এসএসসি রসায়ন · অধ্যায় ৫
রাসায়নিক বন্ধন
এক কথায়
রাসায়নিক বন্ধন হলো যে আকর্ষণ বল দুই বা ততোধিক পরমাণুকে একসাথে ধরে রাখে। পরমাণুরা নিকটতম নিষ্ক্রিয় গ্যাসের মতো স্থিতিশীল ইলেকট্রন বিন্যাস পেতে ইলেকট্রন দেয়, নেয় বা ভাগাভাগি করে। ইলেকট্রন আদান-প্রদানে আয়নিক বন্ধন, ভাগাভাগিতে সমযোজী বন্ধন, আর মুক্ত ইলেকট্রন সাগরে ধাতব বন্ধন তৈরি হয়।
পরমাণুরা একা থাকে না কেন?
আমাদের চারপাশের প্রায় সব পদার্থই কোনো না কোনো যৌগ বা অণু। পানি, লবণ, চিনি, এমনকি বাতাসের অক্সিজেনও (O2) দুটি পরমাণু জোড়া লেগে তৈরি। একা একা পরমাণু হিসেবে স্বাভাবিক অবস্থায় টিকে থাকে মূলত হিলিয়াম, নিয়ন, আর্গনের মতো নিষ্ক্রিয় গ্যাসগুলো।
এর কারণ নিষ্ক্রিয় গ্যাসের সর্বশেষ শক্তিস্তর ইলেকট্রনে পূর্ণ, তাই তারা স্থিতিশীল। অন্য মৌলের পরমাণুরা এই স্থিতিশীল অবস্থা পেতে চায়। ইলেকট্রন গ্রহণ, ত্যাগ বা শেয়ার করার মাধ্যমে তারা পরস্পরের সাথে যুক্ত হয়, আর এই যুক্ত থাকার আকর্ষণ বলকেই বলা হয় রাসায়নিক বন্ধন। বন্ধন তৈরিতে অংশ নেয় শুধু সর্বশেষ কক্ষপথের ইলেকট্রন, যাদের বলে যোজ্যতা ইলেকট্রন।
অষ্টক ও দুই-এর নিয়ম
নিষ্ক্রিয় গ্যাসগুলোর (হিলিয়াম বাদে) সর্বশেষ শক্তিস্তরে ৮টি ইলেকট্রন থাকে। তাই বেশিরভাগ পরমাণু বন্ধন গঠনের সময় সর্বশেষ স্তরে ৮টি ইলেকট্রন পূর্ণ করার চেষ্টা করে। একে অষ্টক নিয়ম বলে।
হাইড্রোজেন, লিথিয়াম বা বেরিলিয়ামের মতো ছোট পরমাণুর ক্ষেত্রে লক্ষ্য হিলিয়ামের মতো ২টি ইলেকট্রন, একে বলে দুই-এর নিয়ম বা ডুপ্লেট। মনে রাখো, অষ্টক নিয়মের ব্যতিক্রমও আছে, যেমন BF3 অণুতে বোরনের চারপাশে মাত্র ৬টি ইলেকট্রন থাকে, আর PCl5 অণুতে ফসফরাসের চারপাশে থাকে ১০টি।
- Na (2,8,1): ১টি ইলেকট্রন ছেড়ে Na+ (2,8), নিয়নের মতো।
- Cl (2,8,7): ১টি ইলেকট্রন নিয়ে Cl- (2,8,8), আর্গনের মতো।
- H (1): আরেকটি পরমাণুর সাথে ১টি ইলেকট্রন শেয়ার করে হিলিয়ামের মতো ২টি পায়।
যোজনী: একটি পরমাণু কয়টি বন্ধন গড়ে
কোনো মৌলের একটি পরমাণু অন্য মৌলের কয়টি হাইড্রোজেন পরমাণু বা তার সমতুল্য পরমাণুর সাথে যুক্ত হতে পারে, সেই সংখ্যাকে যোজনী বলে। সহজভাবে, স্থিতিশীল হতে একটি পরমাণু যতগুলো ইলেকট্রন দেয়, নেয় বা শেয়ার করে, সেটিই তার যোজনী।
যেমন H2O অণুতে একটি অক্সিজেন দুটি হাইড্রোজেনের সাথে যুক্ত, তাই অক্সিজেনের যোজনী ২। CH4 অণুতে কার্বনের যোজনী ৪। কিছু মৌলের একাধিক যোজনী থাকে, একে পরিবর্তনশীল যোজনী বলে। যেমন আয়রন FeCl2 যৌগে ২ এবং FeCl3 যৌগে ৩ যোজনী দেখায়, আর কপার Cu2O যৌগে ১ ও CuO যৌগে ২।
আয়ন ও যৌগমূলক এবং সংকেত লেখার কৌশল
ইলেকট্রন ত্যাগ করে পরমাণু ধনাত্মক আয়ন বা ক্যাটায়ন হয় (Na+, Ca2+, Al3+), আর ইলেকট্রন গ্রহণ করে হয় ঋণাত্মক আয়ন বা অ্যানায়ন (Cl-, O2-)। কয়েকটি পরমাণু একসাথে থেকে একটি আধানযুক্ত গুচ্ছ হিসেবে আচরণ করলে তাকে যৌগমূলক বলে।
যৌগের সংকেত লিখতে আয়ন বা মূলকের যোজনী আড়াআড়ি বদল করা হয়। যেমন Al3+ ও O2- মিলে Al2O3, আর Ca2+ ও PO4 3- মিলে Ca3(PO4)2। এতে মোট ধনাত্মক ও ঋণাত্মক আধান সমান হয়ে যৌগটি নিরপেক্ষ থাকে।
- অ্যামোনিয়াম NH4+ (যোজনী ১)
- হাইড্রক্সাইড OH- (যোজনী ১)
- নাইট্রেট NO3- (যোজনী ১)
- কার্বনেট CO3 2- (যোজনী ২)
- সালফেট SO4 2- (যোজনী ২)
- ফসফেট PO4 3- (যোজনী ৩)
আয়নিক বন্ধন: ইলেকট্রন দেওয়া-নেওয়া
সাধারণত একটি ধাতব পরমাণু (যেমন Na) সর্বশেষ স্তরের ইলেকট্রন ছেড়ে ক্যাটায়ন হয় এবং একটি অধাতব পরমাণু (যেমন Cl) সেই ইলেকট্রন নিয়ে অ্যানায়ন হয়। বিপরীত আধানের এই দুই আয়নের মধ্যে তড়িৎ আকর্ষণ বলই আয়নিক বা তড়িৎযোজী বন্ধন।
সোডিয়াম ক্লোরাইডের ক্ষেত্রে Na → Na+ + e- এবং Cl + e- → Cl-, তারপর Na+ ও Cl- আকর্ষণে NaCl গঠিত হয়। আয়নিক যৌগে আলাদা অণু থাকে না, বরং লক্ষ লক্ষ আয়ন ত্রিমাত্রিক নিয়মিত সজ্জায় স্ফটিক ল্যাটিস তৈরি করে। NaCl স্ফটিকে প্রতিটি Na+ আয়নকে ৬টি Cl- আয়ন ঘিরে রাখে।
Na (2,8,1) → Na+ (2,8) + e-
Cl (2,8,7) + e- → Cl- (2,8,8)
Mg + O → Mg2+ + O2- → MgO
সমযোজী বন্ধন: ইলেকট্রন ভাগাভাগি
দুটি অধাতব পরমাণু যখন সমান সংখ্যক ইলেকট্রন দিয়ে এক বা একাধিক ইলেকট্রন জোড় তৈরি করে এবং দুজনেই সেই জোড় ব্যবহার করে স্থিতিশীল হয়, তখন সেটি সমযোজী বন্ধন। এক জোড় ইলেকট্রন শেয়ারে একক বন্ধন (H-H, H-Cl), দুই জোড়ে দ্বিবন্ধন (O=O), আর তিন জোড়ে ত্রিবন্ধন (N≡N)।
ইলেকট্রন ডট গঠন বা লুইস গঠনে যোজ্যতা ইলেকট্রনকে ফোঁটা বা ক্রস দিয়ে দেখানো হয়। বন্ধনে অংশ না নেওয়া ইলেকট্রন জোড়কে বলে মুক্তজোড় বা নিঃসঙ্গ জোড়। পানির অণুতে অক্সিজেনের দুটি মুক্তজোড় থাকে, অ্যামোনিয়ায় নাইট্রোজেনের একটি।
- H2: একটি একক বন্ধন, প্রতিটি H পায় ২টি ইলেকট্রন।
- H2O: দুটি O-H একক বন্ধন, অক্সিজেনে দুটি মুক্তজোড়।
- CH4: চারটি C-H একক বন্ধন, মুক্তজোড় নেই।
- CO2: O=C=O, দুটি দ্বিবন্ধন।
- N2: একটি ত্রিবন্ধন, প্রতিটি N-এ একটি মুক্তজোড়।
পোলার ও অপোলার সমযোজী বন্ধন
একই মৌলের দুই পরমাণুর মধ্যে (H2, Cl2) শেয়ার করা ইলেকট্রন সমানভাবে ভাগ হয়, এটি অপোলার সমযোজী বন্ধন। কিন্তু ভিন্ন মৌলের পরমাণুর মধ্যে যেটির তড়িৎ ঋণাত্মকতা বেশি, সেটি শেয়ার করা ইলেকট্রন জোড়কে নিজের দিকে বেশি টানে। ফলে সেই প্রান্তে আংশিক ঋণাত্মক (δ-) ও অপর প্রান্তে আংশিক ধনাত্মক (δ+) আধান তৈরি হয়। এটিই পোলার সমযোজী বন্ধন।
HCl ও H2O এর উদাহরণ। পানির অণু বাঁকা আকৃতির ও পোলার বলেই পানি লবণ, চিনির মতো অনেক পদার্থকে দ্রবীভূত করতে পারে, তাই পানিকে সার্বজনীন দ্রাবক বলে। অন্যদিকে CO2 অণুর বন্ধনগুলো পোলার হলেও অণুটি সরলরৈখিক হওয়ায় দুই দিকের টান কাটাকাটি হয়ে অণুটি সামগ্রিকভাবে অপোলার।
ধাতব বন্ধন: ইলেকট্রনের সাগর
ধাতুর পরমাণুগুলো সর্বশেষ স্তরের ইলেকট্রন সহজে ছেড়ে দিয়ে ধনাত্মক আয়নে পরিণত হয়। ছেড়ে দেওয়া ইলেকট্রনগুলো কোনো নির্দিষ্ট পরমাণুর থাকে না, পুরো ধাতুজুড়ে মুক্তভাবে ঘুরে বেড়ায়, যেন ইলেকট্রনের সাগর। এই সাগরের সাথে ধনাত্মক ধাতব আয়নগুলোর আকর্ষণই ধাতব বন্ধন।
এই মুক্ত ইলেকট্রনের কারণেই ধাতু বিদ্যুৎ ও তাপের সুপরিবাহী, চকচকে, এবং পিটিয়ে পাত (ঘাতসহ) বা টেনে তার (নমনীয়) বানানো যায়। আয়নগুলো স্থান বদলালেও ইলেকট্রন সাগর তাদের ধরে রাখে, তাই ধাতু ভেঙে না গিয়ে বেঁকে যায়।
আয়নিক বনাম সমযোজী যৌগ: বৈশিষ্ট্যের তুলনা
বন্ধনের ধরন বদলালে পদার্থের আচরণও বদলায়। পরীক্ষায় এই তুলনা প্রায় নিশ্চিতভাবে আসে, তাই কারণসহ মনে রাখো।
- অবস্থা: আয়নিক যৌগ সাধারণত কঠিন স্ফটিক; সমযোজী যৌগ কঠিন, তরল বা গ্যাস হতে পারে।
- গলনাঙ্ক ও স্ফুটনাঙ্ক: আয়নিক যৌগে বেশি (NaCl গলে প্রায় 801 °C তাপমাত্রায়), কারণ শক্তিশালী তড়িৎ আকর্ষণ ভাঙতে হয়; সমযোজী আণবিক যৌগে সাধারণত কম।
- বিদ্যুৎ পরিবাহিতা: আয়নিক যৌগ কঠিন অবস্থায় পরিবহন করে না, কিন্তু গলিত বা জলীয় দ্রবণে আয়ন মুক্তভাবে চলতে পারে বলে পরিবহন করে; বেশিরভাগ সমযোজী যৌগ অপরিবাহী।
- দ্রাব্যতা: আয়নিক যৌগ সাধারণত পানির মতো পোলার দ্রাবকে দ্রবণীয়; অপোলার সমযোজী যৌগ কেরোসিন বা বেনজিনের মতো অপোলার দ্রাবকে দ্রবণীয়।
- ব্যতিক্রম: হীরা ও গ্রাফাইট সমযোজী হলেও দানবীয় জালিকা গঠনের কারণে এদের গলনাঙ্ক খুব বেশি, আর গ্রাফাইট বিদ্যুৎ পরিবহন করে।
বহুনির্বাচনী প্রশ্ন (MCQ)
১. রাসায়নিক বন্ধন গঠনে অংশ নেয় কোন ইলেকট্রন?
- ক) প্রথম কক্ষপথের ইলেকট্রন
- খ) যোজ্যতা ইলেকট্রন
- গ) নিউক্লিয়াসের ইলেকট্রন
- ঘ) সব ইলেকট্রন সমানভাবে
উত্তর দেখো
উত্তর: খ) যোজ্যতা ইলেকট্রন — বন্ধন গঠনে শুধু সর্বশেষ শক্তিস্তরের ইলেকট্রন অর্থাৎ যোজ্যতা ইলেকট্রন অংশ নেয়।
২. NaCl যৌগে কোন ধরনের বন্ধন বিদ্যমান?
- ক) সমযোজী
- খ) ধাতব
- গ) আয়নিক
- ঘ) পোলার সমযোজী
উত্তর দেখো
উত্তর: গ) আয়নিক — Na একটি ইলেকট্রন ত্যাগ করে Na+ এবং Cl তা গ্রহণ করে Cl- হয়; বিপরীত আধানের আকর্ষণে আয়নিক বন্ধন।
৩. N2 অণুতে নাইট্রোজেন পরমাণুদ্বয়ের মধ্যে কয়টি ইলেকট্রন শেয়ার হয়?
- ক) ২টি
- খ) ৪টি
- গ) ৬টি
- ঘ) ৮টি
উত্তর দেখো
উত্তর: গ) ৬টি — N2 অণুতে ত্রিবন্ধন, অর্থাৎ তিন জোড় বা ৬টি ইলেকট্রন শেয়ার হয়।
৪. পানির অণুতে অক্সিজেন পরমাণুতে কয়টি মুক্তজোড় ইলেকট্রন থাকে?
- ক) ০টি
- খ) ১টি
- গ) ২টি
- ঘ) ৩টি
উত্তর দেখো
উত্তর: গ) ২টি — অক্সিজেনের ৬টি যোজ্যতা ইলেকট্রনের ২টি দুটি O-H বন্ধনে যায়, বাকি ৪টি দুটি মুক্তজোড় হিসেবে থাকে।
৫. অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইডের সঠিক সংকেত কোনটি?
- ক) AlO
- খ) Al2O3
- গ) Al3O2
- ঘ) AlO3
উত্তর দেখো
উত্তর: খ) Al2O3 — Al এর যোজনী ৩ এবং O এর যোজনী ২; আড়াআড়ি বদল করলে Al2O3, যেখানে মোট আধান +6 ও -6।
৬. নিচের কোনটি অপোলার সমযোজী অণু?
- ক) HCl
- খ) H2O
- গ) NH3
- ঘ) Cl2
উত্তর দেখো
উত্তর: ঘ) Cl2 — Cl2 অণুতে একই মৌলের দুই পরমাণু, তাই শেয়ার করা ইলেকট্রন সমানভাবে ভাগ হয়।
৭. কঠিন NaCl বিদ্যুৎ পরিবহন করে না কেন?
- ক) এতে কোনো আয়ন নেই
- খ) আয়নগুলো ল্যাটিসে আবদ্ধ থাকায় চলাচল করতে পারে না
- গ) এটি সমযোজী যৌগ
- ঘ) এতে মুক্ত ইলেকট্রন অনেক বেশি
উত্তর দেখো
উত্তর: খ) আয়নগুলো ল্যাটিসে আবদ্ধ থাকায় চলাচল করতে পারে না — কঠিন অবস্থায় আয়নগুলো স্ফটিক ল্যাটিসে নির্দিষ্ট স্থানে আবদ্ধ; গলালে বা পানিতে দ্রবীভূত করলে মুক্ত হয়ে বিদ্যুৎ পরিবহন করে।
৮. ধাতু বিদ্যুৎ সুপরিবাহী হওয়ার মূল কারণ কী?
- ক) উচ্চ গলনাঙ্ক
- খ) মুক্ত বা সঞ্চরণশীল ইলেকট্রন
- গ) ঋণাত্মক আয়নের উপস্থিতি
- ঘ) সমযোজী বন্ধন
উত্তর দেখো
উত্তর: খ) মুক্ত বা সঞ্চরণশীল ইলেকট্রন — ধাতব বন্ধনে ইলেকট্রন সাগরের মুক্ত ইলেকট্রনগুলো বিভব পার্থক্যের প্রভাবে সহজে চলাচল করে বিদ্যুৎ পরিবহন করে।
সৃজনশীল প্রশ্ন
উদ্দীপক: X ও Y দুটি মৌল, যাদের পারমাণবিক সংখ্যা যথাক্রমে ১২ ও ১৭। আবার Z একটি মৌল, যার পারমাণবিক সংখ্যা ৮; এটি হাইড্রোজেনের সাথে যুক্ত হয়ে একটি তরল যৌগ তৈরি করে। (এখানে X, Y, Z প্রতীকী, প্রকৃত প্রতীক নয়)
- ক) যোজনী কাকে বলে?
- খ) নিষ্ক্রিয় গ্যাস সাধারণত বন্ধন গঠন করে না কেন? ব্যাখ্যা করো।
- গ) X ও Y দ্বারা গঠিত যৌগে বন্ধন গঠন প্রক্রিয়া ইলেকট্রন বিন্যাসসহ দেখাও।
- ঘ) X ও Y এর যৌগ এবং Z ও হাইড্রোজেনের যৌগের মধ্যে কোনটির গলনাঙ্ক বেশি হবে? যুক্তিসহ বিশ্লেষণ করো।
উত্তর দেখো
- কোনো মৌলের একটি পরমাণু অন্য মৌলের যতগুলো হাইড্রোজেন পরমাণু বা তার সমতুল্য পরমাণুর সাথে যুক্ত হয়, সেই সংখ্যাকে ঐ মৌলের যোজনী বলে।
- নিষ্ক্রিয় গ্যাসের সর্বশেষ শক্তিস্তর ইলেকট্রনে পূর্ণ থাকে (হিলিয়ামে ২টি, অন্যদের ৮টি)। এরা ইতিমধ্যে স্থিতিশীল, তাই ইলেকট্রন গ্রহণ, ত্যাগ বা শেয়ার করার প্রবণতা খুবই কম। এ কারণে সাধারণ অবস্থায় এরা বন্ধন গঠন করে না।
- X হলো Mg (2,8,2) এবং Y হলো Cl (2,8,7)। Mg দুটি ইলেকট্রন ত্যাগ করে Mg2+ (2,8) হয়, নিয়নের বিন্যাস পায়। দুটি Cl পরমাণু প্রত্যেকে একটি করে ইলেকট্রন গ্রহণ করে Cl- (2,8,8) হয়, আর্গনের বিন্যাস পায়। Mg → Mg2+ + 2e-; 2Cl + 2e- → 2Cl-। এরপর Mg2+ ও দুটি Cl- আয়নের তড়িৎ আকর্ষণে আয়নিক যৌগ MgCl2 গঠিত হয়।
- X ও Y এর যৌগ MgCl2 আয়নিক, আর Z (অক্সিজেন) ও হাইড্রোজেনের যৌগ H2O সমযোজী। MgCl2 স্ফটিকে অসংখ্য Mg2+ ও Cl- আয়ন শক্তিশালী তড়িৎ আকর্ষণে ত্রিমাত্রিক ল্যাটিসে আবদ্ধ, এই আকর্ষণ ভাঙতে অনেক তাপশক্তি লাগে, তাই এর গলনাঙ্ক অনেক বেশি (প্রায় 714 °C)। অন্যদিকে পানিতে অণুগুলোর মধ্যে আন্তঃআণবিক আকর্ষণ তুলনামূলক দুর্বল, তাই বরফ 0 °C তাপমাত্রায়ই গলে যায়। সুতরাং MgCl2 এর গলনাঙ্ক বেশি।
উদ্দীপক: রসায়ন ক্লাসে শিক্ষক তিনটি পদার্থ দেখালেন: একটি তামার তার, এক টুকরো মোম এবং এক চামচ খাবার লবণ। তিনি ব্যাটারি ও বাল্ব দিয়ে পরীক্ষা করে দেখালেন, তামার তার দিয়ে বাল্ব জ্বলে, মোম দিয়ে জ্বলে না, আর শুকনো লবণ দিয়ে জ্বলে না কিন্তু লবণ-পানি দিয়ে জ্বলে।
- ক) মুক্তজোড় ইলেকট্রন কাকে বলে?
- খ) CO2 অণুর বন্ধন পোলার হলেও অণুটি অপোলার কেন?
- গ) তামার তার দিয়ে বাল্ব জ্বলার কারণ বন্ধনের ধারণা দিয়ে ব্যাখ্যা করো।
- ঘ) শুকনো লবণ ও লবণ-পানির আচরণের পার্থক্য এবং মোমের আচরণ বন্ধনের আলোকে বিশ্লেষণ করো।
উত্তর দেখো
- অণুতে কোনো পরমাণুর যোজ্যতা স্তরের যে ইলেকট্রন জোড় বন্ধন গঠনে অংশ নেয় না, তাকে মুক্তজোড় বা নিঃসঙ্গ জোড় ইলেকট্রন বলে।
- CO2 অণুতে অক্সিজেনের তড়িৎ ঋণাত্মকতা কার্বনের চেয়ে বেশি, তাই প্রতিটি C=O বন্ধন পোলার। কিন্তু অণুটি সরলরৈখিক (O=C=O), দুটি বন্ধনের পোলারিটি সমান ও বিপরীতমুখী হওয়ায় পরস্পরকে বাতিল করে। ফলে অণুটি সামগ্রিকভাবে অপোলার।
- তামা একটি ধাতু, এর পরমাণুগুলো ধাতব বন্ধনে যুক্ত। কপার পরমাণু যোজ্যতা ইলেকট্রন ছেড়ে ধনাত্মক আয়ন হয় এবং ছেড়ে দেওয়া ইলেকট্রনগুলো পুরো ধাতুতে মুক্তভাবে চলাচল করে। ব্যাটারি যুক্ত করলে এই মুক্ত ইলেকট্রনগুলো একদিকে প্রবাহিত হয়ে তড়িৎপ্রবাহ তৈরি করে, তাই বাল্ব জ্বলে।
- খাবার লবণ NaCl আয়নিক যৌগ। শুকনো অবস্থায় Na+ ও Cl- আয়নগুলো স্ফটিক ল্যাটিসে নির্দিষ্ট স্থানে আবদ্ধ, চলাচল করতে পারে না, তাই বিদ্যুৎ পরিবহন হয় না। পানিতে দ্রবীভূত করলে পোলার পানির অণু আয়নগুলোকে আলাদা করে দেয়, মুক্ত আয়নগুলো তড়িৎদ্বারের দিকে চলাচল করে, তাই বাল্ব জ্বলে। মোম মূলত দীর্ঘ শিকলের হাইড্রোকার্বন, একটি অপোলার সমযোজী পদার্থ; এতে মুক্ত আয়ন বা মুক্ত ইলেকট্রন নেই, তাই কোনো অবস্থাতেই এটি বিদ্যুৎ পরিবহন করে না। সুতরাং পরিবাহিতা নির্ভর করে চলাচলে সক্ষম আধানবাহক (মুক্ত ইলেকট্রন বা মুক্ত আয়ন) আছে কি না তার ওপর।
বাস্তব জীবনে মজার যোগসূত্র
পানির অণু বাঁকা আর পোলার বলেই একটা অদ্ভুত কাণ্ড ঘটে: চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়ে কলের সরু পানির ধারার কাছে আনলে ধারাটা চিরুনির দিকে বেঁকে যায়! আবার এই পোলার অণুগুলোর মধ্যে হাইড্রোজেন বন্ধনের কারণে বরফে অণুরা ফাঁকা ফাঁকা সজ্জায় বসে, তাই বরফ পানির চেয়ে হালকা হয়ে ভাসে, তাই শীতের দেশে পুকুরের ওপর বরফ জমলেও নিচের মাছেরা বেঁচে থাকে।
প্রশ্ন ও উত্তর
আয়নিক ও সমযোজী বন্ধনের মূল পার্থক্য কী?
আয়নিক বন্ধনে এক পরমাণু থেকে অন্য পরমাণুতে ইলেকট্রন স্থানান্তরিত হয়ে আয়ন তৈরি হয়, সাধারণত ধাতু ও অধাতুর মধ্যে। সমযোজী বন্ধনে দুটি পরমাণু ইলেকট্রন জোড় ভাগাভাগি করে, সাধারণত দুটি অধাতুর মধ্যে।
অষ্টক নিয়ম কি সব সময় মানা হয়?
না। হাইড্রোজেন দুই-এর নিয়ম মানে। BF3 অণুতে বোরনের চারপাশে ৬টি এবং PCl5 অণুতে ফসফরাসের চারপাশে ১০টি ইলেকট্রন থাকে, এগুলো অষ্টক নিয়মের ব্যতিক্রম।
পরিবর্তনশীল যোজনী কী?
কিছু মৌল ভিন্ন ভিন্ন যৌগে ভিন্ন যোজনী দেখায়। যেমন আয়রন FeCl2 তে ২ এবং FeCl3 তে ৩, কপার Cu2O তে ১ এবং CuO তে ২ যোজনী দেখায়।
পানিকে সার্বজনীন দ্রাবক বলা হয় কেন?
পানির অণু পোলার, অক্সিজেন প্রান্ত আংশিক ঋণাত্মক ও হাইড্রোজেন প্রান্ত আংশিক ধনাত্মক। তাই এটি আয়নিক ও পোলার যৌগের আয়ন বা অণুকে চারদিক থেকে ঘিরে আলাদা করতে পারে, ফলে বহু পদার্থ পানিতে দ্রবীভূত হয়।
হীরা সমযোজী হয়েও এত শক্ত কেন?
হীরায় প্রতিটি কার্বন পরমাণু আরও চারটি কার্বনের সাথে শক্তিশালী সমযোজী বন্ধনে যুক্ত হয়ে বিশাল ত্রিমাত্রিক জালিকা তৈরি করে। একে ভাঙতে অসংখ্য বন্ধন ভাঙতে হয়, তাই হীরা অত্যন্ত শক্ত ও উচ্চ গলনাঙ্কবিশিষ্ট।
আরও পড়ো
সূত্র: NCTB রসায়ন, নবম-দশম শ্রেণি, অধ্যায় ৫: রাসায়নিক বন্ধন · Chemistry LibreTexts: Ionic and Covalent Bonding · Royal Society of Chemistry: Periodic Table data