মঙ্গল গ্রহে কি প্রাণ আছে? বিজ্ঞান যা জানে
· পড়তে ৭ মিনিট · ✓ তথ্য যাচাই করা
ছোট উত্তর · ১০ সেকেন্ডে
এখন পর্যন্ত মঙ্গলে প্রাণের কোনো নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে বিজ্ঞানীরা জোরালো প্রমাণ পেয়েছেন যে বহু কোটি বছর আগে সেখানে নদী আর হ্রদ ছিল, সাথে ছিল জৈব অণু আর শক্তির উৎস। তাই প্রাচীন মঙ্গল বাসযোগ্য ছিল। সেখানে আসলেই প্রাণ জন্মেছিল কি না, রোভারগুলো এখন সেটাই খুঁজছে।
রাতের আকাশে একটা লালচে উজ্জ্বল বিন্দু, তারার মতো অতটা মিটমিট করে না, প্রায় স্থির হয়ে জ্বলে। ওটাই মঙ্গল গ্রহ। মানুষ শত শত বছর ধরে এই লাল গ্রহের দিকে তাকিয়ে একটা প্রশ্নই করে এসেছে: ওখানে কি কেউ আছে? একসময় লোকে ভাবত মঙ্গলে খাল কেটে সভ্যতা গড়েছে বুদ্ধিমান প্রাণী। আজ আমাদের রোবট গাড়ি সেখানকার মাটিতে চাকা ঘুরিয়ে বেড়াচ্ছে। তাহলে বিজ্ঞান এখন পর্যন্ত আসলে কী জানে, আর কী এখনো রহস্য, চলো ধাপে ধাপে দেখি।
সংক্ষেপে: মঙ্গলে কি প্রাণ আছে?
সরাসরি উত্তর হলো, এখন পর্যন্ত মঙ্গলে কোনো প্রাণের নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কোনো জীবাণু, কোনো কোষ, কোনো জীবাশ্ম কেউ হাতে-কলমে দেখাতে পারেনি। কিন্তু 'প্রমাণ নেই' আর 'প্রাণ নেই' এক কথা নয়। বিজ্ঞানীরা জোরালো প্রমাণ পেয়েছেন যে বহু কোটি বছর আগে মঙ্গলে নদী, হ্রদ, এমনকি হয়তো সাগরও ছিল, আর পানির সাথে ছিল প্রাণের জন্য দরকারি রাসায়নিক উপাদান। মানে, একসময় মঙ্গল প্রাণ টিকে থাকার মতো জায়গা ছিল। সেখানে আসলেই প্রাণ জন্মেছিল কি না, সেটাই এখনকার সবচেয়ে বড় খোঁজ।
আজকের মঙ্গল কেমন জায়গা?
আজকের মঙ্গলকে কল্পনা করো এক বিশাল ঠান্ডা মরুভূমি হিসেবে। গড় তাপমাত্রা শূন্যের অনেক নিচে, প্রায় মাইনাস ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি। বাতাস এত পাতলা যে পৃথিবীর বায়ুচাপের এক শতাংশেরও কম, আর সেই বাতাসের বেশিরভাগই কার্বন ডাই-অক্সাইড। মঙ্গলের পৃথিবীর মতো শক্তিশালী চৌম্বক ঢাল নেই, তাই সূর্য আর মহাকাশ থেকে আসা ক্ষতিকর বিকিরণ সরাসরি মাটিতে এসে পড়ে।
এই পরিবেশে মাটির উপরে খোলা জায়গায় তরল পানি বেশিক্ষণ টিকতে পারে না, হয় জমে বরফ হয়, নয়তো উড়ে বাষ্প হয়ে যায়। মাটিতে আছে পারক্লোরেট নামের এক ধরনের লবণ, যা বিকিরণের সাথে মিলে জৈব অণু ভেঙে ফেলতে পারে। তাই বিজ্ঞানীরা মনে করেন, আজ মঙ্গলের পৃষ্ঠে কোনো জীব খোলা আকাশের নিচে বেঁচে থাকা খুবই কঠিন।
জানেন কি?ট্যাপ করে দেখুন
মজার তথ্য: মঙ্গলের রং লাল কারণ তার ধুলো আর পাথরে প্রচুর আয়রন অক্সাইড আছে, সহজ ভাষায় মরিচা। পুরো গ্রহটাই যেন মরিচা ধরা লোহার গুঁড়ায় ঢাকা।
একসময় মঙ্গলে পানি ছিল, কীভাবে জানলাম?
মহাকাশ থেকে তোলা ছবিতে মঙ্গলের গায়ে দেখা যায় শুকিয়ে যাওয়া নদীর খাত, শাখা-প্রশাখা ছড়ানো উপত্যকা আর বদ্বীপ, ঠিক যেমন পৃথিবীতে নদী সাগরে মেশার জায়গায় তৈরি হয়। মাটিতে নামা রোভার গাড়িগুলো পেয়েছে গোল গোল নুড়িপাথর, যেগুলো কেবল বহমান পানিতে গড়িয়ে গড়িয়েই অমন মসৃণ হয়। পাওয়া গেছে কাদামাটি আর এমন সব খনিজ, যেগুলো তৈরি হতে পানি লাগে।
নাসার কিউরিওসিটি রোভার নেমেছিল গেল ক্রেটার নামের এক বিশাল গর্তে। সেখানে পাথরের স্তর পরীক্ষা করে দেখা গেছে, গর্তটা একসময় বহু বছর ধরে টিকে থাকা হ্রদ ছিল। সেই হ্রদের পানি খুব বেশি অম্লীয় বা লবণাক্ত ছিল না, অর্থাৎ পৃথিবীর অণুজীবরা চাইলে সেখানে দিব্যি বেঁচে থাকতে পারত। পারসিভিয়ারেন্স রোভার নেমেছে জেজেরো ক্রেটারে, যা ছিল প্রাচীন এক হ্রদ আর নদীর বদ্বীপ।
আজও মঙ্গলে পানি আছে, তবে বেশিরভাগই বরফ হয়ে। দুই মেরুতে বরফের টুপি আছে, আর মাটির নিচে বিশাল এলাকা জুড়ে জমাট বরফের স্তর পাওয়া গেছে। ফিনিক্স ল্যান্ডার মাটি সামান্য খুঁড়েই সাদা বরফ দেখেছিল, যা কয়েকদিনের মধ্যে বাষ্প হয়ে মিলিয়ে গেছে।
তাহলে এত পানি গেল কোথায়? বিজ্ঞানীদের ধারণা, মঙ্গল পৃথিবীর চেয়ে অনেক ছোট বলে তার ভেতরটা তাড়াতাড়ি ঠান্ডা হয়ে যায়। ফলে গ্রহের চৌম্বক ক্ষেত্র প্রায় হারিয়ে যায়। চৌম্বক ঢাল না থাকায় সূর্য থেকে ছুটে আসা কণার স্রোত, যাকে সৌরবায়ু বলে, ধীরে ধীরে মঙ্গলের বাতাস মহাকাশে উড়িয়ে নিয়ে যায়। বাতাস পাতলা হতেই চাপ কমে, তাপ ধরে রাখার ক্ষমতা কমে, আর পানির একটা বড় অংশ বাষ্প হয়ে হারিয়ে যায় বা মাটির নিচে বরফ ও খনিজের ভেতরে আটকে পড়ে। নাসার মাভেন নামের একটা মহাকাশযান আজও মাপছে, প্রতি সেকেন্ডে মঙ্গল কতটা বাতাস হারাচ্ছে। মানে, যে গ্রহ একসময় নীল আকাশ আর নদীর দেশ হতে পারত, সময়ের সাথে সে হয়ে গেছে শুকনো লাল মরুভূমি। আর যদি তখন প্রাণ জন্মেও থাকে, তাকে হয়তো এই বদলের সাথে লড়াই করে মাটির গভীরে আশ্রয় নিতে হয়েছে।
প্রাণের জন্য কী কী লাগে?
বিজ্ঞানীরা যখন অন্য গ্রহে প্রাণ খোঁজেন, তখন প্রথমে দেখেন সেই জায়গাটা 'বাসযোগ্য' কি না। পৃথিবীর জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে মোটামুটি তিনটা জিনিস দরকার মনে করা হয়:
- তরল পানি, যেখানে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটতে পারে।
- কার্বন, হাইড্রোজেন, নাইট্রোজেন, অক্সিজেন, ফসফরাস আর সালফারের মতো মৌলিক উপাদান, যা দিয়ে কোষ তৈরি হয়।
- শক্তির একটা উৎস, যেমন সূর্যের আলো বা পাথর আর পানির রাসায়নিক বিক্রিয়া।
দারুণ ব্যাপার হলো, প্রাচীন মঙ্গলে এই তিনটাই একসাথে ছিল বলে প্রমাণ মিলেছে। কিউরিওসিটি পাথর গুঁড়া করে ভেতরে জৈব অণু খুঁজে পেয়েছে, অর্থাৎ কার্বনভিত্তিক যৌগ। তবে মনে রাখতে হবে, জৈব অণু মানেই জীব নয়। এগুলো আগ্নেয়গিরি, উল্কাপিণ্ড বা সাধারণ রাসায়নিক বিক্রিয়াতেও তৈরি হতে পারে।
মিথেন গ্যাসের রহস্য
মঙ্গলের বাতাসে মাঝে মাঝে অল্প পরিমাণ মিথেন গ্যাস ধরা পড়েছে। কিউরিওসিটি দেখেছে, মিথেনের পরিমাণ ঋতু অনুযায়ী ওঠানামা করে, আবার হঠাৎ কখনো বেড়ে যায়। এটা কেন উত্তেজনার? কারণ পৃথিবীর বাতাসের বেশিরভাগ মিথেন আসে জীবন্ত প্রাণী আর অণুজীব থেকে।
কিন্তু মিথেন তৈরির জীবহীন উপায়ও আছে। পানি আর নির্দিষ্ট কিছু পাথরের রাসায়নিক বিক্রিয়াতেও মিথেন জন্মাতে পারে, আবার মাটির নিচে বহু যুগ আটকে থাকা গ্যাস ফাটল দিয়ে বেরিয়ে আসতে পারে। আরও ধাঁধার বিষয়, মঙ্গলকে ঘিরে ঘোরা একটা ইউরোপীয় উপগ্রহ উপরের বাতাসে প্রায় কোনো মিথেনই খুঁজে পায়নি। তাই মিথেন এখনো একটা খোলা প্রশ্ন, প্রাণের প্রমাণ নয়।
ভাইকিং পরীক্ষা: প্রায় পেয়ে গিয়েছিলাম?
১৯৭৬ সালে নাসার দুটি ভাইকিং ল্যান্ডার মঙ্গলে নেমে সরাসরি প্রাণ খোঁজার পরীক্ষা চালিয়েছিল। মাটিতে পুষ্টিকর তরল দিয়ে দেখা হয়েছিল, কোনো জীবাণু খেয়ে গ্যাস ছাড়ে কি না। একটা পরীক্ষায় সত্যিই গ্যাস বেরিয়েছিল, যা দেখে অনেকে চমকে উঠেছিলেন।
কিন্তু অন্য পরীক্ষায় মাটিতে কোনো জৈব অণুই পাওয়া যায়নি। বেশিরভাগ বিজ্ঞানী শেষে সিদ্ধান্তে আসেন, ওই ফল সম্ভবত মাটির অদ্ভুত রসায়নের কারণে, যেমন পারক্লোরেটের মতো তীব্র রাসায়নিকের বিক্রিয়ায়। এখনো কয়েকজন গবেষক এই ব্যাখ্যা নিয়ে তর্ক করেন, তবে বিজ্ঞানের মূল ধারা মনে করে ভাইকিং প্রাণ খুঁজে পায়নি।
এখন কীভাবে খোঁজা হচ্ছে?
আজকের খোঁজ অনেক বেশি সতর্ক। জীবন্ত প্রাণী না খুঁজে বিজ্ঞানীরা খুঁজছেন 'বায়োসিগনেচার', অর্থাৎ প্রাচীন জীবনের রেখে যাওয়া ছাপ। যেমন পাথরের ভেতর বিশেষ ধরনের স্তর, যা পৃথিবীতে অণুজীবের দল তৈরি করে, বা এমন রাসায়নিক নকশা যা সাধারণ প্রক্রিয়ায় সহজে তৈরি হয় না।
পারসিভিয়ারেন্স রোভার জেজেরো ক্রেটারের পাথর খুঁড়ে ছোট ছোট নমুনা টিউবে ভরে রাখছে। পরিকল্পনা হলো, ভবিষ্যতের কোনো অভিযানে এই নমুনাগুলো পৃথিবীতে ফিরিয়ে এনে শক্তিশালী গবেষণাগারে পরীক্ষা করা। কিছু পাথরে এমন দাগ আর রাসায়নিক মিশ্রণ পাওয়া গেছে যা জীবনের সম্ভাব্য চিহ্ন হতে পারে, আবার জীবহীন প্রক্রিয়াতেও হতে পারে। নিশ্চিত হতে হলে পৃথিবীতে এনে পরীক্ষা করাই সবচেয়ে ভালো উপায়।
ইউরোপের রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিন রোভারের লক্ষ্য মাটির প্রায় দুই মিটার নিচ পর্যন্ত খোঁড়া। কারণ মাটির নিচে বিকিরণ পৌঁছায় না, তাই সেখানে প্রাচীন জৈব অণু অক্ষত থাকার সম্ভাবনা বেশি।
তাহলে প্রাণ থাকলে কোথায় থাকতে পারে?
যদি আজও মঙ্গলে কোনো জীবাণু টিকে থাকে, তবে তা খোলা মাটিতে নয়, বরং লুকানো জায়গায় থাকার কথা। বিজ্ঞানীরা কয়েকটা সম্ভাব্য আশ্রয়ের কথা বলেন: মাটির অনেক গভীরে যেখানে তাপমাত্রা বেশি আর বিকিরণ নেই, বরফের নিচে লবণাক্ত পানির স্তরে, বা পাথরের ফাটলের ভেতর। পৃথিবীতেও আমরা এমন অণুজীব পেয়েছি যারা মাটির কয়েক কিলোমিটার নিচে, অ্যান্টার্কটিকার বরফের নিচে বা ফুটন্ত উষ্ণ প্রস্রবণে দিব্যি বেঁচে আছে। তাই কঠিন পরিবেশ মানেই প্রাণ অসম্ভব নয়।
কেন এই প্রশ্নটা এত গুরুত্বপূর্ণ?
মঙ্গলে যদি কখনো ছোট্ট একটা জীবাণুর জীবাশ্মও পাওয়া যায়, তার মানে হবে প্রাণ শুধু পৃথিবীর একটা দুর্লভ দুর্ঘটনা নয়। একই সৌরজগতে দুইবার আলাদাভাবে প্রাণ জন্মালে, মহাবিশ্বের কোটি কোটি গ্রহে প্রাণ থাকাটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। আর যদি কিছুই না পাওয়া যায়, সেটাও একটা বড় শিক্ষা: পানি আর উপাদান থাকলেও প্রাণ জন্মানো হয়তো আমরা যত সহজ ভাবি তত সহজ নয়। দুই উত্তরই আমাদের নিজেদের অস্তিত্বকে নতুন করে বুঝতে সাহায্য করবে।
তাই মঙ্গলে প্রাণ আছে কি না, এর সৎ উত্তর হলো: আমরা এখনো জানি না। তবে আমরা জানি কোথায় খুঁজতে হবে, কী খুঁজতে হবে, আর প্রতিটা নতুন পাথর আমাদের উত্তরের একটু কাছে নিয়ে যাচ্ছে।
নিজে দেখুন
নিজে দেখো: যে মাসগুলোতে মঙ্গল রাতের আকাশে দেখা যায়, তখন খোঁজো এমন একটা লালচে উজ্জ্বল বিন্দু, যেটা তারাদের মতো অতটা মিটমিট করে না। কয়েক সপ্তাহ ধরে একই সময়ে দেখে খাতায় তারাদের তুলনায় তার জায়গা এঁকে রাখো। দেখবে সে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে, কারণ ওটা তারা নয়, গ্রহ। প্রাচীন মানুষও ঠিক এভাবেই মঙ্গলকে চিনেছিল!
ছোট্ট যাচাই
কতটা মনে আছে, দেখে নিন
১. মঙ্গলে জৈব অণু পাওয়া মানেই কি প্রাণ পাওয়া?
২. মঙ্গল গ্রহ লাল দেখায় কেন?
তথ্যসূত্র
- ১NASA Science — Mars science.nasa.gov ↗
- ২NASA Science — Mars Exploration: Astrobiology science.nasa.gov ↗
- ৩ESA — ExoMars Trace Gas Orbiter / Rosalind Franklin rover esa.int ↗
- ৪Grotzinger et al. 2014, Science — A habitable fluvio-lacustrine environment at Yellowknife Bay, Gale Crater, Mars science.org ↗
কৃতজ্ঞতা
- তথ্য যাচাই: ১ নভেম্বর, ২০২৬