চাঁদ কেন আমাদের সাথে হাঁটে? চোখের মজার ধাঁধা
· পড়তে ৭ মিনিট · ✓ তথ্য যাচাই করা
ছোট উত্তর · ১০ সেকেন্ডে
চাঁদ আসলে আমাদের পিছু নেয় না। চাঁদ প্রায় ৩ লাখ ৮৪ হাজার কিলোমিটার দূরে, তাই আমরা কয়েক কিলোমিটার হাঁটলে বা গাড়িতে চললেও চাঁদের দিক প্রায় বদলায় না। কাছের গাছ-বাড়ি দ্রুত পেছনে সরে, কিন্তু চাঁদ একই জায়গায় থাকে। এই প্যারালাক্সের কারণেই মনে হয় চাঁদ আমাদের সাথে হাঁটছে।
ছোটবেলায় রাতে রিকশায় বা বাসে বসে জানালা দিয়ে তাকিয়ে কি কখনো মনে হয়েছে, চাঁদটা যেন পিছু পিছু আসছে? আপনি এগোলে চাঁদও এগোয়, থামলে চাঁদও থামে। অনেকেই তখন ভেবেছি, চাঁদ বুঝি শুধু আমাকেই ভালোবাসে! বড় হয়েও প্রশ্নটা মাথায় থেকে যায়: চাঁদ কেন আমাদের সাথে হাঁটে? উত্তরটা আসলে আমাদের চোখ আর দূরত্বের একটা মজার খেলা। চলুন ধাঁধাটা খুলে দেখি।
চাঁদ কেন আমাদের সাথে হাঁটে? এক কথায় উত্তর
চাঁদ আসলে আপনার পিছু নেয় না। আসল ব্যাপার হলো, চাঁদ এত দূরে যে আপনি কয়েক কিলোমিটার হাঁটলেও বা গাড়িতে চললেও চাঁদের দিকটা প্রায় একটুও বদলায় না। চাঁদ সবসময় আকাশের একই জায়গায় থাকে বলে মনে হয়। অথচ আপনার আশপাশের গাছ, বাড়ি, ল্যাম্পপোস্ট দ্রুত পেছনে চলে যায়। এই দুটো মিলিয়ে মস্তিষ্ক ভাবে: সবকিছু পেছনে পড়ে যাচ্ছে, কিন্তু চাঁদ পড়ছে না, তাহলে নিশ্চয়ই চাঁদও আমার সাথে চলছে।
মানে, চাঁদ ‘সাথে হাঁটছে’ না, বরং ‘জায়গা থেকে সরছে না’। আর যে জিনিস আপনার চলার সময়ও আপনার সামনে বা পাশে একই জায়গায় থাকে, সেটাকে আমাদের মনে হয় আমাদের সঙ্গেই আসছে।
ইন্টারনেটে অনেকে ইংরেজি হরফে লিখে খোঁজেন ‘chad keno amader sathe hate’, কেউ লেখেন ‘চাঁদ কেন পিছু পিছু আসে’। প্রশ্ন যেভাবেই করুন, উত্তর একটাই: দূরত্ব। পৃথিবীর সব মানুষ, ঢাকার ছাদ থেকে রাজশাহীর মাঠ পর্যন্ত, প্রায় একই দিকে চাঁদ দেখেন। কেউ পূর্বে হাঁটলে, কেউ পশ্চিমে, সবার কাছেই চাঁদ যেন সঙ্গী হয়ে চলে। তাহলে দেখা যাক, দূরত্ব ঠিক কীভাবে এই খেলাটা খেলে।
কাছের গাছ দৌড়ায়, দূরের চাঁদ দাঁড়িয়ে থাকে (প্যারালাক্স)
এই খেলার একটা বৈজ্ঞানিক নাম আছে: প্যারালাক্স। প্যারালাক্স কি? সহজ কথায়, আপনি জায়গা বদলালে কাছের জিনিস পেছনের দৃশ্যের তুলনায় অনেকটা সরে যায় বলে মনে হয়, আর দূরের জিনিস সরে খুব কম। যত দূরে, তত কম সরে।
ঘরে বসেই পরীক্ষা করুন। একটা আঙুল চোখের সামনে খাড়া করে ধরুন। এবার একবার বাঁ চোখ বন্ধ করুন, একবার ডান চোখ। আঙুলটা পেছনের দেয়ালের তুলনায় লাফিয়ে লাফিয়ে সরছে, তাই না? এবার আঙুলটা হাত পুরো লম্বা করে দূরে ধরুন, আবার চোখ বদলান। এবার লাফটা অনেক ছোট। দুই চোখের মাঝে মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার দূরত্ব, তাতেই কাছের জিনিস অনেক সরে।
- 🚶আপনি এগোলেন
- 🌳কাছের গাছ পেছনে গেল
- ⛰️দূরের পাহাড় একটু সরল
- 🌕চাঁদ প্রায় একই জায়গায়
বাসে বসে রাস্তার পাশের গাছ ঝড়ের বেগে পেছনে যায়। একটু দূরের ধানক্ষেতের ওপারের গ্রাম ধীরে ধীরে সরে। আরও দূরের পাহাড় বা টাওয়ার যেন অনেকক্ষণ একই জায়গায় থাকে। আর চাঁদ? চাঁদ এত দূরে যে ঘণ্টাখানেক বাস চললেও তার দিক এক ডিগ্রিও বদলায় না। তাই চাঁদ আমাদের পিছু পিছু আসে বলে মনে হয়।
জানেন কি?ট্যাপ করে দেখুন
বিজ্ঞানীরা এই প্যারালাক্স দিয়েই কাছের তারাদের দূরত্ব মাপেন। পৃথিবী সূর্যের চারপাশে ঘোরার সময় ছয় মাস পরপর দুই জায়গা থেকে একটা তারাকে দেখলে, সেটা দূরের তারাদের তুলনায় সামান্য সরে যায়। যত কম সরে, তারাটা তত দূরে। আঙুলের খেলা আর তারা মাপার অঙ্ক আসলে একই।
চাঁদ আসলে কত দূরে?
NASA-র হিসাবে চাঁদ পৃথিবী থেকে গড়ে প্রায় ৩ লাখ ৮৪ হাজার কিলোমিটার দূরে। চাঁদ কত দূরে, সেটা একটু অনুভব করার চেষ্টা করি। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম সড়কপথে প্রায় আড়াইশো কিলোমিটার। এমন পথ প্রায় দেড় হাজার বার গেলে তবে চাঁদে পৌঁছাবেন। পাশাপাশি প্রায় ৩০টা পৃথিবী সাজালে তবে চাঁদের দূরত্ব পূরণ হয়।
৩,৮৪,৪০০কিমি
পৃথিবী থেকে চাঁদের গড় দূরত্ব
পাশাপাশি প্রায় ৩০টা পৃথিবী রাখলে যত দূর
এবার ভাবুন, আপনি বাসে ১০ কিলোমিটার গেলেন। চাঁদের দূরত্বের তুলনায় এটা প্রায় ৪০ হাজার ভাগের এক ভাগ। ব্যাপারটা এমন, যেন ৪০ মিটার দূরের একটা বাতি দেখতে দেখতে আপনি মাত্র এক মিলিমিটার সরলেন। বাতিটার দিক কি একটুও বদলাবে? না। চাঁদের বেলাতেও তাই।
মজার ব্যাপার, পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে গেলে, মানে প্রায় ১২ হাজার কিলোমিটারের বেশি সরলে, তখন চাঁদের অবস্থান পেছনের তারাদের তুলনায় সামান্য, প্রায় দুই ডিগ্রির মতো আলাদা দেখায়। জ্যোতির্বিদরা এই ধরনের ছোট্ট পার্থক্য কাজে লাগিয়েই চাঁদের দূরত্ব হিসাব করেছেন।
বাস-ট্রেনে বসে নিজে পরীক্ষা করুন
পরেরবার রাতে বাস, ট্রেন বা রিকশায় চড়লে এই ছোট্ট পরীক্ষাটা করুন। এতে বোঝা যাবে চাঁদ কেন আমাদের সাথে হাঁটে, নিজের চোখেই।
- জানালার পাশে বসুন, এমন সময় যখন চাঁদ আকাশে দেখা যায়।
- জানালার ফ্রেমের কোনো একটা কোণ বা দাগ ঠিক করুন, যার সাথে চাঁদ মিলিয়ে দেখবেন।
- মাথা না নাড়িয়ে চাঁদকে সেই দাগের পাশে রাখুন।
- কয়েক মিনিট পর দেখুন: গাছ-বাড়ি অনেক পেছনে গেছে, কিন্তু চাঁদ প্রায় সেই দাগের পাশেই।
- রাস্তা বাঁক নিলে দেখবেন চাঁদ জানালার এক পাশ থেকে আরেক পাশে চলে গেল। চাঁদ সরেনি, আপনার বাস ঘুরেছে।
আরেকটা মজার কথা। আপনি আর আপনার বন্ধু যদি একই সময়ে দুই উল্টো দিকে হাঁটেন, দুজনেরই মনে হবে চাঁদ তার সাথে যাচ্ছে। চাঁদ তো একসাথে দুই দিকে যেতে পারে না! এটাই প্রমাণ যে চাঁদ আসলে কারও পিছু নিচ্ছে না, শুধু অনেক দূরে বলে সবার কাছেই একই জায়গায় দেখায়।
চাঁদ তাহলে কি একেবারেই নড়ে না?
নড়ে, তবে অন্য কারণে। পৃথিবী নিজের অক্ষে ঘোরে বলে চাঁদ পূর্ব দিকে ওঠে আর পশ্চিমে অস্ত যায়, সূর্যের মতোই। আর চাঁদ নিজে পৃথিবীর চারপাশে প্রায় সাড়ে ২৭ দিনে একবার ঘোরে। এই কারণে প্রতিদিন চাঁদ প্রায় ৫০ মিনিট দেরিতে ওঠে। কিন্তু এসব চলাচল ধীরে ধীরে ঘণ্টা জুড়ে হয়, বাসের জানালা দিয়ে কয়েক মিনিটে তা চোখে পড়ে না।
টেলিস্কোপে চাঁদ দেখলে কী দেখবেন
খালি চোখে চাঁদকে একটা উজ্জ্বল থালা মনে হয়, কালো-ধূসর কিছু দাগসহ। কিন্তু ছোট একটা বাইনোকুলার বা টেলিস্কোপ হাতে নিলে পুরো জগৎ বদলে যায়। চাঁদ হলো শুরু করার জন্য সবচেয়ে সহজ আর সবচেয়ে সুন্দর লক্ষ্য, কারণ এটা উজ্জ্বল, বড় আর ঢাকার আলোর দূষণেও পরিষ্কার দেখা যায়।
- সাধারণ ১০ গুণের বাইনোকুলারে: বড় বড় কালো ‘সাগর’ (আসলে জমাট লাভার সমভূমি) আর উজ্জ্বল পাহাড়ি এলাকা।
- ছোট টেলিস্কোপে ৩০–৫০ গুণে: অসংখ্য গর্ত বা ক্রেটার, পাহাড়ের সারি, গর্তের মাঝখানে চূড়া।
- আলো-আঁধারের সীমানায় (টার্মিনেটর): পাহাড়ের লম্বা ছায়া, সবচেয়ে ত্রিমাত্রিক দৃশ্য।
টেলিস্কোপে চাঁদ দেখার সময় আরেকটা মজা খেয়াল করবেন। চাঁদ দৃষ্টিক্ষেত্র থেকে বেশ দ্রুত সরে যায়, তাই বারবার টেলিস্কোপ ঘুরিয়ে আনতে হয়। এটা চাঁদের দোষ না, পৃথিবীর ঘূর্ণনের কারণে। বাসে বসে যে চাঁদকে স্থির মনে হয়, বেশি বিবর্ধনে সেই চাঁদকেই চলমান দেখায়। চাঁদের আরও কাছ থেকে পরিচয় পেতে ঘুরে আসুন আমাদের [চাঁদের যাত্রা](/journey/moon) পাতায়, আর ঢাকার আকাশে আর কী কী দেখা যায় জানতে পড়ুন [ঢাকা থেকে কী দেখবেন](/guides/what-to-see-from-dhaka)।
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
সূর্যও কি আমাদের সাথে হাঁটে?
হ্যাঁ, একই কারণে। সূর্য চাঁদের চেয়েও প্রায় ৪০০ গুণ দূরে, প্রায় ১৫ কোটি কিলোমিটার। তাই আপনি যত দূরেই হাঁটুন, সূর্যের দিক প্রায় একটুও বদলায় না। তবে সূর্যের দিকে কখনো সরাসরি তাকাবেন না, চোখের ক্ষতি হতে পারে।
দিগন্তে চাঁদ এত বড় দেখায় কেন?
এটা ‘চাঁদের বিভ্রম’ বা মুন ইলিউশন। মাপলে দেখা যায়, দিগন্তে আর মাথার ওপরে চাঁদ প্রায় একই মাপের। গাছ-বাড়ির পাশে দেখলে আমাদের মস্তিষ্ক চাঁদকে বড় ভেবে নেয়। ক্যামেরায় দুই সময়ে ছবি তুলে মিলিয়ে দেখলেই বুঝবেন।
চাঁদ কি সত্যিই পৃথিবী থেকে সরে যাচ্ছে?
হ্যাঁ, তবে খুব ধীরে, বছরে প্রায় ৩.৮ সেন্টিমিটার, মোটামুটি আমাদের নখ বাড়ার গতিতে। অ্যাপোলো নভোচারীদের রেখে আসা আয়নায় লেজার পাঠিয়ে বিজ্ঞানীরা এটা মেপেছেন। পৃথিবীর জোয়ার-ভাটার টানই এর কারণ। বিস্তারিত পড়ুন: [চাঁদ কি দূরে সরে যাচ্ছে?](/scheduled/moon-moving-away)
দিনের বেলা চাঁদ দেখা যায় কেন?
চাঁদ নিজে আলো দেয় না, সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে। চাঁদ প্রায় অর্ধেক সময় দিনের আকাশেও থাকে, আর সূর্যের আলোয় যথেষ্ট উজ্জ্বল হয় বলে নীল আকাশের মধ্যেও দেখা যায়। বিশেষ করে প্রথম বা শেষ চতুর্থাংশের সময় বিকেলে বা সকালে সহজে চোখে পড়ে।
নিজে দেখুন
আজ রাতে চাঁদ উঠলে ছাদে বা বারান্দায় যান। প্রথমে খালি চোখে আঙুলের প্যারালাক্স পরীক্ষাটা করুন, তারপর বাইনোকুলার বা ছোট টেলিস্কোপে আলো-আঁধারের সীমানার গর্তগুলো দেখুন। টেলিস্কোপ আর বাইনোকুলার পাবেন আমাদের [দোকানে](/shop)।
ছোট্ট যাচাই
কতটা মনে আছে, দেখে নিন
১. চাঁদ পৃথিবী থেকে প্রায় কত দূরে?
২. পূর্ণিমার রাত চাঁদের গর্ত দেখার সেরা সময় নয় কেন?
তথ্যসূত্র
- ১NASA Science — Moon facts (distance) science.nasa.gov ↗
- ২NASA Science — Moon phases science.nasa.gov ↗
- ৩Moon illusion (Wikipedia) en.wikipedia.org ↗
- ৪NASA Science — Tides (laser ranging to lunar reflectors) science.nasa.gov ↗
- ৫Lunar Laser Ranging experiments (Wikipedia) en.wikipedia.org ↗
- ৬Stellar parallax (Wikipedia) — six-month baseline method en.wikipedia.org ↗
- ৭NASA Space Place — How far away is the Moon? spaceplace.nasa.gov ↗
- ৮Moonrise and moonset (Wikipedia) — ~50 min later each day en.wikipedia.org ↗
- ৯Lunar distance (Wikipedia) — lunar parallax method en.wikipedia.org ↗
কৃতজ্ঞতা
- তথ্য যাচাই: ২৫ অক্টোবর, ২০২৬