পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র কীভাবে কাজ করে? রূপপুরের ভেতরে কী ঘটে
· পড়তে ৮ মিনিট · ✓ তথ্য যাচাই করা
ছোট উত্তর · ১০ সেকেন্ডে
পারমাণবিক কেন্দ্রে ইউরেনিয়াম-২৩৫ পরমাণু নিউট্রনের আঘাতে ভেঙে যায়, যাকে ফিশন বলে, আর তাতে প্রচণ্ড তাপ বের হয়। সেই তাপে পানি গরম হয়ে বাষ্প তৈরি হয়, বাষ্প টারবাইন ঘোরায়, টারবাইন জেনারেটর ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ বানায়। রূপপুরের চাপযুক্ত পানির রিঅ্যাকটর এভাবেই কাজ করে, কয়েক স্তরের নিরাপত্তা দেয়ালের ভেতরে।
পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মার পাড়ে বিশাল গম্বুজওয়ালা কয়েকটা ভবন, পাশে আকাশছোঁয়া কুলিং টাওয়ার। এটাই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। অনেকে শুনেই ভাবেন, ভেতরে বুঝি কোনো রহস্যময় যন্ত্র আছে যা সরাসরি 'পরমাণু থেকে বিদ্যুৎ' বানায়। আসল ব্যাপারটা কিন্তু অনেক বেশি পরিচিত। একটা পারমাণবিক কেন্দ্র আসলে বিশাল এক কেটলি: পানি গরম করে বাষ্প বানায়, সেই বাষ্প টারবাইন ঘোরায়, টারবাইন ঘোরায় জেনারেটর। পার্থক্য শুধু আগুনের উৎসে। চলুন ধাপে ধাপে দেখি, ভেতরে ঠিক কী ঘটে।
সংক্ষেপে: পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র কীভাবে কাজ করে?
কয়লা বা গ্যাসের কেন্দ্রে জ্বালানি পুড়িয়ে তাপ পাওয়া যায়। পারমাণবিক কেন্দ্রে কিছুই পোড়ে না। সেখানে ইউরেনিয়ামের পরমাণুর কেন্দ্র (নিউক্লিয়াস) ভেঙে দুই টুকরো হয়, আর সেই ভাঙনে বের হয় প্রচণ্ড তাপ। এই প্রক্রিয়ার নাম নিউক্লীয় বিভাজন বা ফিশন। তাপ দিয়ে পানি গরম হয়, তৈরি হয় উচ্চচাপের বাষ্প, আর বাকিটা সাধারণ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতোই।
ফিশন: এক পরমাণু ভাঙলে এত শক্তি কেন?
ইউরেনিয়ামের একটা বিশেষ রূপ আছে, ইউরেনিয়াম-২৩৫। এর নিউক্লিয়াসে একটা ধীরগতির নিউট্রন এসে ঢুকলে নিউক্লিয়াসটা টলমল করে ওঠে, তারপর দুটো ছোট পরমাণুতে ভেঙে যায়। সাথে ছিটকে বের হয় দুই-তিনটা নতুন নিউট্রন আর বিপুল শক্তি।
শক্তিটা আসে কোথা থেকে? ভাঙার পর টুকরোগুলোর মোট ভর মূল পরমাণুর চেয়ে সামান্য কম হয়। হারানো সেই ভরটুকুই আইনস্টাইনের বিখ্যাত সূত্র E = mc² অনুযায়ী শক্তিতে বদলে যায়। আলোর বেগের বর্গ এত বিশাল একটা সংখ্যা যে খুব সামান্য ভরও বিপুল শক্তি দেয়।
জানেন কি?ট্যাপ করে দেখুন
মজার তথ্য: এক কেজি ইউরেনিয়াম-২৩৫ পুরোপুরি ফিশন হলে যে তাপ পাওয়া যায়, তা পেতে প্রায় দুই-তিন হাজার টন কয়লা পোড়াতে হতো। এজন্যই ছোট্ট আঙুলের মাথার মতো একটা জ্বালানি বড়ি একটা পরিবারের বহু মাসের বিদ্যুতের সমান শক্তি ধরে রাখে।
নতুন বের হওয়া নিউট্রনগুলো আবার অন্য ইউরেনিয়াম পরমাণুকে ভাঙতে পারে, সেগুলো থেকে আরও নিউট্রন বের হয়। এটাকে বলে চেইন রিঅ্যাকশন বা শিকল বিক্রিয়া। পারমাণবিক বোমায় এই শিকল নিয়ন্ত্রণহীনভাবে মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পুরো প্রকৌশল আসলে এই শিকলকে শান্ত, স্থির আর নিয়ন্ত্রিত রাখার কৌশল, যাতে প্রতিটা ফিশন থেকে গড়ে ঠিক একটা নিউট্রনই পরের ফিশন ঘটায়।
রিঅ্যাকটরের ভেতরে কী কী থাকে?
রূপপুরের রিঅ্যাকটর রুশ নকশার VVER-1200 ধরনের, যা একটা চাপযুক্ত পানির রিঅ্যাকটর (Pressurized Water Reactor বা PWR)। পৃথিবীর বেশিরভাগ পারমাণবিক কেন্দ্রই এই পরিবারের। এর মূল অংশগুলো এরকম:
- জ্বালানি: ইউরেনিয়াম অক্সাইডের ছোট সিরামিক বড়ি, যেখানে ইউরেনিয়াম-২৩৫ কয়েক শতাংশে সমৃদ্ধ করা। বড়িগুলো ধাতব নলে ভরে বানানো হয় জ্বালানি দণ্ড, আর অনেক দণ্ড একসাথে বেঁধে জ্বালানি গুচ্ছ।
- মডারেটর (গতিরোধক): নিউট্রন খুব দ্রুত ছোটে, আর দ্রুত নিউট্রন ইউরেনিয়াম-২৩৫ ভাঙতে ভালো পারে না। সাধারণ পানি নিউট্রনের গতি কমিয়ে দেয়, ফলে ফিশন চালু থাকে।
- কুল্যান্ট (শীতলক): সেই একই পানি জ্বালানি থেকে তাপ টেনে নিয়ে যায়।
- নিয়ন্ত্রণ দণ্ড: বোরনের মতো নিউট্রন-শোষক পদার্থের দণ্ড। ভেতরে ঢোকালে নিউট্রন শুষে নেয়, বিক্রিয়া কমে; তুলে নিলে বাড়ে। পানিতে মেশানো বোরিক অ্যাসিডও সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
- রিঅ্যাকটর চাপপাত্র: পুরু ইস্পাতের বিশাল পাত্র, যার ভেতরে এসব থাকে।
তাপ থেকে বিদ্যুৎ: তিনটা আলাদা পানির চক্র
PWR-এর সবচেয়ে চতুর দিক হলো, রিঅ্যাকটরের পানি কখনো টারবাইনে যায় না। কাজটা হয় আলাদা আলাদা চক্রে:
- প্রথম চক্র: রিঅ্যাকটরের ভেতরের পানি তিনশো ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি গরম হয়, কিন্তু প্রচণ্ড চাপে থাকায় ফোটে না। এই গরম পানি পাম্প দিয়ে স্টিম জেনারেটরে পাঠানো হয়, তারপর আবার রিঅ্যাকটরে ফেরে।
- দ্বিতীয় চক্র: স্টিম জেনারেটরে হাজারো সরু নলের ভেতর দিয়ে প্রথম চক্রের গরম পানি যায়, নলের বাইরের আলাদা পানিকে ফুটিয়ে বাষ্প বানায়। দুই পানি কখনো মেশে না। এই বাষ্প টারবাইনের পাখা ঘোরায়, টারবাইনের সাথে লাগানো জেনারেটর তৈরি করে বিদ্যুৎ।
- তৃতীয় চক্র: কাজ শেষে বাষ্পকে আবার পানি বানাতে হয়। কনডেনসারে ঠান্ডা পানি দিয়ে তাকে ঠান্ডা করা হয়, আর সেই ঠান্ডা পানির তাপ কুলিং টাওয়ার দিয়ে বাতাসে ছেড়ে দেওয়া হয়।
নিরাপত্তা: কয়েক স্তরের দেয়াল
পারমাণবিক নিরাপত্তার মূল দর্শনের নাম 'গভীরতায় সুরক্ষা' (Defence in Depth)। মানে একটা বাধা ব্যর্থ হলেও পরেরটা যেন থাকে। তেজস্ক্রিয় পদার্থ আর বাইরের পরিবেশের মাঝে থাকে একের পর এক দেয়াল:
- সিরামিক জ্বালানি বড়ি নিজেই বেশিরভাগ তেজস্ক্রিয় টুকরো আটকে রাখে।
- বড়ির চারপাশের সিলবন্ধ ধাতব নল দ্বিতীয় দেয়াল।
- পুরু ইস্পাতের রিঅ্যাকটর চাপপাত্র ও প্রথম চক্রের বন্ধ পাইপ তৃতীয় দেয়াল।
- সবশেষে কংক্রিট আর ইস্পাতের বিশাল গম্বুজ, যাকে বলে কন্টেইনমেন্ট। VVER-1200-এ এটা দুই স্তরের: ভেতরেরটা চাপ সামলায়, বাইরেরটা ঝড়, ভূমিকম্প বা বাইরের আঘাত থেকে রক্ষা করে।
এর সাথে আছে কিছু 'নিষ্ক্রিয়' (passive) নিরাপত্তা ব্যবস্থা, যা বিদ্যুৎ বা মানুষের হাত ছাড়াই কাজ করে। যেমন জরুরি অবস্থায় নিয়ন্ত্রণ দণ্ডগুলো নিজের ওজনেই রিঅ্যাকটরে পড়ে গিয়ে কয়েক সেকেন্ডে বিক্রিয়া থামিয়ে দেয়। উঁচুতে রাখা পানির ট্যাংক মাধ্যাকর্ষণের টানে কোর ঠান্ডা করতে পারে। আর VVER-1200 নকশায় আছে 'কোর ক্যাচার': সবচেয়ে খারাপ দুর্ঘটনায় জ্বালানি গলে গেলেও তা কন্টেইনমেন্টের নিচে একটা বিশেষ পাত্রে ধরা পড়ে, মাটি বা পানিতে যেতে পারে না।
পদার্থবিজ্ঞানও এখানে সাহায্য করে। পানি গরম হয়ে বেশি ফুটলে বা হালকা হলে নিউট্রনের গতি কম কমায়, ফলে ফিশন আপনাআপনি কমে যায়। অর্থাৎ রিঅ্যাকটর অতিরিক্ত গরম হতে চাইলে প্রকৃতিই তাকে ব্রেক কষে।
জ্বালানি সমৃদ্ধকরণ কেন দরকার?
প্রকৃতিতে যে ইউরেনিয়াম পাওয়া যায়, তার একশো ভাগের মধ্যে এক ভাগেরও কম হলো ইউরেনিয়াম-২৩৫; বাকিটা প্রায় সবই ইউরেনিয়াম-২৩৮, যা সহজে ভাঙে না। সাধারণ পানির রিঅ্যাকটরে শিকল বিক্রিয়া চালু রাখতে এই অনুপাত কয়েক শতাংশে তুলতে হয়। এই কাজকে বলে সমৃদ্ধকরণ। সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম গুঁড়ো করে চাপ দিয়ে ছোট বড়ি বানানো হয়, তারপর উচ্চ তাপে পুড়িয়ে শক্ত সিরামিক করা হয়, অনেকটা মাটির পাত্র পোড়ানোর মতো।
কন্ট্রোল রুম: কেন্দ্রের মস্তিষ্ক
পুরো কেন্দ্রটা চলে একটা কন্ট্রোল রুম থেকে, যেখানে দিনরাত পালা করে প্রশিক্ষিত অপারেটররা বসে থাকেন। দেয়ালজোড়া পর্দায় দেখা যায় রিঅ্যাকটরের তাপমাত্রা, চাপ, পানির প্রবাহ, নিউট্রনের মাত্রা আর হাজারো সেন্সরের খবর। কোনো মান নিরাপদ সীমা ছাড়ালে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা নিজেই রিঅ্যাকটর বন্ধ করে দেয়, অপারেটরের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করে না। অপারেটরদের প্রশিক্ষণও হয় হুবহু একই রকম একটা নকল কন্ট্রোল রুমে, যাকে বলে সিমুলেটর। সেখানে তাঁরা বারবার বিরল দুর্ঘটনার অনুশীলন করেন, যাতে বাস্তবে কখনো দরকার হলে হাত না কাঁপে।
একটা মজার বিষয় হলো, রিঅ্যাকটর বন্ধ করার পরও তাপ পুরোপুরি থামে না। ফিশনে তৈরি টুকরোগুলো নিজেরাই তেজস্ক্রিয়, তারা ক্ষয় হতে হতে বেশ কিছুদিন তাপ ছাড়তে থাকে। একে বলে 'ক্ষয়-তাপ' (decay heat)। ফুকুশিমার দুর্ঘটনা ঘটেছিল ঠিক এখানেই: রিঅ্যাকটর বন্ধ হয়েছিল, কিন্তু সুনামিতে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় পাম্প থেমে যায়, আর ক্ষয়-তাপ সরানো যায়নি। এই শিক্ষা থেকেই নতুন নকশাগুলোতে বিদ্যুৎ ছাড়া কাজ করা নিষ্ক্রিয় শীতলীকরণ ব্যবস্থার ওপর এত জোর দেওয়া হয়।
ব্যবহৃত জ্বালানির কী হয়?
কয়েক বছর কাজ করার পর জ্বালানি গুচ্ছ বদলাতে হয়। তখনো সেগুলো খুব তেজস্ক্রিয় আর গরম থাকে। প্রথমে রিঅ্যাকটরের পাশেই গভীর পানির পুলে রেখে ঠান্ডা করা হয়; পানি একই সাথে বিকিরণ আটকানোর ঢাল। রূপপুরের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার চুক্তি অনুযায়ী ব্যবহৃত জ্বালানি রাশিয়ায় ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, পুরো জীবনে একটা বড় কেন্দ্রের ব্যবহৃত জ্বালানি পরিমাণে খুব সামান্য জায়গা নেয়, কিন্তু তার তত্ত্বাবধান করতে হয় বহু প্রজন্ম ধরে।
কেন পারমাণবিক বিদ্যুৎ, আর কোথায় চিন্তা?
সুবিধা হলো, চালু অবস্থায় এটা কার্বন ডাই-অক্সাইড ছাড়ে না, রোদ-বাতাসের ওপর নির্ভর না করে দিনরাত টানা বিদ্যুৎ দেয়, আর খুব কম জায়গায় বিপুল শক্তি তৈরি করে। চিন্তার দিক হলো নির্মাণের বিশাল খরচ ও সময়, দীর্ঘমেয়াদি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, আর দুর্ঘটনার ঝুঁকি, যত কমই হোক। চেরনোবিল আর ফুকুশিমা দেখিয়েছে, নকশা, প্রশিক্ষণ আর নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীনতা কতটা জরুরি। এজন্য আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) নিরাপত্তার মানদণ্ড ঠিক করে আর দেশগুলোর কেন্দ্র পর্যালোচনা করে।
তাই পরের বার রূপপুরের গম্বুজের ছবি দেখলে মনে করবেন: ভেতরে আসলে অদৃশ্য নিউট্রনের এক সূক্ষ্ম নাচ চলছে, যার প্রতিটা ধাপ মাপা, আর যার শেষ ফল আমাদের ঘরের সুইচ টিপলে জ্বলে ওঠা আলো।
নিজে দেখুন
নিজে দেখুন: কয়েকটা ডমিনো সোজা এক লাইনে দাঁড় করিয়ে প্রথমটা ফেলুন, তারপর ছড়ানো গাছের মতো সাজিয়ে আবার ফেলুন। দ্বিতীয়বার কত দ্রুত সব পড়ে যায় দেখবেন। এটাই চেইন রিঅ্যাকশন। এবার মাঝে মাঝে আঙুল দিয়ে কয়েকটা ডমিনো আটকে দিন, ঠিক যেমন নিয়ন্ত্রণ দণ্ড নিউট্রন শুষে নিয়ে শিকলটাকে শান্ত রাখে।
ছোট্ট যাচাই
কতটা মনে আছে, দেখে নিন
১. কুলিং টাওয়ার থেকে ওঠা সাদা মেঘ আসলে কী?
২. জরুরি অবস্থায় নিয়ন্ত্রণ দণ্ড কীভাবে বিক্রিয়া থামায়?
তথ্যসূত্র
কৃতজ্ঞতা
- তথ্য যাচাই: ১ নভেম্বর, ২০২৬