এসএসসি পদার্থবিজ্ঞান · অধ্যায় ১২
বিদ্যুতের চৌম্বক ক্রিয়া
এক কথায়
তারের মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহিত হলে তারের চারপাশে চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি হয়, এটিই বিদ্যুতের চৌম্বক ক্রিয়া। এর উপর ভিত্তি করে তড়িৎচুম্বক ও মোটর চলে। উল্টোভাবে, কুণ্ডলীর সাথে জড়িত চৌম্বক ক্ষেত্র বদলালে কুণ্ডলীতে তড়িৎ আবিষ্ট হয়, যা জেনারেটর ও ট্রান্সফরমারের মূলনীতি।
ওরস্টেডের আবিষ্কার: তার থেকে চুম্বক
১৮২০ সালে ডেনমার্কের বিজ্ঞানী হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান ওরস্টেড লক্ষ করেন, তড়িৎবাহী তারের কাছে রাখা কম্পাস কাঁটা বিক্ষিপ্ত হয়। প্রবাহ বন্ধ করলে কাঁটা আবার উত্তর-দক্ষিণে ফিরে যায়, আর প্রবাহের দিক উল্টালে কাঁটাও উল্টো দিকে ঘোরে।
এ থেকে বোঝা গেল, চলমান আধান অর্থাৎ তড়িৎপ্রবাহ তার চারপাশে চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করে। তড়িৎ ও চুম্বকত্ব যে আলাদা কিছু নয়, একই প্রকৃতির দুই রূপ, এই আবিষ্কার সেই ধারণার শুরু। চৌম্বক ক্ষেত্রের তীব্রতার (চৌম্বক ফ্লাক্স ঘনত্ব) SI একক টেসলা (T)।
সোজা তারের চারপাশে চৌম্বক ক্ষেত্র ও ডান হাতের নিয়ম
একটি লম্বা সোজা তড়িৎবাহী তারের চারপাশে চৌম্বক বলরেখাগুলো তারকে কেন্দ্র করে সমকেন্দ্রিক বৃত্তাকারে থাকে। তারের যত কাছে, ক্ষেত্র তত শক্তিশালী; প্রবাহ বাড়ালেও ক্ষেত্র বাড়ে।
বলরেখার দিক বের করতে ডান হাতের মুষ্টি নিয়ম কাজে লাগে: ডান হাতে তারটি এমনভাবে মুঠো করে ধরো যেন বুড়ো আঙুল প্রবাহের দিক দেখায়; তাহলে বাকি আঙুলগুলো যেদিকে বাঁকানো থাকে সেটিই চৌম্বক বলরেখার দিক।
সলিনয়েড ও তড়িৎচুম্বক
অন্তরিত তারকে স্প্রিংয়ের মতো অনেক পাকে প্যাঁচালে তাকে সলিনয়েড বলে। এতে তড়িৎ চালালে এটি ঠিক একটি দণ্ড চুম্বকের মতো আচরণ করে: এক প্রান্ত উত্তর মেরু, অন্য প্রান্ত দক্ষিণ মেরু। ভেতরে ক্ষেত্র প্রায় সুষম ও শক্তিশালী।
সলিনয়েডের ভেতরে কাঁচা লোহার মজ্জা ঢোকালে ক্ষেত্র বহুগুণ বেড়ে যায়, একে তড়িৎচুম্বক বলে। প্রবাহ বন্ধ করলেই কাঁচা লোহা চুম্বকত্ব প্রায় হারিয়ে ফেলে, তাই ইচ্ছেমতো চালু-বন্ধ করা যায়। ইস্পাত ব্যবহার করলে চুম্বকত্ব থেকে যায়, তাই তড়িৎচুম্বকে কাঁচা লোহাই উপযুক্ত।
- তড়িৎচুম্বকের শক্তি বাড়ে: প্যাঁচের সংখ্যা বাড়ালে, প্রবাহ বাড়ালে, কাঁচা লোহার মজ্জা ব্যবহার করলে।
- ব্যবহার: বৈদ্যুতিক ঘণ্টা, রিলে, লাউডস্পিকার, স্ক্র্যাপ লোহা তোলার ক্রেন, MRI যন্ত্র।
চৌম্বক ক্ষেত্রে তড়িৎবাহী তারের উপর বল ও মোটর
চৌম্বক ক্ষেত্রের মধ্যে কোনো তড়িৎবাহী তার রাখলে তারটি একটি বল অনুভব করে। তার ক্ষেত্রের সাথে লম্ব হলে বল সবচেয়ে বেশি, সমান্তরাল হলে বল শূন্য।
বলের দিক বের করতে ফ্লেমিংয়ের বাম হাতের নিয়ম: বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি, তর্জনী ও মধ্যমা পরস্পর লম্বভাবে ছড়াও। তর্জনী চৌম্বক ক্ষেত্রের দিক ও মধ্যমা প্রবাহের দিক নির্দেশ করলে বৃদ্ধাঙ্গুলি বলের (গতির) দিক দেখাবে।
বৈদ্যুতিক মোটর এই নীতিতে চলে: চুম্বকের দুই মেরুর মাঝে একটি আয়তাকার কুণ্ডলীর দুই বাহুতে বিপরীত দিকে বল পড়ে, ফলে কুণ্ডলী ঘোরে। বিভক্ত বলয় বা কম্যুটেটর প্রতি অর্ধ-ঘূর্ণনে প্রবাহের দিক উল্টে দেয়, যাতে ঘূর্ণন একই দিকে চলতে থাকে। মোটর তড়িৎশক্তিকে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তর করে।
তড়িৎচৌম্বক আবেশ: চুম্বক থেকে তড়িৎ
১৮৩১ সালে মাইকেল ফ্যারাডে দেখান, একটি কুণ্ডলীর কাছে চুম্বক নাড়ালে কুণ্ডলীর সাথে যুক্ত গ্যালভানোমিটারের কাঁটা নড়ে। চুম্বক স্থির থাকলে কোনো প্রবাহ নেই। অর্থাৎ কুণ্ডলীর সাথে জড়িত চৌম্বক ফ্লাক্স পরিবর্তিত হলেই তড়িচ্চালক শক্তি ও প্রবাহ আবিষ্ট হয়। একে তড়িৎচৌম্বক আবেশ বলে।
আবিষ্ট তড়িচ্চালক শক্তি ফ্লাক্স পরিবর্তনের হারের সমানুপাতিক। তাই চুম্বক দ্রুত নাড়ালে, কুণ্ডলীর পাক বেশি হলে বা শক্তিশালী চুম্বক নিলে আবিষ্ট প্রবাহ বেশি হয়। লেঞ্জের সূত্র অনুযায়ী আবিষ্ট প্রবাহের দিক এমন হয় যে তা তার সৃষ্টির কারণকেই বাধা দেয়, যা আসলে শক্তির সংরক্ষণ নীতিরই প্রকাশ।
চৌম্বক ক্ষেত্রে পরিবাহী নড়লে আবিষ্ট প্রবাহের দিক বের করতে ফ্লেমিংয়ের ডান হাতের নিয়ম: তর্জনী ক্ষেত্রের দিক, বৃদ্ধাঙ্গুলি পরিবাহীর গতির দিক দেখালে মধ্যমা আবিষ্ট প্রবাহের দিক দেখায়।
জেনারেটর বা ডায়নামো
জেনারেটর যান্ত্রিক শক্তিকে তড়িৎশক্তিতে রূপান্তর করে। শক্তিশালী চুম্বকের মেরুদ্বয়ের মাঝে একটি কুণ্ডলী ঘোরালে কুণ্ডলীর সাথে জড়িত ফ্লাক্স অনবরত বদলায়, ফলে তড়িৎ আবিষ্ট হয়।
প্রতি অর্ধ-ঘূর্ণনে আবিষ্ট প্রবাহের দিক উল্টে যায়, তাই সরাসরি পাওয়া যায় পরিবর্তী প্রবাহ (AC)। স্লিপ রিং ব্যবহার করলে AC জেনারেটর, আর বিভক্ত বলয় ব্যবহার করলে বাইরের বর্তনীতে একমুখী প্রবাহ বা DC পাওয়া যায়। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ AC, কম্পাঙ্ক 50 Hz, অর্থাৎ প্রবাহ প্রতি সেকেন্ডে ৫০ বার পূর্ণ চক্র সম্পন্ন করে।
ট্রান্সফরমার
ট্রান্সফরমার পারস্পরিক আবেশের মাধ্যমে পরিবর্তী বিভবকে বাড়ায় বা কমায়। একটি কোমল লোহার পাতলা পাত জোড়া দেওয়া মজ্জার উপর দুটি কুণ্ডলী থাকে: মুখ্য কুণ্ডলী (ইনপুট) ও গৌণ কুণ্ডলী (আউটপুট)। মুখ্য কুণ্ডলীর পরিবর্তী প্রবাহ মজ্জায় পরিবর্তী ফ্লাক্স তৈরি করে, যা গৌণ কুণ্ডলীতে তড়িচ্চালক শক্তি আবিষ্ট করে।
DC তে ফ্লাক্স বদলায় না, তাই ট্রান্সফরমার শুধু AC তে কাজ করে। গৌণে পাক বেশি হলে বিভব বাড়ে (স্টেপ-আপ), কম হলে কমে (স্টেপ-ডাউন)। আদর্শ ট্রান্সফরমারে কোনো শক্তি ক্ষয় হয় না, তাই বিভব যতগুণ বাড়ে প্রবাহ ততগুণ কমে। মজ্জা পাতলা পাত দিয়ে বানানো হয় যাতে ঘূর্ণি প্রবাহজনিত তাপক্ষয় কমে।
বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে দূরে বিদ্যুৎ পাঠাতে স্টেপ-আপ ট্রান্সফরমারে বিভব অনেক বাড়িয়ে প্রবাহ কমানো হয়, কারণ তারে তাপক্ষয় I²R, প্রবাহের বর্গের সমানুপাতিক। শহরে এসে স্টেপ-ডাউন ট্রান্সফরমারে বিভব নামিয়ে বাসায় 220 V দেওয়া হয়।
Vs / Vp = Ns / Np
আদর্শ ট্রান্সফরমারে: Vp × Ip = Vs × Is
Is / Ip = Np / Ns
সমাধান করা অংক
উদাহরণ ১: একটি ট্রান্সফরমারের মুখ্য কুণ্ডলীতে 200 পাক ও গৌণ কুণ্ডলীতে 2000 পাক আছে। মুখ্যে 220 V AC দিলে গৌণে বিভব কত? এটি কোন ধরনের ট্রান্সফরমার?
- দেওয়া আছে: Np = 200, Ns = 2000, Vp = 220 V
- Vs / Vp = Ns / Np
- Vs = Vp × Ns / Np = 220 × 2000 / 200 = 2200 V
- Vs > Vp, তাই এটি স্টেপ-আপ ট্রান্সফরমার।
উত্তর: 2200 V, স্টেপ-আপ ট্রান্সফরমার
উদাহরণ ২: একটি আদর্শ স্টেপ-ডাউন ট্রান্সফরমার 220 V কে 11 V এ নামায়। গৌণ কুণ্ডলীতে প্রবাহ 2 A হলে মুখ্য কুণ্ডলীতে প্রবাহ কত?
- দেওয়া আছে: Vp = 220 V, Vs = 11 V, Is = 2 A
- আদর্শ ট্রান্সফরমারে Vp × Ip = Vs × Is
- Ip = Vs × Is / Vp = 11 × 2 / 220 = 0.1 A
উত্তর: 0.1 A
উদাহরণ ৩: একটি ট্রান্সফরমারের মুখ্য কুণ্ডলীতে 1100 পাক আছে। 220 V সরবরাহ থেকে 6 V পেতে গৌণ কুণ্ডলীতে কত পাক লাগবে?
- দেওয়া আছে: Np = 1100, Vp = 220 V, Vs = 6 V
- Ns = Np × Vs / Vp
- Ns = 1100 × 6 / 220 = 30
উত্তর: 30 পাক
বহুনির্বাচনী প্রশ্ন (MCQ)
১. তড়িৎপ্রবাহের চৌম্বক ক্রিয়া প্রথম কে আবিষ্কার করেন?
- ক) ফ্যারাডে
- খ) ওরস্টেড
- গ) ফ্লেমিং
- ঘ) লেঞ্জ
উত্তর দেখো
উত্তর: খ) ওরস্টেড — ১৮২০ সালে ওরস্টেড তড়িৎবাহী তারের কাছে কম্পাস কাঁটার বিক্ষেপ দেখান।
২. তড়িৎচুম্বকের মজ্জা হিসেবে কোনটি সবচেয়ে উপযুক্ত?
- ক) ইস্পাত
- খ) তামা
- গ) কাঁচা লোহা
- ঘ) অ্যালুমিনিয়াম
উত্তর দেখো
উত্তর: গ) কাঁচা লোহা — কাঁচা লোহা সহজে চুম্বকিত হয় এবং প্রবাহ বন্ধ করলে দ্রুত চুম্বকত্ব হারায়।
৩. বৈদ্যুতিক মোটরে কোন শক্তি কোন শক্তিতে রূপান্তরিত হয়?
- ক) যান্ত্রিক থেকে তড়িৎ
- খ) তড়িৎ থেকে যান্ত্রিক
- গ) তড়িৎ থেকে রাসায়নিক
- ঘ) তাপ থেকে তড়িৎ
উত্তর দেখো
উত্তর: খ) তড়িৎ থেকে যান্ত্রিক — মোটর তড়িৎশক্তি নিয়ে কুণ্ডলী ঘুরিয়ে যান্ত্রিক কাজ করে।
৪. চৌম্বক ক্ষেত্রে তড়িৎবাহী তারের উপর বলের দিক নির্ণয়ে কোন নিয়ম ব্যবহৃত হয়?
- ক) ফ্লেমিংয়ের বাম হাতের নিয়ম
- খ) ফ্লেমিংয়ের ডান হাতের নিয়ম
- গ) লেঞ্জের সূত্র
- ঘ) ওহমের সূত্র
উত্তর দেখো
উত্তর: ক) ফ্লেমিংয়ের বাম হাতের নিয়ম — মোটর নীতি বা বলের দিকের জন্য বাম হাতের নিয়ম, আবিষ্ট প্রবাহের জন্য ডান হাতের নিয়ম।
৫. ট্রান্সফরমার কোন নীতির উপর কাজ করে?
- ক) স্বকীয় আবেশ
- খ) পারস্পরিক আবেশ
- গ) তড়িৎ বিশ্লেষণ
- ঘ) স্থির তড়িৎ আবেশ
উত্তর দেখো
উত্তর: খ) পারস্পরিক আবেশ — মুখ্য কুণ্ডলীর পরিবর্তী ফ্লাক্স গৌণ কুণ্ডলীতে তড়িচ্চালক শক্তি আবিষ্ট করে।
৬. একটি ট্রান্সফরমারে Np = 500, Ns = 100 এবং Vp = 220 V হলে Vs কত?
- ক) 1100 V
- খ) 44 V
- গ) 22 V
- ঘ) 110 V
উত্তর দেখো
উত্তর: খ) 44 V — Vs = 220 × 100 / 500 = 44 V।
৭. ট্রান্সফরমারের মজ্জা পাতলা পাত দিয়ে তৈরি করা হয় কেন?
- ক) ওজন বাড়াতে
- খ) ঘূর্ণি প্রবাহজনিত শক্তিক্ষয় কমাতে
- গ) বিভব বাড়াতে
- ঘ) খরচ বাড়াতে
উত্তর দেখো
উত্তর: খ) ঘূর্ণি প্রবাহজনিত শক্তিক্ষয় কমাতে — পাতের মাঝে অন্তরণ থাকায় ঘূর্ণি প্রবাহ ছোট হয়, তাপক্ষয় কমে।
৮. বাংলাদেশে সরবরাহকৃত AC বিদ্যুতের কম্পাঙ্ক কত?
- ক) 60 Hz
- খ) 50 Hz
- গ) 220 Hz
- ঘ) 100 Hz
উত্তর দেখো
উত্তর: খ) 50 Hz — বাংলাদেশে গৃহস্থালি সরবরাহ 220 V, 50 Hz।
সৃজনশীল প্রশ্ন
উদ্দীপক: রাফি একটি কাঁচা লোহার দণ্ডে অন্তরিত তামার তার ১০০ পাক প্যাঁচিয়ে একটি ব্যাটারির সাথে যুক্ত করল। দণ্ডটি কিছু আলপিন আকর্ষণ করল। ব্যাটারি খুলে ফেলতেই আলপিনগুলো পড়ে গেল।
- ক) সলিনয়েড কাকে বলে?
- খ) প্রবাহের দিক উল্টালে সলিনয়েডের মেরুর কী পরিবর্তন হয়? ব্যাখ্যা করো।
- গ) ব্যাটারি খোলার পর আলপিন পড়ে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করো।
- ঘ) রাফির যন্ত্রটিকে আরও শক্তিশালী করার উপায়গুলো বিশ্লেষণ করো।
উত্তর দেখো
- অন্তরিত তারকে স্প্রিংয়ের মতো অনেক পাকে প্যাঁচালে যে কুণ্ডলী তৈরি হয় তাকে সলিনয়েড বলে।
- সলিনয়েডের মেরু প্রবাহের দিকের উপর নির্ভর করে। প্রবাহের দিক উল্টালে চৌম্বক ক্ষেত্রের দিকও উল্টে যায়, তাই উত্তর মেরু দক্ষিণ এবং দক্ষিণ মেরু উত্তর হয়ে যায়।
- দণ্ডটি কাঁচা লোহার তৈরি। প্রবাহ চলাকালে সলিনয়েডের চৌম্বক ক্ষেত্র একে অস্থায়ী চুম্বকে পরিণত করে। ব্যাটারি খোলার পর প্রবাহ ও ক্ষেত্র বন্ধ হয়, আর কাঁচা লোহা প্রায় সঙ্গে সঙ্গে চুম্বকত্ব হারায়, তাই আলপিন পড়ে যায়।
- তড়িৎচুম্বকের শক্তি প্যাঁচের সংখ্যা ও প্রবাহের উপর নির্ভর করে। পাক ১০০ থেকে বাড়ালে প্রতিটি পাকের ক্ষেত্র যোগ হয়ে মোট ক্ষেত্র বাড়বে। বেশি বিভবের ব্যাটারি দিলে প্রবাহ বাড়বে, ক্ষেত্রও বাড়বে। কাঁচা লোহার মজ্জা ইতিমধ্যেই আছে, যা ক্ষেত্রকে বহুগুণ বাড়ায়; মোটা মজ্জা নিলে আরও কাজ হবে। তবে প্রবাহ বেশি বাড়ালে তার গরম হতে পারে, তাই পাক বাড়ানোই নিরাপদ উপায়।
উদ্দীপক: একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে 11000 V উৎপন্ন হয়। একে ট্রান্সফরমার A দিয়ে 132000 V এ তুলে দূরে পাঠানো হয়। শহরে ট্রান্সফরমার B দিয়ে বিভব কমিয়ে বাসায় 220 V দেওয়া হয়। ট্রান্সফরমার A এর মুখ্য কুণ্ডলীতে 500 পাক।
- ক) তড়িৎচৌম্বক আবেশ কী?
- খ) ট্রান্সফরমার DC তে কাজ করে না কেন?
- গ) ট্রান্সফরমার A এর গৌণ কুণ্ডলীর পাকসংখ্যা নির্ণয় করো।
- ঘ) উচ্চ বিভবে বিদ্যুৎ সঞ্চালন কেন লাভজনক, বিশ্লেষণ করো।
উত্তর দেখো
- কোনো কুণ্ডলীর সাথে জড়িত চৌম্বক ফ্লাক্সের পরিবর্তনের ফলে কুণ্ডলীতে তড়িচ্চালক শক্তি বা প্রবাহ আবিষ্ট হওয়াকে তড়িৎচৌম্বক আবেশ বলে।
- ট্রান্সফরমার কাজ করে পরিবর্তনশীল ফ্লাক্সের মাধ্যমে। DC প্রবাহ স্থির, তাই মজ্জায় ফ্লাক্সও স্থির থাকে এবং গৌণ কুণ্ডলীতে কোনো তড়িচ্চালক শক্তি আবিষ্ট হয় না।
- Np = 500, Vp = 11000 V, Vs = 132000 V। Ns = Np × Vs / Vp = 500 × 132000 / 11000 = 6000 পাক।
- একই ক্ষমতা P = VI পাঠাতে বিভব বাড়ালে প্রবাহ কমে। এখানে বিভব 12 গুণ বাড়ায় প্রবাহ 12 গুণ কমে। তারে তাপক্ষয় I²R হওয়ায় ক্ষয় 144 গুণ কমে যায়। কম প্রবাহের জন্য সরু তার ব্যবহার করা যায়, খরচও কমে। তাই উচ্চ বিভবে সঞ্চালন করে শহরে স্টেপ-ডাউন ট্রান্সফরমার B দিয়ে নিরাপদ 220 V এ নামানো লাভজনক।
বাস্তব জীবনে মজার যোগসূত্র
বিদ্যুতের খুঁটির ট্রান্সফরমারের পাশে ভোঁ ভোঁ শব্দ শুনেছ? এগুলো 50 Hz AC তে চলে, আর লোহার মজ্জা প্রতি চক্রে দুবার চুম্বকিত হয়ে সামান্য সংকুচিত-প্রসারিত হয়। তাই খুঁটির ট্রান্সফরমারের ভোঁ ভোঁ শব্দের মূল সুর প্রায় 100 Hz। এমনকি তোমার শরীরের ভেতরের ছবি তোলা MRI যন্ত্রও আসলে এক বিশাল তড়িৎচুম্বক।
প্রশ্ন ও উত্তর
ফ্লেমিংয়ের বাম হাত আর ডান হাতের নিয়ম মনে রাখব কীভাবে?
মোটর বাম হাতে, জেনারেটর ডান হাতে। দুটোতেই তর্জনী ক্ষেত্র, মধ্যমা প্রবাহ, বৃদ্ধাঙ্গুলি গতি।
স্থায়ী চুম্বক থাকতে তড়িৎচুম্বক লাগে কেন?
তড়িৎচুম্বক ইচ্ছামতো চালু-বন্ধ করা যায় এবং প্রবাহ বদলে শক্তি নিয়ন্ত্রণ করা যায়, যা ক্রেন বা রিলেতে দরকার।
ট্রান্সফরমার কি শক্তি বাড়াতে পারে?
না। এটি শুধু বিভব বাড়ায় বা কমায়। বিভব বাড়লে প্রবাহ কমে, আদর্শ অবস্থায় ক্ষমতা Vp × Ip = Vs × Is একই থাকে।
চুম্বক কুণ্ডলীর ভেতরে স্থির রাখলে প্রবাহ হয় না কেন?
আবেশের জন্য ফ্লাক্সের পরিবর্তন দরকার। চুম্বক স্থির থাকলে ফ্লাক্স বদলায় না, তাই প্রবাহও হয় না।
লেঞ্জের সূত্র কেন শক্তির সংরক্ষণের সাথে জড়িত?
আবিষ্ট প্রবাহ কারণকে বাধা দেয়, তাই চুম্বক নাড়াতে কাজ করতে হয়। সেই কাজই তড়িৎশক্তিতে রূপান্তরিত হয়, বিনা খরচে শক্তি আসে না।
আরও পড়ো
সূত্র: NCTB নবম-দশম শ্রেণি পদার্থবিজ্ঞান, অধ্যায় ১২: বিদ্যুতের চৌম্বক ক্রিয়া · OpenStax College Physics: Magnetism and Electromagnetic Induction · Encyclopaedia Britannica: Electromagnetic induction