আকাশ নীল কেন? সূর্যাস্তে লাল হয় কেন?
· পড়তে ৭ মিনিট · ✓ তথ্য যাচাই করা
ছোট উত্তর · ১০ সেকেন্ডে
সূর্যের সাদা আলোয় সব রং মেশানো থাকে। বাতাসের ক্ষুদ্র নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন অণু ছোট তরঙ্গের নীল আলোকে লাল আলোর চেয়ে প্রায় পাঁচ গুণ বেশি চারদিকে ছড়িয়ে দেয়, তাই আকাশ নীল দেখায়। সূর্যাস্তে আলো অনেক লম্বা পথ পাড়ি দেয়, নীল পথেই ছড়িয়ে হারায়, থাকে কমলা আর লাল।
দুপুরে মাথার ওপর তাকালে ঝকঝকে নীল আকাশ, আর সন্ধ্যায় সেই একই আকাশ কমলা, লাল, কখনো গোলাপি রঙে ভরে যায়। অথচ সূর্য একটাই, আলোও একই। তাহলে রং বদলায় কেন? আরও মজার প্রশ্ন, সূর্যের আলো তো সাদা দেখায়, তাহলে আকাশ সাদা না হয়ে নীল কেন? উত্তরটা লুকিয়ে আছে বাতাসের অণু আর আলোর তরঙ্গের এক অদ্ভুত খেলায়, যার নাম র্যালে বিক্ষেপণ (Rayleigh scattering)। চলো ধাপে ধাপে বুঝে নিই।
সংক্ষেপে: আকাশ নীল কেন?
সূর্যের সাদা আলো আসলে অনেকগুলো রঙের মিশ্রণ, বেগুনি থেকে লাল পর্যন্ত। এই আলো যখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঢোকে, তখন নাইট্রোজেন আর অক্সিজেনের অতি ক্ষুদ্র অণুগুলোর সাথে ধাক্কা খেয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সব রং সমানভাবে ছড়ায় না। ছোট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের নীল আলো লম্বা তরঙ্গের লাল আলোর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ছড়িয়ে পড়ে। ফলে আকাশের যেদিকেই তাকাও, সেদিক থেকেই ছড়ানো নীল আলো চোখে এসে পৌঁছায়। তাই পুরো আকাশটাকে নীল দেখায়।
সূর্যের আলোয় লুকানো রংধনু
বৃষ্টির পর রংধনু দেখেছো নিশ্চয়ই। সেখানে পানির ফোঁটা সূর্যের আলোকে ভেঙে সাতটা রঙে আলাদা করে দেয়। এর মানে, সাদা আলোর ভেতরে আগে থেকেই সব রং মিশে ছিল। প্রতিটা রঙের আলো আসলে একটা তরঙ্গ, আর তাদের পার্থক্য হলো তরঙ্গদৈর্ঘ্যে, মানে এক ঢেউয়ের চূড়া থেকে পরের চূড়ার দূরত্বে।
- লাল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৭০০ ন্যানোমিটার।
- সবুজ আর হলুদ মাঝামাঝি, প্রায় ৫০০ থেকে ৫৮০ ন্যানোমিটার।
- নীল আলো প্রায় ৪৫০ ন্যানোমিটার।
- বেগুনি আলো সবচেয়ে ছোট, প্রায় ৪০০ ন্যানোমিটার।
এক ন্যানোমিটার হলো এক মিটারের একশো কোটি ভাগের এক ভাগ। অর্থাৎ এই ঢেউগুলো এত ছোট যে চোখে দেখার প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু এই সামান্য পার্থক্যই ঠিক করে দেয় আকাশের রং।
র্যালে বিক্ষেপণ: ছোট অণু, বড় প্রভাব
বাতাসের নাইট্রোজেন আর অক্সিজেন অণু আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের তুলনায় হাজার গুণেরও বেশি ছোট। এত ছোট কণার ওপর আলো পড়লে কণাটা আলোকে শুষে না রেখে চারদিকে ছিটিয়ে দেয়, অনেকটা পুকুরে ঢেউ এসে একটা খুঁটিতে ধাক্কা খেয়ে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ার মতো। উনিশ শতকে ব্রিটিশ পদার্থবিদ লর্ড র্যালে হিসাব করে দেখান, এই ছড়িয়ে পড়ার পরিমাণ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের চতুর্থ ঘাতের বিপরীত অনুপাতে বদলায়।
কথাটা শুনতে কঠিন, কিন্তু মানেটা সহজ। তরঙ্গদৈর্ঘ্য অর্ধেক হলে বিক্ষেপণ বাড়ে ২ × ২ × ২ × ২, মানে ১৬ গুণ। নীল আলোর তরঙ্গ লাল আলোর চেয়ে খুব বেশি ছোট না হলেও, এই চতুর্থ ঘাতের কারণে নীল আলো লালের চেয়ে প্রায় পাঁচ গুণ বেশি ছড়িয়ে পড়ে। তাই সূর্য থেকে আসা আলোর নীল অংশটা বাতাসে চারদিকে ছড়িয়ে আকাশ ভরে ফেলে, আর লাল-হলুদ অংশ বেশিরভাগই সোজা পথে এগিয়ে যায়।
জানেন কি?ট্যাপ করে দেখুন
মজার তথ্য: চাঁদে কোনো বায়ুমণ্ডল নেই, তাই সেখানে আলো ছড়ানোর মতো অণুও নেই। ফলে চাঁদের আকাশ দিনের বেলাতেও কালো দেখায়, যদিও সূর্য তখন জ্বলজ্বল করছে। মহাকাশচারীদের তোলা ছবিতে এই কালো আকাশ স্পষ্ট দেখা যায়।
তাহলে আকাশ বেগুনি নয় কেন?
এখানে একটা ধাঁধা আছে। বেগুনির তরঙ্গদৈর্ঘ্য তো নীলের চেয়েও ছোট, তাহলে বেগুনি আলো আরও বেশি ছড়ানোর কথা। আকাশ তাহলে বেগুনি নয় কেন? এর তিনটা কারণ আছে।
- সূর্যের আলোতে বেগুনির পরিমাণ নীলের চেয়ে কম থাকে, আর বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে এর একটা অংশ শোষিতও হয়ে যায়।
- আমাদের চোখ বেগুনি আলোর প্রতি কম সংবেদনশীল, নীল আর সবুজ আমরা অনেক বেশি স্পষ্ট টের পাই।
- চোখের তিন ধরনের রং-শনাক্তকারী কোষ ছড়ানো আলোর মিশ্রণকে একসাথে মিলিয়ে মস্তিষ্কে যে সংকেত পাঠায়, তার ফল দাঁড়ায় হালকা নীল।
অর্থাৎ আকাশের নীল রং শুধু পদার্থবিদ্যার ব্যাপার না, এতে আমাদের চোখ আর মস্তিষ্কেরও ভূমিকা আছে। অন্য কোনো প্রাণী, যাদের চোখ ভিন্নভাবে তৈরি, তারা হয়তো একই আকাশকে অন্য রঙে দেখে।
সূর্যাস্তে আকাশ লাল কেন?
দুপুরে সূর্য মাথার ওপরে থাকে, তাই আলোকে বায়ুমণ্ডলের তুলনামূলক পাতলা একটা স্তর পার হয়ে আমাদের কাছে আসতে হয়। কিন্তু সকালে বা সন্ধ্যায় সূর্য দিগন্তের কাছে থাকে। তখন আলোকে বায়ুমণ্ডলের ভেতর দিয়ে কোনাকুনি অনেক লম্বা পথ পাড়ি দিতে হয়, দুপুরের তুলনায় কয়েক ডজন গুণ বেশি বাতাসের ভেতর দিয়ে।
এই লম্বা পথে নীল আর বেগুনি আলো বারবার ছড়িয়ে পড়তে পড়তে মূল রশ্মি থেকে প্রায় হারিয়েই যায়। যা টিকে থাকে, তা হলো লম্বা তরঙ্গের কমলা আর লাল আলো। তাই অস্ত যাওয়া সূর্যটা নিজেই কমলা-লাল দেখায়, আর তার চারপাশের মেঘ ও বাতাস সেই লালচে আলোয় রাঙিয়ে ওঠে। মজার ব্যাপার, তোমার কাছে যখন সূর্যাস্ত, তখন যে নীল আলো তোমার পথ থেকে ছড়িয়ে গেল, সেটা হয়তো পশ্চিমের অন্য কোনো জায়গার দুপুরের আকাশকে নীল করছে।
ধুলা, ধোঁয়া আর মেঘের ভূমিকা
বাতাসে যদি শুধু গ্যাসের অণু থাকত, তাহলে সব জায়গার আকাশ একই রকম গাঢ় নীল হতো। কিন্তু বাস্তবে বাতাসে ভাসে ধুলাবালি, ধোঁয়া, সমুদ্রের লবণকণা আর জলীয় বাষ্পের ফোঁটা। এই কণাগুলো আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সমান বা তার চেয়ে বড়। এদের ক্ষেত্রে র্যালে বিক্ষেপণ খাটে না, বরং সব রং প্রায় সমানভাবে ছড়ায়। বিজ্ঞানীরা একে বলেন মি বিক্ষেপণ (Mie scattering)।
সব রং সমান ছড়ালে মিশে তৈরি হয় সাদা বা ধূসর। এ কারণেই মেঘ সাদা দেখায়, আর ধুলাভরা বা কুয়াশাচ্ছন্ন দিনে আকাশ ফ্যাকাশে সাদাটে নীল হয়ে যায়। বৃষ্টির পর বাতাস থেকে ধুলা ধুয়ে গেলে আকাশ হঠাৎ অনেক গাঢ় নীল দেখায়, এটাও একই কারণে। আবার বড় আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত বা দাবানলের পর বাতাসে প্রচুর কণা জমলে কয়েক মাস ধরে পৃথিবীর নানা জায়গায় অস্বাভাবিক উজ্জ্বল লাল সূর্যাস্ত দেখা যায়।
দিগন্তের কাছের আকাশ মাথার ওপরের আকাশের চেয়ে হালকা দেখায় কেন, সেটাও এখান থেকে বোঝা যায়। দিগন্তের দিক থেকে আসা আলো অনেক বেশি বাতাস পার হয়ে আসে, তাই সেখানে নানা রঙের আলো বারবার ছড়িয়ে মিশে যায় আর রং ফিকে সাদাটে হয়ে পড়ে।
অন্য গ্রহের আকাশ কেমন?
আকাশের রং পুরোপুরি নির্ভর করে বায়ুমণ্ডলে কী আছে তার ওপর। মঙ্গল গ্রহের বায়ুমণ্ডল খুব পাতলা, কিন্তু সেখানে ভাসে প্রচুর লালচে ধুলা। তাই মঙ্গলের দিনের আকাশ হালকা বাদামি-কমলা, আর অবাক করা ব্যাপার হলো, মঙ্গলের সূর্যাস্তের চারপাশটা নীলচে দেখায়। নাসার রোভারের তোলা ছবিতে এই নীল সূর্যাস্ত ধরা পড়েছে। কারণ সেখানকার ধুলাকণার আকার এমন যে তারা নীল আলোকে সূর্যের দিকেই বেশি ছড়ায়।
অর্থাৎ পৃথিবীর নীল দিন আর লাল সন্ধ্যা কোনো সার্বজনীন নিয়ম নয়। এটা আমাদের গ্রহের বাতাসের নিজস্ব স্বাক্ষর। অন্য কোনো গ্রহে দাঁড়ালে আকাশের রং দেখেই অনেকটা বলে দেওয়া যেত, সেখানকার বাতাসে কী কী আছে।
দিনের নানা সময়ে আকাশের রং কেমন বদলায়
ভোরে সূর্য ওঠার আগে আকাশ প্রথমে গাঢ় নীলচে-বেগুনি, তারপর দিগন্তের কাছে ধীরে ধীরে কমলা আর গোলাপি হয়ে ওঠে। সূর্য যত ওপরে ওঠে, আলোর পথ তত ছোট হয়, আর আকাশ ততই উজ্জ্বল নীল হতে থাকে। দুপুরে সবচেয়ে ছোট পথ, তাই তখন নীল সবচেয়ে প্রবল। বিকেলে আবার পথ লম্বা হতে শুরু করে, আলো সোনালি হয়ে আসে, ছায়া লম্বা হয়। ফটোগ্রাফাররা এই সময়টাকে বলেন 'গোল্ডেন আওয়ার'।
সূর্য দিগন্তের নিচে নেমে যাওয়ার পরও কিছুক্ষণ আকাশে আলো থাকে, কারণ ওপরের বাতাস তখনো সূর্যের আলো পাচ্ছে আর সেটা ছড়িয়ে নিচে পাঠাচ্ছে। এই সময় আকাশ এক বিশেষ গাঢ় নীল হয়ে যায়, যাকে বলা হয় 'ব্লু আওয়ার'। এর পেছনে বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরের ওজোন গ্যাসেরও ভূমিকা আছে, যা কমলা-লাল আলোর কিছু অংশ শুষে নেয়। পূর্ব দিগন্তে তখন কখনো একটা গোলাপি পটি আর তার নিচে গাঢ় নীলচে ছায়া দেখা যায়। ওই নীলচে অংশটা আসলে পৃথিবীর নিজেরই ছায়া, যা বায়ুমণ্ডলের ওপর পড়েছে।
একই সূত্রে আরও যা বোঝা যায়
র্যালে বিক্ষেপণ শুধু আকাশের রং ব্যাখ্যা করে না। দূরের পাহাড় বা বনের সারি কেন নীলচে-ধূসর দেখায়, সেটাও এর ফল, কারণ চোখ আর পাহাড়ের মাঝের বিশাল বাতাসের স্তর নীল আলো ছড়িয়ে দৃশ্যটায় একটা নীলাভ পর্দা টেনে দেয়। শিল্পীরা বহু শতাব্দী ধরে ছবিতে দূরত্ব বোঝাতে দূরের জিনিস হালকা নীল রঙে আঁকেন। ধোঁয়ার ক্ষেত্রেও একই খেলা দেখা যায়: অন্ধকার পটভূমিতে খুব সূক্ষ্ম ধোঁয়া নীলচে দেখায়, কিন্তু আলোর বিপরীতে তাকালে সেটাই হলদেটে-বাদামি লাগে।
পরের বার সন্ধ্যার আকাশে লাল আভা দেখলে মনে রেখো, তুমি আসলে দেখছো কয়েকশো কিলোমিটার বাতাস পাড়ি দিয়ে টিকে থাকা আলো, যার নীল সঙ্গীরা পথেই চারদিকে ছড়িয়ে গেছে। আকাশ যেন এক বিশাল পর্দা, যেখানে প্রতিদিন বাতাসের অণুরা নিঃশব্দে আলোর পদার্থবিদ্যা দেখিয়ে যায়।
নিজে দেখুন
নিজে দেখো: একটা স্বচ্ছ গ্লাসে পানি নিয়ে তাতে কয়েক ফোঁটা দুধ মেশাও। অন্ধকার ঘরে পাশ থেকে টর্চের আলো ফেলো, পানিটা হালকা নীলচে দেখাবে। এবার উল্টো দিক থেকে গ্লাসের ভেতর দিয়ে টর্চের দিকে তাকাও, আলোটা কমলা-হলুদ লাগবে। এক গ্লাসেই দুপুরের আকাশ আর সূর্যাস্ত!
ছোট্ট যাচাই
কতটা মনে আছে, দেখে নিন
১. আকাশ বেগুনি না হয়ে নীল দেখায় কেন?
২. মেঘ সাদা দেখায় কেন?
তথ্যসূত্র
কৃতজ্ঞতা
- তথ্য যাচাই: ১ নভেম্বর, ২০২৬