এসএসসি রসায়ন · অধ্যায় ৩
পদার্থের গঠন
এক কথায়
সব পদার্থ পরমাণু দিয়ে তৈরি। পরমাণুর কেন্দ্রে থাকে নিউক্লিয়াস, যেখানে প্রোটন ও নিউট্রন থাকে; চারপাশে নির্দিষ্ট শক্তিস্তরে ঘোরে ইলেকট্রন। প্রোটন সংখ্যা হলো পারমাণবিক সংখ্যা, প্রোটন আর নিউট্রনের যোগফল ভরসংখ্যা। একই মৌলের যেসব পরমাণুর প্রোটন সংখ্যা সমান কিন্তু নিউট্রন সংখ্যা আলাদা, তারা আইসোটোপ। ইলেকট্রন বিন্যাস দেখে মৌলের ধর্ম বোঝা যায়।
পদার্থ, অণু আর পরমাণু: শুরুটা কোথায়
যার ভর আছে আর যা জায়গা দখল করে, তা-ই পদার্থ। পানি, বাতাস, লোহা, তোমার শরীর, সবই পদার্থ। পদার্থকে ভাঙতে ভাঙতে গেলে একসময় এমন ক্ষুদ্র কণায় পৌঁছানো যায়, যাকে রাসায়নিকভাবে আর ভাঙা যায় না, কিন্তু যার মধ্যে মৌলের ধর্ম থাকে। এটাই পরমাণু।
প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে গ্রিক দার্শনিক ডেমোক্রিটাস ভেবেছিলেন পদার্থ অবিভাজ্য কণা দিয়ে তৈরি, নাম দেন atomos মানে যাকে কাটা যায় না। ১৮০৩ সালে জন ডাল্টন একে বৈজ্ঞানিক তত্ত্বে রূপ দেন। তবে পরে জানা গেছে পরমাণুর ভেতরেও আরও ছোট কণা আছে।
দুই বা ততোধিক পরমাণু রাসায়নিক বন্ধনে যুক্ত হলে অণু তৈরি হয়। যেমন দুটি হাইড্রোজেন পরমাণু মিলে H2 অণু, আর দুটি হাইড্রোজেন ও একটি অক্সিজেন মিলে H2O অণু।
- মৌল: একই ধরনের পরমাণু দিয়ে গঠিত বিশুদ্ধ পদার্থ, যেমন Fe, O2, Na
- যৌগ: ভিন্ন ভিন্ন মৌলের পরমাণু নির্দিষ্ট অনুপাতে যুক্ত হয়ে গঠিত, যেমন H2O, NaCl, CO2
- পদার্থের তিন অবস্থা (কঠিন, তরল, গ্যাস) মূলত কণাগুলোর মধ্যকার আকর্ষণ আর তাদের গতিশক্তির পার্থক্যের ফল
মৌলের প্রতীক ও সংকেত
প্রতিটি মৌলকে সংক্ষেপে লেখার জন্য প্রতীক ব্যবহার করা হয়। সাধারণত ইংরেজি বা ল্যাটিন নামের প্রথম অক্ষর বড় হাতের, আর দরকার হলে দ্বিতীয় অক্ষর ছোট হাতের লেখা হয়।
কিছু মৌলের প্রতীক এসেছে ল্যাটিন নাম থেকে, তাই ইংরেজি নামের সঙ্গে মেলে না। পরীক্ষায় এগুলো প্রায়ই আসে।
- হাইড্রোজেন H, কার্বন C, নাইট্রোজেন N, অক্সিজেন O
- ক্যালসিয়াম Ca, ক্লোরিন Cl, ম্যাগনেসিয়াম Mg
- সোডিয়াম Na (Natrium), পটাশিয়াম K (Kalium), লোহা Fe (Ferrum)
- তামা Cu (Cuprum), রুপা Ag (Argentum), সোনা Au (Aurum), সিসা Pb (Plumbum)
মৌলিক কণা: প্রোটন, নিউট্রন, ইলেকট্রন
পরমাণু তিন ধরনের প্রধান মৌলিক কণা দিয়ে গঠিত। প্রোটন ধনাত্মক, ইলেকট্রন ঋণাত্মক আর নিউট্রন চার্জহীন। নিরপেক্ষ পরমাণুতে প্রোটন আর ইলেকট্রনের সংখ্যা সমান, তাই মোট চার্জ শূন্য।
ইলেকট্রন আবিষ্কার করেন জে. জে. থমসন (১৮৯৭), প্রোটন শনাক্ত করেন রাদারফোর্ড (১৯১৯ সালের দিকে), আর নিউট্রন আবিষ্কার করেন জেমস চ্যাডউইক (১৯৩২)। প্রোটন ও নিউট্রন প্রায় সমান ভারী, আর ইলেকট্রন প্রোটনের প্রায় ১৮৩৬ ভাগের এক ভাগ।
- প্রোটন (p): চার্জ +1.602 × 10^-19 C, ভর 1.673 × 10^-27 kg, অবস্থান নিউক্লিয়াসে
- নিউট্রন (n): চার্জ 0, ভর 1.675 × 10^-27 kg, অবস্থান নিউক্লিয়াসে
- ইলেকট্রন (e): চার্জ -1.602 × 10^-19 C, ভর 9.11 × 10^-31 kg, অবস্থান নিউক্লিয়াসের বাইরে শক্তিস্তরে
- সাধারণ হাইড্রোজেন (প্রোটিয়াম) পরমাণুতে কোনো নিউট্রন নেই
পারমাণবিক সংখ্যা ও ভরসংখ্যা
কোনো মৌলের পরমাণুর নিউক্লিয়াসে যতগুলো প্রোটন থাকে, সেটাই তার পারমাণবিক সংখ্যা (Z)। এটা মৌলের পরিচয়পত্রের মতো: প্রোটন সংখ্যা বদলালে মৌলটাই বদলে যায়।
নিউক্লিয়াসে প্রোটন আর নিউট্রনের মোট সংখ্যাকে ভরসংখ্যা (A) বলে। ইলেকট্রনের ভর খুব কম বলে এটা ধরা হয় না। প্রতীকের বাঁয়ে ওপরে ভরসংখ্যা আর বাঁয়ে নিচে পারমাণবিক সংখ্যা লেখা হয়, যেমন সোডিয়ামের ক্ষেত্রে ভরসংখ্যা 23, পারমাণবিক সংখ্যা 11।
পারমাণবিক সংখ্যা Z = প্রোটন সংখ্যা = নিরপেক্ষ পরমাণুর ইলেকট্রন সংখ্যা
ভরসংখ্যা A = প্রোটন সংখ্যা + নিউট্রন সংখ্যা
নিউট্রন সংখ্যা N = A - Z
পরমাণু মডেল: রাদারফোর্ড থেকে বোর
রাদারফোর্ড ১৯১১ সালে খুব পাতলা সোনার পাতে আলফা কণা ছুড়ে দেখলেন, বেশিরভাগ কণা সোজা বেরিয়ে যায়, অল্প কিছু বেঁকে যায়, আর খুব কম কণা প্রায় উল্টো দিকে ফিরে আসে। এ থেকে তিনি বললেন, পরমাণুর বেশিরভাগটাই ফাঁকা, আর ধনাত্মক চার্জ ও প্রায় সব ভর কেন্দ্রের অতি ক্ষুদ্র নিউক্লিয়াসে জমা। ইলেকট্রন নিউক্লিয়াসের চারপাশে ঘোরে, যেমন সূর্যের চারপাশে গ্রহ, তাই একে সৌরমডেলও বলে।
রাদারফোর্ড মডেলের সীমাবদ্ধতা হলো: ঘূর্ণায়মান চার্জিত কণা শক্তি বিকিরণ করার কথা, তাহলে ইলেকট্রন শক্তি হারিয়ে নিউক্লিয়াসে পড়ে যেত। তা ছাড়া এই মডেল পরমাণুর বর্ণালির রেখা ব্যাখ্যা করতে পারে না, আর একাধিক ইলেকট্রনের কক্ষপথের বিন্যাসও বলে না।
১৯১৩ সালে নীলস বোর এই সমস্যার সমাধান দেন। তাঁর মতে ইলেকট্রন কেবল কিছু নির্দিষ্ট শক্তির বৃত্তাকার কক্ষপথে (শক্তিস্তরে) ঘোরে, এবং সেখানে থাকা অবস্থায় শক্তি বিকিরণ করে না। ইলেকট্রন এক স্তর থেকে আরেক স্তরে লাফ দিলে নির্দিষ্ট পরিমাণ শক্তি শোষণ বা বিকিরণ করে, যা আলোর রেখা হিসেবে দেখা যায়।
- বোর মডেলের সীমাবদ্ধতা: এটি কেবল হাইড্রোজেনের মতো এক ইলেকট্রনবিশিষ্ট পরমাণু বা আয়নের বর্ণালি ভালোভাবে ব্যাখ্যা করে
- বহু ইলেকট্রনবিশিষ্ট পরমাণুর বর্ণালির সূক্ষ্ম রেখা এবং উপশক্তিস্তরের অস্তিত্ব এ মডেলে ব্যাখ্যা হয় না
শক্তির পার্থক্য: ΔE = E2 - E1 = hν (h = প্ল্যাঙ্ক ধ্রুবক = 6.626 × 10^-34 J s)
শক্তিস্তর, উপস্তর ও ইলেকট্রন বিন্যাস
শক্তিস্তরগুলোকে n = 1, 2, 3, 4 অথবা K, L, M, N দিয়ে চিহ্নিত করা হয়। n-তম শক্তিস্তরে সর্বোচ্চ 2n² টি ইলেকট্রন থাকতে পারে, অর্থাৎ K-তে 2, L-তে 8, M-তে 18, N-তে 32।
প্রতিটি শক্তিস্তর আবার উপস্তরে ভাগ হয়: s, p, d, f। s-এ সর্বোচ্চ 2, p-তে 6, d-তে 10, f-এ 14 টি ইলেকট্রন থাকে। ইলেকট্রন আগে কম শক্তির উপস্তরে ঢোকে (আউফবাউ নীতি)। কোন উপস্তরের শক্তি কম, তা (n + l) মান দিয়ে বোঝা যায়; মান সমান হলে যার n কম, সে আগে পূর্ণ হয়।
এ কারণে 4s উপস্তর 3d-এর আগে পূর্ণ হয়। পটাশিয়ামের (Z = 19) শেষ ইলেকট্রন তাই 3d-তে না গিয়ে 4s-এ যায়।
- Na (11): 1s² 2s² 2p⁶ 3s¹
- Cl (17): 1s² 2s² 2p⁶ 3s² 3p⁵
- K (19): 1s² 2s² 2p⁶ 3s² 3p⁶ 4s¹
- Fe (26): 1s² 2s² 2p⁶ 3s² 3p⁶ 3d⁶ 4s²
- ব্যতিক্রম Cr (24): 1s² 2s² 2p⁶ 3s² 3p⁶ 3d⁵ 4s¹ — অর্ধপূর্ণ d বেশি সুস্থিত
- ব্যতিক্রম Cu (29): 1s² 2s² 2p⁶ 3s² 3p⁶ 3d¹⁰ 4s¹ — পূর্ণ d বেশি সুস্থিত
n-তম স্তরে সর্বোচ্চ ইলেকট্রন = 2n²
পূরণের ক্রম: 1s 2s 2p 3s 3p 4s 3d 4p 5s 4d 5p 6s
আইসোটোপ: একই মৌল, ভিন্ন ভর
একই মৌলের যেসব পরমাণুর প্রোটন সংখ্যা সমান কিন্তু নিউট্রন সংখ্যা ভিন্ন, অর্থাৎ ভরসংখ্যা ভিন্ন, তাদের আইসোটোপ বলে। ইলেকট্রন বিন্যাস একই হওয়ায় এদের রাসায়নিক ধর্ম প্রায় এক, কিন্তু ভৌত ধর্ম (যেমন ভর, ঘনত্ব) আলাদা।
হাইড্রোজেনের তিনটি আইসোটোপ: প্রোটিয়াম (ভরসংখ্যা 1, নিউট্রন 0), ডিউটেরিয়াম (ভরসংখ্যা 2, নিউট্রন 1), ট্রিটিয়াম (ভরসংখ্যা 3, নিউট্রন 2)। কার্বনের আছে C-12, C-13 আর তেজস্ক্রিয় C-14।
কিছু আইসোটোপ তেজস্ক্রিয়, অর্থাৎ নিজে থেকে ভেঙে বিকিরণ ছড়ায়। এগুলো চিকিৎসা, কৃষি ও গবেষণায় খুব কাজের।
- C-14: জীবাশ্ম ও প্রাচীন জৈব বস্তুর বয়স নির্ণয় (কার্বন ডেটিং)
- Co-60: ক্যানসার কোষ ধ্বংসে রেডিওথেরাপি, খাদ্য ও চিকিৎসা সরঞ্জাম জীবাণুমুক্তকরণ
- I-131: থাইরয়েড গ্রন্থির রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা
- P-32: উদ্ভিদ কীভাবে ফসফরাস সার গ্রহণ করে তা জানতে
- U-235: পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি
আপেক্ষিক পারমাণবিক ভর
পরমাণু এত হালকা যে কেজিতে লিখলে সংখ্যাটা অস্বস্তিকর ছোট হয়। তাই একটি কার্বন-12 পরমাণুর ভরের 1/12 অংশকে একক (amu বা u) ধরা হয়। এর মান 1.66 × 10^-27 kg।
কোনো মৌলের একটি পরমাণুর গড় ভর ওই এককের কত গুণ, সেটাই তার আপেক্ষিক পারমাণবিক ভর। এটা একটা অনুপাত, তাই এর কোনো একক নেই। প্রকৃতিতে মৌল সাধারণত কয়েকটি আইসোটোপের মিশ্রণ হিসেবে থাকে, তাই আপেক্ষিক পারমাণবিক ভর প্রায়ই ভগ্নাংশ হয়, যেমন ক্লোরিনের 35.5।
আপেক্ষিক পারমাণবিক ভর = একটি পরমাণুর গড় ভর ÷ (একটি C-12 পরমাণুর ভরের 1/12)
গড় পারমাণবিক ভর = Σ (আইসোটোপের ভর × শতকরা প্রাচুর্য) ÷ 100
সমাধান করা অংক
উদাহরণ ১: একটি মৌলের পারমাণবিক সংখ্যা 13 এবং ভরসংখ্যা 27। এর প্রোটন, ইলেকট্রন ও নিউট্রন সংখ্যা নির্ণয় করো।
- প্রোটন সংখ্যা = পারমাণবিক সংখ্যা = 13
- নিরপেক্ষ পরমাণুতে ইলেকট্রন সংখ্যা = প্রোটন সংখ্যা = 13
- নিউট্রন সংখ্যা N = A - Z = 27 - 13 = 14
উত্তর: প্রোটন 13, ইলেকট্রন 13, নিউট্রন 14 (মৌলটি অ্যালুমিনিয়াম, Al)
উদাহরণ ২: প্রকৃতিতে ক্লোরিনের 75% Cl-35 এবং 25% Cl-37। ক্লোরিনের আপেক্ষিক পারমাণবিক ভর কত?
- গড় ভর = (35 × 75 + 37 × 25) ÷ 100
- = (2625 + 925) ÷ 100
- = 3550 ÷ 100 = 35.5
উত্তর: 35.5
উদাহরণ ৩: M শক্তিস্তরে সর্বোচ্চ কয়টি ইলেকট্রন থাকতে পারে? আর Ca (Z = 20) এর ইলেকট্রন বিন্যাস লেখো।
- M স্তরের জন্য n = 3, তাই সর্বোচ্চ ইলেকট্রন = 2n² = 2 × 3² = 18
- Ca-এর 20টি ইলেকট্রন ক্রম অনুযায়ী বসাই: 1s² (2), 2s² (4), 2p⁶ (10), 3s² (12), 3p⁶ (18), 4s² (20)
- লক্ষ করো, 3d খালি থাকে কারণ 4s-এর শক্তি 3d-এর চেয়ে কম
উত্তর: M স্তরে সর্বোচ্চ 18টি; Ca: 1s² 2s² 2p⁶ 3s² 3p⁶ 4s²
উদাহরণ ৪: Mg²⁺ আয়নে (Z = 12, A = 24) প্রোটন, নিউট্রন ও ইলেকট্রন কয়টি?
- প্রোটন = Z = 12
- নিউট্রন = 24 - 12 = 12
- ২+ আয়ন মানে দুটি ইলেকট্রন ত্যাগ করেছে, তাই ইলেকট্রন = 12 - 2 = 10
উত্তর: প্রোটন 12, নিউট্রন 12, ইলেকট্রন 10 (বিন্যাস 1s² 2s² 2p⁶, নিয়নের মতো)
বহুনির্বাচনী প্রশ্ন (MCQ)
১. কোন মৌলিক কণাটি চার্জহীন?
- ক) প্রোটন
- খ) ইলেকট্রন
- গ) নিউট্রন
- ঘ) আলফা কণা
উত্তর দেখো
উত্তর: গ) নিউট্রন — নিউট্রনের কোনো চার্জ নেই; প্রোটন ধনাত্মক, ইলেকট্রন ঋণাত্মক, আলফা কণা +2 চার্জযুক্ত হিলিয়াম নিউক্লিয়াস।
২. কোনো মৌলের পরিচয় নির্ধারণ করে কোনটি?
- ক) ভরসংখ্যা
- খ) নিউট্রন সংখ্যা
- গ) পারমাণবিক সংখ্যা
- ঘ) আপেক্ষিক পারমাণবিক ভর
উত্তর দেখো
উত্তর: গ) পারমাণবিক সংখ্যা — প্রোটন সংখ্যা তথা পারমাণবিক সংখ্যা বদলালে মৌলটাই বদলে যায়; নিউট্রন বদলালে কেবল আইসোটোপ বদলায়।
৩. N শক্তিস্তরে সর্বোচ্চ কয়টি ইলেকট্রন থাকতে পারে?
- ক) 8
- খ) 18
- গ) 32
- ঘ) 50
উত্তর দেখো
উত্তর: গ) 32 — N স্তরে n = 4, তাই 2n² = 2 × 16 = 32।
৪. স্বর্ণপাতে আলফা কণা বিক্ষেপণ পরীক্ষা কে করেছিলেন?
- ক) ডাল্টন
- খ) থমসন
- গ) রাদারফোর্ড
- ঘ) বোর
উত্তর দেখো
উত্তর: গ) রাদারফোর্ড — ১৯১১ সালে রাদারফোর্ডের এ পরীক্ষা থেকেই নিউক্লিয়াসের ধারণা আসে।
৫. কপারের (Z = 29) সঠিক বহিঃস্তরের বিন্যাস কোনটি?
- ক) 3d⁹ 4s²
- খ) 3d¹⁰ 4s¹
- গ) 3d⁸ 4s²
- ঘ) 3d¹⁰ 4s²
উত্তর দেখো
উত্তর: খ) 3d¹⁰ 4s¹ — পূর্ণ d উপস্তর বেশি সুস্থিত বলে একটি ইলেকট্রন 4s থেকে 3d-তে যায়: 3d¹⁰ 4s¹।
৬. ডিউটেরিয়ামের নিউক্লিয়াসে নিউট্রন কয়টি?
- ক) 0
- খ) 1
- গ) 2
- ঘ) 3
উত্তর দেখো
উত্তর: খ) 1 — ডিউটেরিয়ামের ভরসংখ্যা 2 এবং প্রোটন 1, তাই নিউট্রন = 2 - 1 = 1।
৭. জীবাশ্মের বয়স নির্ণয়ে কোন আইসোটোপ ব্যবহৃত হয়?
- ক) Co-60
- খ) I-131
- গ) C-14
- ঘ) U-235
উত্তর দেখো
উত্তর: গ) C-14 — জীবিত অবস্থায় শরীরে C-14 ঢোকে; মৃত্যুর পর এটি নির্দিষ্ট হারে ক্ষয় হয়, যা মেপে বয়স বের করা যায়।
৮. কোন উপস্তরটি আগে পূর্ণ হয়?
- ক) 3d
- খ) 4p
- গ) 4s
- ঘ) 4d
উত্তর দেখো
উত্তর: গ) 4s — (n + l) মান 4s-এর জন্য 4, 3d-এর জন্য 5, 4p-এর জন্য 5, 4d-এর জন্য 6; সবচেয়ে কম 4s।
সৃজনশীল প্রশ্ন
উদ্দীপক: X ও Y দুটি মৌল। X-এর পারমাণবিক সংখ্যা 17, আর প্রকৃতিতে এর দুটি আইসোটোপ পাওয়া যায় যাদের ভরসংখ্যা 35 ও 37, প্রাচুর্য যথাক্রমে 75% ও 25%। Y-এর পারমাণবিক সংখ্যা 24।
- ক) আইসোটোপ কাকে বলে?
- খ) পরমাণু বিদ্যুৎ নিরপেক্ষ কেন? ব্যাখ্যা করো।
- গ) X-এর আপেক্ষিক পারমাণবিক ভর নির্ণয় করো।
- ঘ) Y-এর ইলেকট্রন বিন্যাস সাধারণ নিয়ম মানে না — বিশ্লেষণ করো।
উত্তর দেখো
- একই মৌলের যেসব পরমাণুর প্রোটন সংখ্যা সমান কিন্তু নিউট্রন সংখ্যা তথা ভরসংখ্যা ভিন্ন, তাদের আইসোটোপ বলে।
- পরমাণুতে ধনাত্মক চার্জযুক্ত প্রোটন আর ঋণাত্মক চার্জযুক্ত ইলেকট্রনের সংখ্যা সমান, এবং উভয়ের চার্জের মান সমান (1.602 × 10^-19 C)। ফলে দুই চার্জ পরস্পরকে নিষ্ক্রিয় করে, আর নিউট্রনের কোনো চার্জ নেই। তাই পরমাণুর মোট চার্জ শূন্য।
- গড় ভর = (35 × 75 + 37 × 25) ÷ 100 = (2625 + 925) ÷ 100 = 35.5। সুতরাং X (ক্লোরিন)-এর আপেক্ষিক পারমাণবিক ভর 35.5।
- Y হলো ক্রোমিয়াম (Z = 24)। আউফবাউ নীতি অনুযায়ী বিন্যাস হওয়ার কথা 1s² 2s² 2p⁶ 3s² 3p⁶ 3d⁴ 4s²। কিন্তু বাস্তবে এটি 1s² 2s² 2p⁶ 3s² 3p⁶ 3d⁵ 4s¹। কারণ 3d ও 4s-এর শক্তির পার্থক্য খুব কম, আর অর্ধপূর্ণ d⁵ উপস্তরে ইলেকট্রনগুলো প্রতিসমভাবে ছড়িয়ে থাকে এবং বিনিময় শক্তির কারণে বেশি সুস্থিত হয়। তাই 4s থেকে একটি ইলেকট্রন 3d-তে চলে যায়। এ কারণে Y-এর বিন্যাস সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম।
উদ্দীপক: শিক্ষক বোর্ডে দুটি পরমাণু মডেলের ছবি আঁকলেন। প্রথমটিতে কেন্দ্রে ক্ষুদ্র ধনাত্মক নিউক্লিয়াস আর চারপাশে ইলেকট্রন যেকোনো পথে ঘুরছে। দ্বিতীয়টিতে ইলেকট্রন কেবল নির্দিষ্ট ব্যাসার্ধের বৃত্তাকার কক্ষপথে ঘুরছে, এবং একটি ইলেকট্রন n = 3 থেকে n = 2 স্তরে নেমে আসছে।
- ক) ভরসংখ্যা কাকে বলে?
- খ) নিউক্লিয়াসে প্রায় সব ভর কেন্দ্রীভূত — ব্যাখ্যা করো।
- গ) দ্বিতীয় মডেলে ইলেকট্রনের স্থানান্তরে কী ঘটে, ব্যাখ্যা করো।
- ঘ) প্রথম মডেলের সীমাবদ্ধতা দ্বিতীয় মডেল কতটুকু দূর করতে পেরেছে — মূল্যায়ন করো।
উত্তর দেখো
- পরমাণুর নিউক্লিয়াসে উপস্থিত প্রোটন ও নিউট্রনের মোট সংখ্যাকে ভরসংখ্যা বলে।
- প্রোটন ও নিউট্রনের ভর প্রায় 1.67 × 10^-27 kg, যেখানে ইলেকট্রনের ভর মাত্র 9.11 × 10^-31 kg, প্রায় ১৮৩৬ গুণ কম। প্রোটন ও নিউট্রন দুটোই নিউক্লিয়াসে থাকে, তাই পরমাণুর প্রায় সমস্ত ভর নিউক্লিয়াসেই কেন্দ্রীভূত।
- দ্বিতীয়টি বোর মডেল। এখানে প্রতিটি কক্ষপথের নির্দিষ্ট শক্তি আছে, এবং n = 3 স্তরের শক্তি n = 2-এর চেয়ে বেশি। ইলেকট্রন n = 3 থেকে n = 2-তে নামলে শক্তির পার্থক্য ΔE = E3 - E2 সমান শক্তির ফোটন হিসেবে বিকিরণ করে, যার কম্পাঙ্ক ν = ΔE / h। হাইড্রোজেনে এই স্থানান্তর লাল রঙের দৃশ্যমান রেখা তৈরি করে। নির্দিষ্ট শক্তি বলে বর্ণালিতে নির্দিষ্ট রেখা দেখা যায়।
- প্রথমটি রাদারফোর্ড মডেল। এর সমস্যা ছিল: ঘূর্ণায়মান ইলেকট্রন শক্তি হারিয়ে নিউক্লিয়াসে পড়ার কথা, এবং পরমাণুর রেখা বর্ণালি ব্যাখ্যা করা যায় না। বোর বললেন নির্দিষ্ট কক্ষপথে থাকাকালে ইলেকট্রন শক্তি বিকিরণ করে না, তাই পরমাণুর স্থায়িত্ব ব্যাখ্যা হলো; আর স্তর বদলের সময় নির্দিষ্ট শক্তি শোষণ বা বিকিরণ ধরে হাইড্রোজেনের রেখা বর্ণালি নিখুঁতভাবে ব্যাখ্যা হলো। তবে বোর মডেল বহু ইলেকট্রনবিশিষ্ট পরমাণুর বর্ণালি ও উপশক্তিস্তরের অস্তিত্ব ব্যাখ্যা করতে পারেনি। তাই বলা যায়, বোর মডেল রাদারফোর্ডের প্রধান সীমাবদ্ধতাগুলো অনেকখানি দূর করলেও পুরোপুরি নয়; পরে কোয়ান্টাম বলবিদ্যা সেই ঘাটতি পূরণ করে।
বাস্তব জীবনে মজার যোগসূত্র
তোমার শরীর আর হাতের চেয়ারটা পুরোপুরি শক্ত মনে হলেও পরমাণুর প্রায় সবটাই ফাঁকা জায়গা। নিউক্লিয়াসকে যদি একটা ফুটবল স্টেডিয়ামের মাঝখানে রাখা একটা মটরদানা ধরো, তাহলে ইলেকট্রনগুলো ঘুরছে গ্যালারির শেষ সারির কাছাকাছি। তাহলে চেয়ারে বসলে পড়ে যাও না কেন? কারণ তোমার আর চেয়ারের পরমাণুর ইলেকট্রনগুলো পরস্পরকে বিকর্ষণ করে। অর্থাৎ তুমি আসলে কখনো চেয়ার ছুঁয়ে বসো না, ইলেকট্রনের ধাক্কার একটা অদৃশ্য গদির ওপর ভেসে থাকো।
প্রশ্ন ও উত্তর
পারমাণবিক সংখ্যা আর ভরসংখ্যার মধ্যে পার্থক্য কী?
পারমাণবিক সংখ্যা হলো কেবল প্রোটনের সংখ্যা, যা মৌলের পরিচয় ঠিক করে। ভরসংখ্যা হলো প্রোটন আর নিউট্রনের যোগফল। একই মৌলের আইসোটোপে পারমাণবিক সংখ্যা এক থাকে, ভরসংখ্যা বদলায়।
4s আগে পূর্ণ হয়, অথচ লেখার সময় 3d আগে লেখা হয় কেন?
পূরণের সময় 4s-এর শক্তি কম বলে আগে ভরে। কিন্তু অনেক বইয়ে শক্তিস্তর অনুযায়ী সাজিয়ে 3d আগে লেখা হয়। দুটো লেখাই গ্রহণযোগ্য, তবে তোমার পাঠ্যবই যেভাবে লেখে, পরীক্ষায় সেভাবে লেখাই নিরাপদ।
আপেক্ষিক পারমাণবিক ভর ভগ্নাংশ হয় কেন?
প্রকৃতিতে বেশিরভাগ মৌল একাধিক আইসোটোপের মিশ্রণ। আপেক্ষিক পারমাণবিক ভর হলো তাদের প্রাচুর্য অনুযায়ী গড়, তাই এটা সাধারণত পূর্ণসংখ্যা হয় না, যেমন ক্লোরিনের 35.5।
সব আইসোটোপ কি তেজস্ক্রিয় ও বিপজ্জনক?
না। C-12, C-13, ডিউটেরিয়ামের মতো অনেক আইসোটোপ সম্পূর্ণ স্থিতিশীল। কেবল কিছু আইসোটোপ তেজস্ক্রিয়, আর সেগুলোও নিয়ন্ত্রিতভাবে চিকিৎসা ও গবেষণায় উপকারে আসে।
বোর মডেল কি এখনো সঠিক ধরা হয়?
বোর মডেল শক্তিস্তরের ধারণা বোঝার জন্য খুবই কাজের, এবং হাইড্রোজেনের জন্য নির্ভুল ফল দেয়। তবে আধুনিক বিজ্ঞানে ইলেকট্রনকে নির্দিষ্ট বৃত্তপথে না ভেবে অরবিটাল বা সম্ভাব্য অবস্থানের অঞ্চল হিসেবে দেখা হয়।
আরও পড়ো
সূত্র: NCTB রসায়ন, নবম-দশম শ্রেণি, অধ্যায় ৩: পদার্থের গঠন · OpenStax Chemistry 2e, Chapter 2 and 6: Atoms, Molecules and Electronic Structure · Khan Academy: Atomic structure and electron configuration