ছাড়ো। বাতাসের বাধা সরে গেলে কাগজ বইয়ের সাথে একই তালে পড়বে, ঠিক গ্যালিলিও যেমন বলেছিলেন!
ছোট্ট যাচাই
কতটা মনে আছে, দেখে নিন
১. চাঁদে হাতুড়ি আর পালক একসাথে ছেড়ে দিলে কী ঘটেছিল?
২. মহাকাশ স্টেশনে নভোচারীরা ভাসেন কেন?
তথ্যসূত্র
কৃতজ্ঞতা
- তথ্য যাচাই: ১ নভেম্বর, ২০২৬