সৌরজগতের গ্রহ কয়টি? প্রতিটির অদ্ভুত পরিচয়
· পড়তে ৮ মিনিট · ✓ তথ্য যাচাই করা
ছোট উত্তর · ১০ সেকেন্ডে
আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ইউনিয়নের সংজ্ঞা অনুযায়ী সৌরজগতে গ্রহ আটটি: বুধ, শুক্র, পৃথিবী, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুন। প্রথম চারটি পাথুরে, পরের চারটি গ্যাস বা বরফের দানব। ২০০৬ সালে প্লুটোকে বামন গ্রহ ঘোষণা করা হয়, কারণ সে নিজের কক্ষপথ পরিষ্কার করতে পারে না।
ছোটবেলায় মুখস্থ করেছিলে: সৌরজগতে নয়টি গ্রহ। তারপর একদিন খবর এল, প্লুটো আর গ্রহ নয়। তাহলে এখন সংখ্যাটা কত? আর এই গ্রহগুলো আসলে কেমন জায়গা? বইয়ের তালিকা পেরিয়ে চলো দেখি, প্রতিটি গ্রহের এমন কোন অদ্ভুত পরিচয় আছে যা শুনলে মনে হবে বিজ্ঞান কল্পকাহিনির চেয়েও আজব।
সংক্ষেপে: সৌরজগতে গ্রহ কয়টি?
আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ইউনিয়নের (IAU) সংজ্ঞা অনুযায়ী সৌরজগতে গ্রহ আটটি। সূর্য থেকে ক্রমানুসারে: বুধ, শুক্র, পৃথিবী, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস আর নেপচুন। প্রথম চারটি পাথুরে গ্রহ, শক্ত মাটি আছে। পরের চারটি দানব গ্রহ, যাদের বেশিরভাগটাই গ্যাস বা বরফজাতীয় পদার্থ।
প্লুটো কেন বাদ পড়ল?
২০০৬ সালে IAU প্রথমবার গ্রহের একটা স্পষ্ট সংজ্ঞা ঠিক করে। কোনো বস্তুকে গ্রহ হতে হলে তিনটি শর্ত মানতে হবে।
- সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরতে হবে।
- নিজের মাধ্যাকর্ষণে প্রায় গোল আকার নিতে পারার মতো যথেষ্ট ভারী হতে হবে।
- নিজের কক্ষপথের আশপাশ থেকে অন্য ছোট বস্তুগুলোকে সরিয়ে বা টেনে নিয়ে পথ পরিষ্কার করে ফেলতে হবে।
প্লুটো প্রথম দুটি শর্ত মানে, কিন্তু তৃতীয়টি পারে না। সে ঘোরে কাইপার বেল্ট নামের এক বরফপাথরের ভিড়ের মধ্যে, যেখানে তার মতো আরও অনেক বস্তু আছে। তাই প্লুটোকে এখন বলা হয় 'বামন গ্রহ'। মজার ব্যাপার, প্লুটো আকারে আমাদের চাঁদের চেয়েও ছোট।
জানেন কি?ট্যাপ করে দেখুন
মজার তথ্য: প্লুটো আবিষ্কারের পর থেকে বাদ পড়া পর্যন্ত, প্রায় ৭৬ বছরে, সে সূর্যকে একবারও পুরো ঘুরে আসতে পারেনি। তার এক বছর পৃথিবীর প্রায় ২৪৮ বছরের সমান।
বুধ: সবচেয়ে কাছে, তবু সবচেয়ে গরম নয়
বুধ সূর্যের সবচেয়ে কাছের আর সবচেয়ে ছোট গ্রহ। সে সূর্যকে মাত্র ৮৮ দিনে এক পাক ঘোরে, অথচ নিজের অক্ষে এত ধীরে ঘোরে যে সেখানে এক সূর্যোদয় থেকে পরের সূর্যোদয় পর্যন্ত সময় লাগে পৃথিবীর প্রায় ১৭৬ দিন। মানে বুধের একটা 'দিন' তার দুটো 'বছরের' সমান!
বুধের প্রায় কোনো বায়ুমণ্ডল নেই, তাই তাপ ধরে রাখতে পারে না। দিনের দিকে তাপমাত্রা ৪৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়, আর রাতের দিকে নেমে যায় মাইনাস ১৮০ ডিগ্রির নিচে। আরও অদ্ভুত, সূর্যের এত কাছে থেকেও তার মেরুর কিছু গভীর গর্তে চিরছায়ায় জমে আছে বরফ।
শুক্র: পৃথিবীর যমজ, কিন্তু নরকের মতো
আকার আর ওজনে শুক্র প্রায় পৃথিবীর মতো, তাই একে পৃথিবীর যমজ বলা হয়। কিন্তু মিল ওখানেই শেষ। শুক্রের ঘন বায়ুমণ্ডল প্রায় পুরোটাই কার্বন ডাই-অক্সাইড, যা কম্বলের মতো তাপ আটকে রাখে। ফলে শুক্রের মাটির তাপমাত্রা প্রায় ৪৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, সীসা গলে যাওয়ার মতো গরম। বুধ সূর্যের বেশি কাছে হলেও সবচেয়ে গরম গ্রহ আসলে শুক্র।
শুক্রের মাটিতে বাতাসের চাপ পৃথিবীর প্রায় ৯০ গুণ, যা সমুদ্রের প্রায় এক কিলোমিটার গভীরে থাকার মতো। তার আকাশ ঢাকা সালফিউরিক অ্যাসিডের মেঘে। আর সে ঘোরে উল্টো দিকে। তাই শুক্রে দাঁড়াতে পারলে দেখতে, সূর্য ওঠে পশ্চিমে আর অস্ত যায় পূর্বে। তার নিজের অক্ষে এক পাক ঘুরতে লাগে প্রায় ২৪৩ দিন, যা তার বছরের (২২৫ দিন) চেয়েও লম্বা।
পৃথিবী: একমাত্র ঠিকানা যেখানে জীবন জানা আছে
পৃথিবীকে সাধারণ মনে হতে পারে, কিন্তু সৌরজগতে সে সত্যিই অনন্য। এটাই একমাত্র গ্রহ যার উপরিতলে তরল পানির সাগর আছে, আর যেখানে জীবনের অস্তিত্ব নিশ্চিতভাবে জানা। পাথুরে গ্রহগুলোর মধ্যে পৃথিবীই সবচেয়ে ঘন, কারণ তার কেন্দ্রে আছে লোহা আর নিকেলের বিশাল গোলক। এই গলিত লোহার নড়াচড়া তৈরি করে চৌম্বকক্ষেত্র, যা সূর্যের ক্ষতিকর কণার ঝড় থেকে আমাদের ঢালের মতো রক্ষা করে। মেরুর আকাশে যে রঙিন আলো, অরোরা, সেটা সেই ঢালে কণার ধাক্কা খাওয়ারই দৃশ্য।
মঙ্গল: লাল মরুভূমি আর দানব আগ্নেয়গিরি
মঙ্গল লাল দেখায় কারণ তার মাটি আর ধুলোয় প্রচুর আয়রন অক্সাইড, সহজ কথায় মরিচা। এখানে আছে সৌরজগতের সবচেয়ে উঁচু আগ্নেয়গিরি অলিম্পাস মন্স, যার উচ্চতা প্রায় ২২ কিলোমিটার, এভারেস্টের প্রায় আড়াই গুণ। আর আছে ভ্যালেস মেরিনেরিস নামের এক গিরিখাত, যা প্রায় চার হাজার কিলোমিটার লম্বা।
মঙ্গলের পাতলা বাতাসে ভেসে থাকা মিহি লাল ধুলোর কারণে সেখানে দিনের বেলা আকাশ লালচে-বাদামি, কিন্তু সূর্যাস্তের সময় সূর্যের চারপাশ দেখায় নীলচে। ঠিক পৃথিবীর উল্টো! বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন, কোটি কোটি বছর আগে মঙ্গলে নদী আর হ্রদ ছিল। আজ সেই পানির বড় অংশ মেরুর বরফে আর মাটির নিচে জমে আছে।
বৃহস্পতি: গ্রহদের রাজা
বৃহস্পতি এত বড় যে বাকি সব গ্রহকে একসাথে মেলালেও তার ওজনের অর্ধেকও হবে না। তার ভেতরে এক হাজারের বেশি পৃথিবী অনায়াসে এঁটে যেত। বৃহস্পতির কোনো শক্ত মাটি নেই, সে মূলত হাইড্রোজেন আর হিলিয়াম গ্যাসের বিশাল গোলা।
তার গায়ের বিখ্যাত 'গ্রেট রেড স্পট' আসলে একটা ঘূর্ণিঝড়, যা অন্তত কয়েকশো বছর ধরে চলছে এবং আকারে পৃথিবীর চেয়েও বড়। এত বিশাল হয়েও বৃহস্পতি সবচেয়ে দ্রুত ঘোরে, তার একটা দিন মাত্র দশ ঘণ্টার মতো। তার চাঁদ গ্যানিমিড সৌরজগতের সবচেয়ে বড় উপগ্রহ, আকারে বুধ গ্রহের চেয়েও বড়।
জানেন কি?ট্যাপ করে দেখুন
অদ্ভুত তথ্য: বৃহস্পতির চাঁদ ইউরোপার বরফের খোলসের নিচে এমন এক লোনা সাগর আছে বলে মনে করা হয়, যাতে পৃথিবীর সব সাগরের চেয়েও বেশি পানি থাকতে পারে।
শনি: পানিতে ভাসতে পারত যে গ্রহ
শনির আংটিগুলো সৌরজগতের সবচেয়ে চেনা দৃশ্য। এগুলো আসলে কোটি কোটি বরফ আর পাথরের টুকরো, কোনোটা ধুলোর কণার মতো ছোট, কোনোটা বাড়ির মতো বড়। আংটিগুলো কয়েক লক্ষ কিলোমিটার জুড়ে ছড়ানো হলেও বেশিরভাগ জায়গায় পুরুত্ব মাত্র কয়েক দশ মিটার, অর্থাৎ বিশাল কিন্তু অবিশ্বাস্য পাতলা।
শনির গড় ঘনত্ব পানির চেয়েও কম। তাই কল্পনায় যদি এত বড় একটা বাথটাব বানানো যেত, শনি তাতে ভেসে থাকত। তার উত্তর মেরুতে আছে ছয় কোনা এক রহস্যময় মেঘের নকশা, যা প্রথম দেখে বিজ্ঞানীরাও অবাক হয়েছিলেন। আর তার চাঁদ টাইটান সৌরজগতের একমাত্র উপগ্রহ যার ঘন বায়ুমণ্ডল আছে এবং যার উপরিতলে তরল মিথেনের হ্রদ রয়েছে।
ইউরেনাস: কাত হয়ে গড়িয়ে চলা গ্রহ
ইউরেনাসের অক্ষ প্রায় ৯৮ ডিগ্রি হেলানো। মানে বাকি গ্রহরা লাটিমের মতো ঘোরে, আর ইউরেনাস যেন বলের মতো পাশ ফিরে গড়িয়ে চলে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, অনেক আগে পৃথিবীর মতো বড় কোনো বস্তুর সাথে প্রচণ্ড ধাক্কায় সে এভাবে কাত হয়ে গেছে।
এই কাত হওয়ার ফল ভয়ংকর: ইউরেনাসের এক বছর পৃথিবীর প্রায় ৮৪ বছরের সমান, আর তার একেকটা মেরু টানা প্রায় ৪২ বছর সূর্যের আলো পায়, তারপর ৪২ বছর থাকে অন্ধকারে। তার নীলচে-সবুজ রং আসে বায়ুমণ্ডলের মিথেন গ্যাস থেকে, যা লাল আলো শুষে নেয়। ইউরেনাস টেলিস্কোপ দিয়ে আবিষ্কৃত প্রথম গ্রহ, ১৭৮১ সালে তাকে প্রথম গ্রহ হিসেবে চেনা যায়।
নেপচুন: অঙ্ক কষে খুঁজে পাওয়া গ্রহ
নেপচুন একমাত্র গ্রহ যাকে চোখে দেখার আগে অঙ্ক কষে খুঁজে পাওয়া গেছে। ইউরেনাসের চলার পথে অদ্ভুত টান দেখে গণিতবিদরা হিসাব করেন, আরও দূরে নিশ্চয়ই কোনো অজানা গ্রহ আছে। ১৮৪৬ সালে সেই হিসাবের জায়গার কাছেই নেপচুন পাওয়া যায়।
সূর্য থেকে সবচেয়ে দূরের এই গ্রহে বয়ে যায় সৌরজগতের সবচেয়ে জোরালো বাতাস, ঘণ্টায় দুই হাজার কিলোমিটারের বেশি, শব্দের গতির চেয়েও দ্রুত। আবিষ্কারের পর নেপচুন সূর্যকে প্রথমবার পুরো এক পাক ঘুরে আসে ২০১১ সালে, কারণ তার এক বছর পৃথিবীর প্রায় ১৬৫ বছর। তার বড় চাঁদ ট্রাইটন ঘোরে উল্টো দিকে, যা থেকে মনে হয় সে হয়তো বাইরে থেকে এসে নেপচুনের টানে ধরা পড়েছে।
একনজরে আটটি গ্রহের সবচেয়ে অদ্ভুত পরিচয়
- বুধ: একটা দিন দুটো বছরের চেয়েও লম্বা।
- শুক্র: সবচেয়ে গরম গ্রহ, সূর্য ওঠে পশ্চিমে।
- পৃথিবী: একমাত্র জানা গ্রহ যেখানে জীবন আর উপরিতলে তরল পানির সাগর আছে।
- মঙ্গল: এভারেস্টের প্রায় আড়াই গুণ উঁচু আগ্নেয়গিরি, নীল সূর্যাস্ত।
- বৃহস্পতি: পৃথিবীর চেয়ে বড় এক শতাব্দীপ্রাচীন ঘূর্ণিঝড়।
- শনি: পানির চেয়ে হালকা, পাতলা কিন্তু বিশাল আংটি।
- ইউরেনাস: পাশ ফিরে গড়িয়ে চলে, মেরুতে ৪২ বছরের রাত।
- নেপচুন: অঙ্ক কষে আবিষ্কার, শব্দের চেয়ে দ্রুত বাতাস।
দূরত্বটা আসলে কত বিশাল?
বইয়ের ছবিতে গ্রহগুলোকে পাশাপাশি গাদাগাদি করে আঁকা হয়, কিন্তু বাস্তবে তাদের মাঝে অকল্পনীয় ফাঁকা জায়গা। সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব প্রায় ১৫ কোটি কিলোমিটার, আলোও এটুকু পেরোতে প্রায় সাড়ে আট মিনিট নেয়। নেপচুন পর্যন্ত পৌঁছাতে সেই আলোরই লাগে চার ঘণ্টার বেশি। যদি সূর্যকে একটা ফুটবলের সমান ধরা হয়, তাহলে পৃথিবী হবে সরষেদানার মতো ছোট, প্রায় পঁচিশ মিটার দূরে, আর নেপচুন থাকবে প্রায় সাতশো মিটার দূরে। এ কারণেই মহাকাশযান পাঠালে নেপচুন পর্যন্ত যেতে এক দশকের বেশি সময় লেগে যায়।
গ্রহের সংখ্যা কি আবার বদলাতে পারে?
পারে, তবে তার জন্য নতুন প্রমাণ লাগবে। নেপচুনের অনেক দূরে কিছু বরফপাথরের কক্ষপথ এমনভাবে সাজানো যে কয়েকজন বিজ্ঞানী মনে করেন, সেখানে পৃথিবীর কয়েক গুণ ভারী এক অজানা 'নবম গ্রহ' লুকিয়ে থাকতে পারে। এখন পর্যন্ত কেউ তাকে সরাসরি দেখেনি, তাই এটা এখনো একটা অনুমান। আপাতত বিজ্ঞানের উত্তর পরিষ্কার: সৌরজগতে গ্রহ আটটি, আর প্রতিটিই নিজের মতো করে অদ্ভুত।
নিজে দেখুন
নিজে দেখো: সূর্যাস্তের পর বা ভোরের আগে পশ্চিম বা পূর্ব আকাশে সবচেয়ে উজ্জ্বল যে 'তারা' মিটমিট না করে স্থির জ্বলে, সেটা প্রায়ই শুক্র গ্রহ। কয়েক সপ্তাহ একই সময়ে আকাশ দেখে খাতায় তার অবস্থান লিখে রাখো, দেখবে সে তারাদের মাঝে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। ইংরেজি 'planet' শব্দের গ্রিক মূলের মানেই 'ভবঘুরে'!
ছোট্ট যাচাই
কতটা মনে আছে, দেখে নিন
১. সৌরজগতের সবচেয়ে গরম গ্রহ কোনটা?
২. প্লুটোকে বামন গ্রহ বলা হয় কেন?
তথ্যসূত্র
কৃতজ্ঞতা
- তথ্য যাচাই: ১ নভেম্বর, ২০২৬